ফরাসি স্বাদসাম্রাজ্যে পনিরের রাজত্ব ৯

· Prothom Alo

ফ্রান্সের দক্ষিণের পাহাড়ি গুহা ও প্রাচীন ঐতিহ্যের ভেতর জন্ম নেওয়া রকফোর্ত পনির আজ বিশ্বজুড়ে রসনাবিলাসীদের মুগ্ধ করে। ইতিহাস, কিংবদন্তি ও প্রকৃতির অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই পনিরের গল্প সত্যিই বিস্ময়কর।

Visit cat-cross.com for more information.

১৯১২ সাল। আজ থেকে প্রায় ১১৪ বছর আগের ঘটনা। পৃথিবীজুড়ে মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে সাগরের জলে ভাসল মোট ৫২ হাজার ৩১০ টন ওজনের ইস্পাত এবং পেটা লোহার বিশাল এক জলদানব, এক অতিকায় জাহাজ। এর আগে মানুষের নির্মিত এমন বিশাল কোনো বিলাসবহুল সাগর যান পৃথিবীর কেউ চোখে দেখিনি। সব উন্মাদনা আর উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু সর্বকালের সেই বিস্ময়কর জাহাজটি নিউ ইয়র্ক নগরীর উদ্দেশে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে শুরু করে।

বেলফাস্ট থেকে রওনা হওয়া টাইটানিক

১ হাজার ৪৫১ মাইল, অর্থাৎ ২ হাজার ৬৮৭ কিলোমিটার অতিক্রম করে উত্তর আটলান্টিকের বরফশীতল জলে ভেসে থাকা পাহাড়সম এক হিমশৈলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে এই লৌহদানবের। সেদিনটি ছিল ১৪ এপ্রিল, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ১১টা ৪০ মিনিট। ১৫ এপ্রিল ২টা ২০ মিনিট, মাত্র ৩ ঘণ্টার কম সময়ে ডুবে যায় তখনকার মানুষের এই বিশাল কীর্তি। সেই সঙ্গে সলিলসমাধি ঘটে প্রায় দেড় হাজার মানবসন্তানের।  

শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও, এমন বিষাদময় ঘটনা আমাদের প্রায় সবারই জানা। তবে আমাদের অনেকেরই যা জানা নেই, তা হলো এই জাহাজের মালখানায় অতি যত্নে রক্ষিত ছিল একটি অপূর্ব স্বাদের খাবার, একটি বিশেষ ফরাসি পনির, নাম ‘রকফোর্ত’, মার্কিন শৌখিন এবং রসনাবিলাসীদের খুব প্রিয় খাবার এই পনির।

শিল্পী উইলি স্টোয়ারের কল্পনায় ডুবন্ত টাইটানিক; এর মালখানাতেই ছিল ৫০ টন রকফোর্ত পনির

টাইটানিকের মালখানায় আরও বহু মূল্যবান সামগ্রীর সঙ্গে মোট ৫০ টন রকফোর্ত পনির মহাসাগরের অতলে তলিয়ে যায়। বহু প্রাচীন এই পনিরের অপার্থিব স্বাদের খবর ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক আগেই আটলান্টিকের অপর তীরের মানুষদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আজ এই খাবারটির বিশ্বজোড়া সুনাম।

ফরাসি পনিরশিল্পীদের এক অসাধারণ সৃষ্টি এই রকফোর্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অঞ্চলের আবহাওয়া, ভূপ্রাকৃতিক গঠন এবং মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ফ্রান্সের দক্ষিণের অ্যাভেরোঁ এবং এর আশপাশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল বেশ রুক্ষ। সর্বত্র উঁচু–নিচু পাহাড় আর প্রস্তরময় ভূমি। কৃষিজমি নেই বললেই চলে। সে কারণেই অ্যাভেরোঁ পাহাড়ি উপত্যকায় প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পশুপালনকেই জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এই অঞ্চলে সেই মধ্যযুগ থেকেই রকফোর্তের অস্তিত্বের কথা জানা যায়।

ফ্রান্সের দক্ষিণের অ্যাভেরোঁ এবং এর আশপাশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল বেশ রুক্ষ। সর্বত্র উঁচু-নিচু পাহাড় আর প্রস্তরময় ভূমি

এই খাবারটি কী করে সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়ে বেশ চমকপ্রদ একটি প্রচলিত লোককাহিনি রয়েছে। এক মেষপালক, রাখাল যুবক ফ্রান্সের দক্ষিণে একটি পাহাড়ি গুহায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। দুপুরে খাবার সময় হলে সে দেখতে পেল অদূরে ছন্দময় ভঙ্গিতে পায়চারি করছে অনন্য রূপবতী এক তরুণী। সে তখন তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিপ্রায়ে এগিয়ে যায়। যতই সে এগিয়ে যায়, তরুণীটি মরুভূমির মরীচিকার মতোই আরও দূরে সরে যায়, সে এক মায়াবী বিভ্রম। বেশ কিছুদিন পর বিভ্রম কেটে গেলে তরুণ মেষপালক ফিরে আসে সেই পাহাড়ের গুহায়, যেখানে সে রেখে গিয়েছিল দুপুরের খাবারের সঙ্গে নিয়ে আসা মেষদুগ্ধ। সে দুধ জমাট বেঁধে পরিণত হয়েছে ‘নীল পনিরে’। ‘নীল’ বলা হয়েছে, কারণ জমে যাওয়া দুধের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে নীলাভ-সবুজ রঙের ছত্রাক।

