প্যারিস ভ্রমণ: আমার দেখা শঁজে লিজের আলো আর ডায়ানার নীরব ছায়া  

· Prothom Alo

১৬ অক্টোবর, ২০২৫ প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন শেষে দুপুরে আমরা বাংলাদেশি খাবারের আশায় ‘সুন্দরবন’ নামের একটি হোটেলে যাই। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল অসংখ্য বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি, জাপানিজ, শ্রীলঙ্কান, চায়নিজ, আফগানিসহ বিভিন্ন দেশের সারিবদ্ধ ছোট-বড় খাবারের হোটেল। প্রতিটি রেস্তোরাঁতেই ছিল উল্লেখযোগ্য লোকসমাগম। হোটেলে ঢুকতেই প্যারিসের মাটিতে বাংলার আসল রূপ দেখা গেল, রেস্তোরাঁটির সব টেবিল ঠাসা বাঙালিতে ভরা। সবাই হইহই করে কাচ্চি বিরিয়ানি খাচ্ছে আর উচ্চ গলায় গল্পে রেস্তোরাঁটির পরিবেশ গরম করে রেখেছে। আহা, কত দিন পরে প্রবাসে বাংলা শুনছি, এখানেও সিলেটি ভাষার ব্যবহার খুব বেশি দেখলাম। কিছু সময় পর আমরা একটা টেবিলে বসবার সু্যোগ পেলাম।

আনিকা বলল, ২০২৩–এর পরে কাচ্চি বিরিয়ানি দেখছি, জার্মানিতে কাচ্চি নেই বললেই চলে। এই হোটেলে প্রতি প্লেট কাচ্চি ১১ ইউরো করে, বোরহানির মূল্য আলাদা। ঢাকার বিয়েবাড়ির মতোই বিরিয়ানি বেশ তৃপ্তিসহকারে খেলাম। খাবার শেষে বাংলার মিষ্টির রেস্তোরাঁয় যাই, রসমালাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য। বাংলার মিষ্টি খেয়ে এখানে বেশ কিছু সময় কাটিয়ে শঁজে লিজের বাসে উঠলাম। বাসে বসে ভাবছিলাম, স্টুট্টগার্ট, জার্মানিতে বাংলাদেশিরা কোনো খাবার হোটেল স্থাপন করতে পারেনি। ওখানে কেবল একটি ইন্ডিয়ান হোটেলে বাংলা খাবার পাওয়া যায়, তবে খাবারের মান তেমনটা উন্নত নয়।

Visit amunra-opinie.pl for more information.

স্মৃতিস্তম্ভ শঁজে লিজ

প্যারিসের হৃদয়ে অবস্থিত চ্যামস–ইলিসিস (Champs-lysées) ইউরোপের অন্যতম সুন্দর ও প্রাণবন্ত রাস্তা। এ শব্দের অর্থ ‘স্বর্গের ক্ষেত্র’ বা ইলিসিয়ান ফিল্ড (Elysian Fields)-গ্রিক পুরাণে বীরদের পরজগতের আবাসস্থল। এই স্মৃতিস্তম্ভটি প্যারিসের বিখ্যাত শঁজ-এলিজে রাস্তাটির পশ্চিম প্রান্তে, প্লাস শার্ল দ্য গল (Place Charles De Gaulle) এ অবস্থিত। ১৮০৬ সালে, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর সেনাদের বিজয়ের স্মরণে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের আদেশ দেন, যা সম্পূর্ণ হয় ১৮৩৬ সালে। মূল স্থপতি ছিলেন জাঁ-ফ্রাঁসোয়া শালগ্র্যাঁ (Jean-François Chalgrin)। এই স্মৃতিস্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ৫০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৪৫ মিটার।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]  

শঁজে লিজে-এর ইতিহাস শুরু হয় রাজা চতুর্দশ লুই–এর শাসনামলে। তার উদ্যান নকশাবিদ আন্দ্রে ল্য নোত্রে (Andr Le Nôtre) ভার্সাই প্রাসাদের মতো একটি রাজকীয় রাস্তা পরিকল্পনা করেন, যা তুইলেরি বাগান (Tuileries Garden) থেকে পশ্চিমে প্রসারিত হয়। তখন এটিকে বলা হতো ‘Grand Cours’- অর্থাৎ ‘বড় পথ’। আর্কের নিচে আছে অজানা সৈনিকের সমাধি, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯২০ সালে এক অজানা ফরাসি সৈনিকের স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে ‘Eternal Flame’ পুনরায় জ্বালানো হয়। স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা আছে ৬৬০ জন জেনারেল ও বিভিন্ন যুদ্ধের নাম, যা ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের সময়কার। সরাসরি রাস্তা পার হয়ে নয়, নিচের আন্ডারপাস দিয়ে প্রবেশ করে ওপরে উঠে দেখলাম প্যারিস শহরের দৃষ্টিনন্দন অসাধারণ দৃশ্য।

