১০ লাখ টাকার বিনিয়োগে মাসে আয় ২৫ লাখ টাকা
· Prothom Alo

গরম বা শীতকাল—সব সময়ই ডাবের কম-বেশি চাহিদা থাকে। শহর এলাকায় মানুষজন সাধারণত ভ্যান বা নির্দিষ্ট দোকান থেকে ডাব কিনে খান। কিন্তু কেমন হয় যদি আপনি যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে অর্ডার করলেন, আর ডাব আপনার কাছে চলে এল। রাজধানী ঢাকায় ঠিক এই সেবা চালু করেছে কোকো গ্রিন নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
Visit catcross.org for more information.
ডাবের পানি প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর পানীয়। এতে রয়েছে শরীরের জন্য উপকারী খনিজ, ভিটামিন ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। এ ছাড়া পুডিং তৈরিসহ ডাবের পানির অন্যান্য ব্যবহারও রয়েছে। করোনা মহামারির সময় থেকে দেশে ডাবের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ডেঙ্গু ও গরমের তীব্রতাও কয়েক বছর ধরে ডাবের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। ডাবের প্রতি মানুষের বাড়তি এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এ ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে কোকো গ্রিন।
কোকো গ্রিনের যাত্রা ২০২২ সালের শুরুর দিকে। দুই বন্ধু মো. সুজন আহমেদ ও মো. রোকনুদ্দৌলা মিলে এ ব্যবসা শুরু করেন। আগে তাঁরা অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ব্যবসা করতেন। তারও আগে একাধিক কোম্পানির বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি ভবনে কোকো গ্রিনের কার্যালয়। আর ছোট পরিসরে কারখানা রয়েছে গাবতলিতে। সম্প্রতি কোকো গ্রিনের কারখানায় বসেই প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে নিজেদের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প ও ব্যবসার কথা জানান সুজন ও রোকনুদ্দৌলা। তাঁরা জানান, অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করলেও টেকসই কোনো পণ্যের ব্যবসা খুঁজছিলেন তাঁরা।
ফেসবুক বিজ্ঞাপনে শুরু
আলাপকালে সুজন আহমেদ জানান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ডাবকে নির্দিষ্ট আকারে কেটে বিক্রি করা হয়। এ পদ্ধতিতে ডাবের খোলের ভেতরেই পানি রাখা হয় যাতে গ্রাহক সরাসরি তাজা ও পরিষ্কার ডাবের পানি খেতে পারেন। ফেসবুকে এ ধরনের কিছু ভিডিও দেখে তাঁরাও এ ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমেই এভাবে কাটা ডাবের কয়েকটি ছবি দিয়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেন দুই বন্ধু। তাতে বেশ কয়েকটি জায়গা থেকে সাড়া পাওয়া যায়। তখন কারওয়ান বাজার থেকে ৮ হাজার টাকায় ১০০টি ডাব কিনে আনেন তাঁরা। এটিই ছিল তাঁদের প্রাথমিক পুঁজি। পরে নিজেদের বাইকে করে এসব ডাব গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেন।
কোকো গ্রিনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রোকনুদ্দৌলা বলেন, ‘গ্রাহক আকর্ষণের জন্য পণ্যের মোড়ক ও পরিবেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে আমরা দা ও চাকু দিয়ে ডাব কেটে তা মোড়কজাত করে বিক্রি করতাম। কিন্তু হাত দিয়ে কাটায় সেটি তেমন সুন্দর হতো না। এ জন্য কিছুদিন পর প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে চীন থেকে একটি কাটিং যন্ত্র আনি। এখন সেই যন্ত্রের মাধ্যমে সুন্দর করে ডাব কাটা হয়।’
শুরুতে অভিজ্ঞতারও অনেক ঘাটতি ছিল বলে জানান রোকনুদ্দৌলা। তিনি বলেন, ‘কোনটা কচি ডাব, কোনটা মিষ্টি পানির, কোনটিতে নারকেল হয়েছে—সেগুলো বুঝতে অনেক সময় ভুল হতো। এ জন্য অনেক ডাব নষ্ট হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জ আমরা কাটিয়ে উঠেছি।’
মো. সুজন আহমেদ, সহপ্রতিষ্ঠাতা, কোকো গ্রিনআগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা দেশের প্রধান প্রধান শহর ও জেলাগুলোতে আমাদের সেবা নিয়ে যেতে চাই। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে আগামী মাস থেকে ডাব বিক্রি শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।গ্রাহক কারা