রকফোর্ত পনিরের রহস্য আসলে পেনিসিলিয়াম রকফোর্টি নামের এক ছত্রাকে। ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার (পৃথক) করার অনেক আগে থেকেই পচন (গ্যাংরিন) নিরাময়ে এ ছত্রাকের ব্যবহার করা হতো।

ফরাসি পনিরশিল্পীদের এক অসাধারণ সৃষ্টি এই রকফোর্ত 

সে যাহোক, মানুষের খাবারের বিশাল বৈচিত্র্যের জগতে ঠিক কবে থেকে এই পনির জায়গা করে নিয়েছিল, তা সঠিক করে কেউ বলতে পারে না। তবে এ কথা ঠিক যে এর সুনাম রোম সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী শাসকদের কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল। তাঁদের খাবার টেবিলে বাহারি সব খাবারের মাঝেও দেখা পাওয়া যেত সুদূর ফ্রান্সের দক্ষিণের এই খাদ্যসামগ্রীটির।

রোমান সম্রাট শার্লেমেন (৭৪২-৮১৪) একবার স্পেন থেকে ফেরার পথে ফ্রান্সের দক্ষিণে আলবি অঞ্চলে এক বিশপের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তখন তাঁকে এই পনির পরিবেশন করা হয়। তিনি তখন ভেবেছিলেন যে তাঁকে পচে যাওয়া পনির খেতে দেওয়া হয়েছে। তিনি তাই কাউকে কিছু না বলে, ছুরি দিয়ে নীলাভ-সবুজ রঙের ছত্রাক জড়ানো অংশগুলো আলাদা করে ফেলে দিচ্ছিলেন।

তা লক্ষ করে বিশপ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সম্রাটকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘জাহাঁপনা, আপনি সবচেয়ে সুস্বাদু অংশটিই ফেলে দিচ্ছেন। ছত্রাকেই রয়েছে ঘ্রাণ আর স্বাদের আসল রহস্য।’ সম্রাট তখন একটুকরা পনির মুখে দিয়ে বিশপের কথার সত্যতা খুঁজে পেলেন। অতিশয় মুগ্ধ সম্রাট, বিশপকে তাঁর প্রাসাদে বছরে এই পনিরের দুটি চালান পৌঁছে দেবার অনুরোধ করে বিনিময়ে আকর্ষণীয় এনাম দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

আর ফ্রান্সের রাজা ষষ্ঠ চার্লস (১৩৮০-১৪২২) এটাই পছন্দ করেছিলেন যে এর স্বাদ এবং গুণ অক্ষুণ্ন রাখতে তিনি নিজে থেকেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৪১১ সালের ৪ জুন এক আদেশের মাধ্যমে তিনি এ বিশেষ পনিরটি তৈরি করার একচেটিয়া অধিকার শুধু রকফোর্ত-সুর-সোলজন গ্রামের বাসিন্দাদের প্রদান করেছিলেন। এই গ্রামের মানুষেরা রাজাকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানিয়ে আজও প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘রকফোর্ত’ উৎসবের আয়োজন করে থাকে। দেশ-বিদেশের বহু পনিরপ্রেমিক এই জমজমাট উৎসবে যোগ দিতে চলে আসেন।

প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আয়োজন করা হয় ‘রকফোর্ত’ উৎসবেরএই অঞ্চলে বেড়াতে এলে চোখ এড়াবে না সূর্যমুখী রঙা রোদ গায়ে মেখে পাহাড়ের গায়ে নির্বিঘ্নে চরে বেড়াচ্ছে লাকুন জাতের মেষের বিশাল পাল

১৬৬৬ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক সুরক্ষিত পণ্যের মতো এই পনিরকে ‘সুরক্ষিত’ করা হয়। তবে ১৯২৫ থেকে রকফোর্ত ‘ভৌগোলিক নির্দেশক সুরক্ষিত পনির’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ফরাসি পনিরের ইতিহাসে এই খাবারটিই হচ্ছে প্রথম, যা এমন মর্যাদা লাভ করেছে। বর্তমানে যেহেতু এই পনিরটি ‘এওপি’ লোগোযুক্ত লেবেল লাগিয়ে আদি স্বাদ এবং ঘ্রাণের নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে, সে কারণে শুধু লাকুন জাতের মেষের দুধ কাঁচা ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। লাকুন জাতের এই মেষকে বেশির ভাগ সময়ে পাহাড়ে, উপত্যকায় মুক্তভাবে চড়ে বেড়াতে দিতে হবে। তা ছাড়া অ্যাভেরোঁ এবং এর আশপাশের নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে উৎপাদন করা যাবে না, সে শর্তও মানতে হবে।