শঁজে লিজের ইতিহাস শুরু হয় রাজা চতুর্দশ লুই–এর শাসনামলে ১৬৬৭ সালে। ১৮শ শতকে রাস্তাটি ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্রের সঙ্গে মিশে যায়। ১৯শ শতকে নেপোলিয়নের আমলে ১৮০০-এর দশকে শঁজে লিজে প্যারিসের বিজয় ও জাতীয় গৌরবের প্রতীক হয়ে ওঠে। রাস্তাটির শেষ প্রান্তে এই তোরণটি স্থাপিত হয়, যা ফরাসি সেনাবাহিনীর বীরত্বকে স্মরণ করে। আজ এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং ফ্রান্সের ইতিহাস ও গর্বের প্রতীক। মানবতার প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।

প্যারিসের হৃদয়ে এক রাজকন্যার স্মৃতি

আমরা শঁজে লিজ অ্যাভিনিউ থেকে হেঁটে আইফেল টাওয়ারের উত্তর দিকে সিন নদীর ধারে পৌঁছালাম, যেখানে স্বাধীনতার শিখা অবস্থিত। ১৯৮৯ সালে ইউরোপে স্ট্যাচু অব লিবার্টি-এর শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এটি ফ্রান্সকে উপহার দিয়েছিল আমেরিকান জনগণ। ১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এই স্থানের ঠিক নিচে টানেলে মারা যান। সেদিন মধ্যরাতে প্রিন্সেস ডায়ানা, তাঁর সঙ্গী ডোডি আল ফায়েদ ও ড্রাইভার অঁরি পল একটি গাড়িতে করে হোটেল থেকে বের হয়েছিলেন। গন্তব্য ছিল ডোডির বাসভবন। তাঁদের গাড়িকে তখন অনেক পাপারাজ্জি (ছবি তোলার সাংবাদিক) মোটরবাইকে অনুসরণ করছিল। দ্রুতগামী অবস্থায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে টানেলের একটি স্তম্ভে ধাক্কা খায়। রি পল ও ডোডি আল ফায়েদ ঘটনাস্থলেই মারা যান। প্রিন্সেস ডায়ানাকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর মৃত্যু হয়।

ফ্লেম অব লিবার্টি (Flame of Liberty) হলো একটি সোনালি মশাল-আকৃতির ভাস্কর্য, যা প্যারিসে স্থাপিত। এটি মূলত স্ট্যাচু অব লিবার্টির মশালের পূর্ণাঙ্গ রেপলিকা। এই ভাস্কর্যটি ১৯৮৯ সালে নির্মিত হয়েছিল ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব উদ্‌যাপন এবং ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন পত্রিকার শতবর্ষ উপলক্ষে। এটি স্বাধীনতা, আলোকিত চিন্তা এবং জাতিসংঘ মানবতার প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল।

ডায়ানার স্মৃতিসৌধে রূপান্তর

ডায়ানার মৃত্যুর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, ‘Flame of Liberty’ এক অনানুষ্ঠানিক স্মৃতিসৌধে পরিণত হয়। কারণ, এটি ছিল দুর্ঘটনাস্থলের ঠিক ওপরে এবং শিখার প্রতীকটি যেন জীবিত রাখে তাঁর মানবতার আলো। সারা বিশ্ব থেকে ভক্তরা প্যারিসে এসে এই স্থানে ফুল, ছবি, চিঠি ও মোমবাতি রেখে শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ সেখানে এসে দাঁড়ায়, তাঁর হাসিমুখের ছবির সামনে নীরবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাই ‘Flame of Liberty’-কে রূপ দিয়েছে ‘Princess Diana Memorial’ নামে পরিচিত এক আবেগঘন স্থানে। প্রথমে এই স্থানটি ডায়ানার নামে স্বীকৃতি পায়নি, কারণ এটি আসলে আমেরিকার বন্ধুত্বের বন্ধুত্বের প্রতীক ছিল।

তবে মানুষের আবেগের চাপে, ২০১৯ সালে প্যারিস সিটি কাউন্সিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে ‘Flame of Liberty’ এখন প্রিন্সেস ডায়ানার স্মৃতিসৌধ হিসেবে বিবেচিত হবে। আজও এটি প্যারিসে ভ্রমণকারীদের অন্যতম জনপ্রিয় ও আবেগঘন স্থান। আজও প্রতিদিন কেউ না কেউ সেখানে ফুল রেখে যায়, দেয়ালজুড়ে লেখা থাকে ‘We love you Diana’, ‘Forever in our hearts’, এমন আরও অনেক মেসেজ দেখে অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। চারধারে দাঁড়িয়ে শত শত ভ্রমণকারীদের নীরবে শ্রদ্ধা জানাতে দেখে মনে হলো মানুষ এখনো তাঁকে ভুলতে পারেনি, ডায়ানা অমর হয়ে থাকবে সবার হৃদয়ে।

* শাহ জালাল ফিরোজ, হেলেনবাড, স্টুটগার্ট, জার্মানি

Read full story at source