কাঁটাওয়ালা ডাইনোসরের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা

· Prothom Alo

ডাইনোসর বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশালদেহী কোনো প্রাণী, যার গাভর্তি খসখসে আঁশ, পিঠে হাড়ের শক্ত বর্ম অথবা ডানাভর্তি পালক। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার এমন এক ডাইনোসরের খোঁজ পেয়েছেন, যার গায়ের চামড়া এর আগে কখনো দেখা যায়নি। সজারুর মতো কাঁটাওয়ালা এই অদ্ভুত ডাইনোসর রীতিমতো চমকে দিয়েছে সবাইকে!

চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাটি খুঁড়ে এই নতুন প্রজাতির ডাইনোসরটি আবিষ্কার করেছেন জীবাশ্মবিদেরা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘হাওলং ডোঙ্গি’। ম্যান্ডারিন ভাষায় এর মানে কাঁটাযুক্ত ড্রাগন। নামটা যে একদম পারফেক্ট, তা এর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। এই ডাইনোসর ইগুয়ানোডনটিয়ান পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের বাকিদের গায়ে সাধারণ পালক থাকলেও হাওলংয়ের গা দেখে মনে হয়, যেন সজারুর চামড়ার তৈরি কোনো ওভারকোট পরে আছে!

Visit amunra-online.pl for more information.

হাওলংয়ের ঘাড়, পিঠ ও শরীরের দুই পাশে সারি সারি কাঁটা বিছানো। কাঁটাগুলো সবই পেছনের দিকে মুখ করা এবং ভেতরটা একদম ফাঁপা। বেশির ভাগ কাঁটাই আকারে বেশ ছোট, মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার লম্বা। এর ফাঁকে ফাঁকে আছে ৫ থেকে ৭ মিলিমিটারের মাঝারি কাঁটা। আর কিছু কাঁটা বেশ বড়, লম্বায় ৪৪ মিলিমিটারের চেয়ে বেশি!

গোবি মরুভূমিতে ১৮টি ডাইনোসরের অদ্ভুত সমাধি
হাওলং যে পরিবেশে থাকত, সেখানকার আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ছিল। ইউটাইরেনাসের মতো কিছু ডাইনোসরের গায়ে তো আস্ত পালকের কোটই ছিল শরীর গরম রাখার জন্য।

বিজ্ঞানীরা মাত্র একটি হাওলংয়েরই সম্পূর্ণ জীবাশ্ম পেয়েছেন, যা লম্বায় প্রায় ২.৪৫ মিটার। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এর গায়ের চামড়াও চমৎকারভাবে সংরক্ষিত ছিল। হাড়গোড় পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, মারা যাওয়ার সময় ডাইনোসরটি ছিল নিতান্তই বাচ্চা। তাই বড় হওয়ার পর এই কাঁটাগুলো গায়ে থাকত, নাকি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ঝরে যেত, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এই অদ্ভুত কাঁটাগুলোর আসল কাজ কী ছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ মাথা ঘামাতে হয়েছে। শুরুতে অনেকেই ভেবেছিলেন, এগুলো হয়তো আদিম কোনো পালক। কিন্তু প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে যখন হাওলং পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তার অনেক আগেই ডাইনোসরদের গায়ে আসল পালক গজিয়ে গিয়েছিল। তাই এই তত্ত্ব ধোপে টিকল না।

তাহলে কি শীত নিবারণের জন্য? হাওলং যে পরিবেশে থাকত, সেখানকার আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ছিল। ইউটাইরেনাসের মতো কিছু ডাইনোসরের গায়ে তো আস্ত পালকের কোটই ছিল শরীর গরম রাখার জন্য। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীর গরম রাখার জন্য হাওলংয়ের এই কাঁটাগুলো যথেষ্ট ঘন ছিল না। আবার রঙের মাধ্যমে আত্মগোপন করার তত্ত্বও বাতিল হয়ে গেছে। কারণ, সেখানে কোনো পিগমেন্ট বা রঙের কোষ পাওয়া যায়নি। এমনকি সাপ বা টিকটিকির মতো স্পর্শ বোঝার সেন্সর হিসেবেও এগুলো কাজ করত না। কারণ, কাঁটাগুলো ছিল বেশ বড় এবং আঁশের সঙ্গে এদের জোড়াও ঠিক সেন্সরের মতো ছিল না।

যেসব প্রাণী কল্পনায় আছে, বাস্তবে নেই
এই কাঁটাগুলো এতটাও শক্ত বা ধারালো ছিল না যে শিকারিকে একেবারে কুপোকাত করে ফেলবে। কিন্তু এগুলো ছিল চরম বিরক্তিকর!
হাওলংয়ের ঘাড়, পিঠ ও শরীরের দুই পাশে সারি সারি কাঁটা বিছানো

সব হিসাব-নিকাশ শেষে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, তা হলো আত্মরক্ষা! হাওলং যেখানে থাকত, সেখানে ছোটখাটো অনেক মাংসাশী ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত। তাদের হাত থেকে বাঁচতেই হয়তো এই কাঁটাগুলোর উদ্ভব।

এই কাঁটাগুলো এতটাও শক্ত বা ধারালো ছিল না যে শিকারিকে একেবারে কুপোকাত করে ফেলবে। কিন্তু এগুলো ছিল চরম বিরক্তিকর! একটা মাংসাশী ডাইনোসর যখন হাওলংকে কামড় দিতে যেত, তখন এই কাঁটাগুলো তার মুখে খোঁচা দিত। ফলে হাওলংকে চিবিয়ে খাওয়াটা শিকারির জন্য ভীষণ ঝামেলার হতো। এই শিকারকে খাওয়া ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। শিকারিরা হয়তো তখন ভাবত, এই কাঁটাওয়ালা জঞ্জাল খাওয়ার চেয়ে অন্য কোনো শিকার ধরাই ভালো!

সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভল্যুশন জার্নালে এই চমৎকার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। হাওলংয়ের এই আবিষ্কার আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, ডাইনোসরদের রহস্যময় জগৎটা আজও কত অজানা ও রোমাঞ্চে ভরপুর!

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্টশেষমেশ গরুও যন্ত্র ব্যবহার শুরু করল?

Read full story at source