উদ্যোক্তা সুজন জানান, বর্তমানে কোকো গ্রিন থেকে মাসে ২৪-২৫ হাজার ডাব বিক্রি হয়। গরমে বিক্রি আরও বাড়ে। ছোট ছোট কার্টনে করে ডাব সরবরাহ করে কোকো গ্রিন। প্রতিটি কার্টনে ছয়টি ডাব থাকে। সঙ্গে থাকে স্ট্র ও পাঞ্চ কিট, যা দিয়ে ডাব ছিদ্র করা যায়। তাঁদের দুই ধরনের প্যাকেজ আছে। মাঝারি আকারের ডাবের কার্টনের দাম ৮৪০ টাকা; ডাবের আকার একটু বড় হলে দাম হয় ৯৬০ টাকা। সঙ্গে ১০০ টাকা ডেলিভারি চার্জ। দুই দিন ফ্রিজের বাইরে রেখে ও সাত দিন পর্যন্ত ফ্রিজে রেখে এসব ডাব সংরক্ষণ করা যায়। সারা বছর একই দামে ডাব বিক্রি করা হয়। আর ডাব নিয়ে ভোক্তার কোনো অভিযোগ পেলে অর্থ ফেরতের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
কোকো গ্রিনের করপোরেট ও ব্যক্তি পর্যায়ের দুই ধরনের গ্রাহকই রয়েছেন। রাজধানীর বেশ কয়েকটি ক্লাব, বিভিন্ন জিমনেসিয়াম (ব্যায়ামাগার), হাসপাতালের ক্যানটিন, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁরা ডাব সরবরাহ করেন। আবার বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজনে করপোরেট সেল হয় তাঁদের। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যক্তি পর্যায়ের ভোক্তারাও ডাব কেনেন। বিশেষ করে গুলশান, বসুন্ধরা, বনানী, উত্তরা, ধানমন্ডি এলাকা থেকে বেশি অর্ডার পাওয়া যায়।
মো. রোকনুদ্দৌলা, সহপ্রতিষ্ঠাতা, কোকো গ্রিনপণ্যের মোড়ক ও পরিবেশনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে আমরা দা–চাকু দিয়ে ডাব কেটে মোড়কজাত করে বিক্রি করতাম। হাত দিয়ে কাটায় তা তেমন সুন্দর হতো না। এখন যন্ত্রের মাধ্যমে সুন্দর করে ডাব কাটা হয়।ডাবের পুডিং
একবার নোয়াখালী থেকে এক হাজার ডাব কেনেন সুজন ও রোকন। যখন অর্ডার করেন, তখন ছিল তীব্র গরম; ডাব আসতে আসতে টানা বর্ষণ শুরু হয়। এ সময় প্রায় ৬০০টি ডাব অবিক্রীত থেকে যায়। এসব ডাব দিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মাথায় ডাবের পানি ও শাঁস দিয়ে পুডিং বানানোর চিন্তা আসে। ইউটিউব দেখে ও কয়েকজনের পরামর্শে পরীক্ষামূলকভাবে ডাবের পুডিং বানান তাঁরা। এরপর গ্রাহকের কাছ থেকে ভালো রিভিউ পেয়ে বাণিজ্যিকভাবে তা বানাতে শুরু করেন। বর্তমানে তাঁদের তৈরি ডাবের পানির পুডিংয়ের ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানান সুজন।
সুজন আরও জানান, ডাবের কোয়ালিটি নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। পাইকারদের কাছ থেকে কিনলে সেখানে বড়-ছোট মিলিয়ে ডাব থাকে। তাতে দেখা যায়, ১০০টি ডাবের মধ্যে ২০টিই ছোট থাকে, যা গ্রাহকেরা নিতে চান না। এ সমস্যার সমাধানে কারওয়ান বাজারে ডাবের আড়তে নিজেরা আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে।
► করপোরেট ও প্রিমিয়াম গ্রাহকেরাই প্রধান ক্রেতা। ► অবিক্রীত ডাব দিয়ে তৈরি করা হয় পুডিং, যা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ► সামনে চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য শহরে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা।
আরও যেসব পণ্য রয়েছে
ডাবের পানি ও পুডিং ছাড়াও সাত-আট ধরনের উপজাত পণ্য তৈরি করে কোকো গ্রিন। এর মধ্যে রয়েছে—নারকেল তেল (ত্বক ও চুলের যত্নে ব্যবহার), এক্সট্রা ভার্জিন কোকোনাট অয়েল (খাওয়ার তেল), কোকোনাট মিল্ক, নারকেলের বরফি, নাড়ু, টোস্টেড চিপস। এ ছাড়া নারকেলের মধ্যে থাকা নরম শাঁস ও ফুল (ফোঁপল) আলাদাভাবে বিক্রি করে তারা। ডাবের কেটে ফেলা অবশিষ্টাংশ (বর্জ্য) দিয়ে চারকোল বানানোর পরিকল্পনা করছে কোকো গ্রিন। এটিও বেশ লাভজনক ব্যবসা হবে বলে জানান সুজন।
কোকো গ্রিনে সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। আর প্রতি মাসে সব মিলিয়ে গড়ে ২৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন ১২ জন কর্মী। ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী জানতে চাইলে সুজন বলেন, ‘আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আমরা দেশের প্রধান প্রধান শহর ও জেলাগুলোতে আমাদের সেবা নিয়ে যেতে চাই। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে আগামী মাস থেকে ডাব বিক্রি শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।’