বহু বছর থেকে ফ্রান্সের দক্ষিণের শহর তুলুজে থাকি। পনিরের জগতের উজ্জ্বল এই বিশেষ পনিরের উৎপত্তিস্থল তুলুজ থেকে ২১০ কিলোমিটার বা ১৩০ মাইল দূরে অ্যাভেরোঁতে। একদিন স্ত্রী-সন্তানেরা, আমরা সবাই মিলে নিজের চোখে সে বিস্ময় দেখতে গিয়েছিলাম। কিংবদন্তির এমন পণ্যের দেশে ভ্রমণ ছিল এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা।

আকাশছোঁয়া সেতু ‘ভিয়াডুক দ্য মিঁও’-এর নিচে স্ত্রী, কন্যাসহ লেখক

পাহাড়ের মহিমাময় নির্জনতা, খামারবাড়ির বাগানের শিশিরভেজা সকাল, দূর উপত্যকা পেরিয়ে ভেসে আসা মেষপালকের ‘হেই হো’ শব্দে মেশা ভেড়ার গলায় বাঁধা ঘণ্টার টুংটাং শব্দের সুরেলা শব্দঝংকার, পাহাড়ি স্রোতস্বিনীর নুড়ি ধুয়ে বয়ে যাওয়া জলতরঙ্গের কলধ্বনি আমাদের উদ্বেলিত করেছিল। সূর্যমুখী রঙা রোদ গায়ে মেখে পাহাড়ের গায়ে নির্বিঘ্নে চরে বেড়াচ্ছে লাকুন জাতের মেষের বিশাল পাল।

সেখানকার রকফোর্ত উৎপাদনের সবচেয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘সোসিয়েতে’ পরিদর্শন করেছিলাম। সেখানকার একজন গাইড আমাদের পাহাড়ের নিচে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে নিয়ে গেলেন। প্রায় অন্ধকার ঘরে প্রার্থনা কক্ষের মতো নির্জন। বাইরের পৃথিবী থেকে একদম আলাদা। শুধু অনুভব করছিলাম স্যাঁতসেঁতে পাথর ছুঁয়ে বাতাসের প্রবাহ। সেখানে ওক কাঠের পাটাতনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে হাজার হাজার পনিরের গোল চাকতি। খানিকটা বাতাস চলাচল, আর্দ্রতা এবং গড় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কম করে ১৪ দিন রাখতে হবে পরিপক্বতার জন্য। তবে পুরোপুরি পরিপক্ব হতে সময় লেগে যায় ৯০ দিন।

রকফোর্ড উৎপাদনের সবচেয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘সোসিয়েতে’ পরিদর্শনে পর্যটকদের ভিড়ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে প্রায় অন্ধকার গুহার নির্জনে ওক কাঠের পাটাতনে সাজিয়ে রাখা হয়েছে হাজার হাজার পনিরের গোল চাকতি

গাইড জানালেন, এই বাতাস এবং প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা পনিরে আগে থেকে মিশিয়ে দেওয়া পেনিসিলিন ছত্রাক ছড়িয়ে পড়তে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং পনিরের স্বাদকে ঘনীভূত করে। তিনি আরও বললেন যে এই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের তাপমাত্রা সারা বছর ৮ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে। এমন চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণেই এই পনির অন্য কোথাও তৈরি করা সম্ভব নয়। আর তা করলেও, তা স্বাদে, ঘ্রাণে এবং গঠনে মোটেই আসল রকফোর্তের মতো হবে না।  

রূপকথার দেশের মতো এই পনিরের উৎসে বেড়াতে এলে মেঘের রাজ্যে বিস্ময়কর একটি সেতু রয়েছে, তা দেখে চলে ভুল হবে। ৩৪৩ মিটার বা ১ হাজার ১২৫ ফুট উঁচু আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় ‘ভিয়াডুক দ্য মিঁও’—বিশ্বের উঁচু সেতুগুলোর অন্যতম। আইফেল টাওয়ারকে ছাড়িয়ে ১৩ মিটার বেশি উঁচু এটি। লম্বায় ২ হাজার ৪৬০ মিটার বা

৩৪৩ মিটার বা ১ হাজার ১২৫ ফুট উঁচু আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময় ‘ভিয়াডুক দ্য মিঁও’—বিশ্বের উঁচু সেতুগুলোর অন্যতম

৮ হাজার ৭১ ফুট। প্রস্থ ৩২ মিটার বা ১০৫ ফুট—গড়পড়তায় ১৭ জন ইউরোপীয় দুহাত ছড়িয়ে স্বচ্ছন্দে পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে। ১৮টি স্টিলের ডেকের মোট ওজন ৩৬ হাজার টন, অর্থাৎ ৫ হাজার ১০০টি আফ্রিকান পূর্ণবয়স্ক হাতির ওজনের সমান!  
একটুকরা রকফোর্ত মুখে পুরে গাড়িতে বসে মেঘের দেশে ভ্রমণ স্বপ্নে নয় বাস্তবেই সম্ভব।

মইনুল হাসান: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক।

Read full story at source