১০ বছরের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সর্বনিম্ন
· Prothom Alo

গত ১০ বছরের মধ্যে এখন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে কম। এখন দেশে জিডিপির আকার যত, এর মাত্র ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশের সমান হলো বেসরকারি বিনিয়োগ, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। টানা চার বছর ধরে জিডিপিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অবদান কমছে।
এই হিসাব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। এটি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের জিডিপি ও বিনিয়োগের চূড়ান্ত হিসাব। সেখানে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের এই হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। এর আগে ২০১৪–১৫ অর্থবছরের পর এত কম বেসরকারি বিনিয়োগ আর হয়নি।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কয়েক বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে আছে। গত অর্থবছরে তা আরও কমে যায়। অবশ্য গত অর্থবছর ছিল গণ–অভ্যুত্থানের বছর। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে গণ–আন্দোলনের সময় ব্লকেড, কারফিউ—এসব কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় থমকে যায়। বিনিয়োগ করার মতো পরিস্থিতিও ছিল না। এর প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থবছরে। বেসরকারি বিনিয়োগে খরা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও কমবেশি ছিল।
এসবের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। গত অর্থবছরে (২০২৪–২৫) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা করোনাভাইরাসের প্রথম বছরের (২০১৯–২০ অর্থবছরের) কাছাকাছি। ওই অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। যা গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম।
‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’
১০ বছরের মধ্যে জিডিপির বেসরকারি বিনিয়োগ কম কেন—এর কারণ ‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’ বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এতে কর্মসংস্থান ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলেছে।’
কাঙ্ক্ষিত হারে বেসরকারি বিনিয়োগ না হওয়ার চারটি কারণ আছে বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান। চারটি কারণ ব্যাখ্যা করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রথমত, অন্তর্বর্তী সরকার কত দিন থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। গণতান্ত্রিক উত্তরণ সঠিকভাবে হবে কি না—এসব নিয়ে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল। তাই তাঁরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হননি। দ্বিতীয়ত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দীর্ঘ মেয়াদে রাখার কারণে পলিসি রেট বেশি ছিল। এতে মূল্যস্ফীতি কমলেও অন্যদিকে মূল্য দিতে হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ আসেনি, বেসরকারি খাত চাঙা হয়নি। তৃতীয়ত, ব্যবসায় খরচ কমানো, চাঁদাবাজি বন্ধ করাসহ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চতুর্থত, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ববাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আছে। সার্বিকভাবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না।
জিডিপির আকার ও বিনিয়োগ কত
গত অর্থবছরে জিডিপির আকার চলতি মূল্যে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। আর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বিনিয়োগ চলতি মূল্যেই হিসাব করা হয়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান১০ বছরের মধ্যে জিডিপির বেসরকারি বিনিয়োগ কম কেন—এর কারণ ‘চতুর্মুখী আক্রমণের ফল’ বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এতে কর্মসংস্থান ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলেছে।’গত এক দশকের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে এত কম বেসরকারি বিনিয়োগ হয়নি। এর আগে ২০১৩–১৪ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছিল।
কয়েক বছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। বিশেষজ্ঞরা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
এদিকে টানা চার বছর ধরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। ২০২১–২২ অর্থবছরে যেখানে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সাড়ে ২৪ শতাংশ ছিল, এখন তা ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে নেমেছে।
কেন বেসরকারি বিনিয়োগ কম
বিনিয়োগ পরিস্থিতির বড় কোনো উন্নতি হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও বিনিয়োগ নিয়ে বড় অগ্রগতি ছিল না। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানী ঢাকায় ঘটা বিনিয়োগ সম্মেলন করা হয়। সম্মেলনে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা দেখানো হলেও দেড় বছরে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। একদিকে গ্যাস–বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়ই দেশি–বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ঋণের ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ সুদের হারও বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার কারণ।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখেছেন। তাঁরা ধীরে চলার নীতিই অবলম্বন করেছেন। তাঁরা নির্বাচিত নতুন সরকারের আমলে দেখেশুনে বিনিয়োগ করার পক্ষে মনোভাব দেখাচ্ছেন।
জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ কী
প্রতিবছর দেশের অভ্যন্তরে পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়ে কত টাকার মূল্য সংযোজন হয়, সেটাই জিডিপির হিসাবে ধরা হয়। মোটাদাগে কৃষি, শিল্প ও সেবা—এই তিন খাত দিয়ে জিডিপি হিসাব করা হয়।
আবার একটি দেশে নির্দিষ্ট একটি বছরে কত বিনিয়োগ হলো, তা–ও জিডিপির হিসাবে আনা হয়। বিনিয়োগের মাধ্যমেই পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়।