এই কাঠামোগত হত্যার দায় কি কেউ নেবে না
· Prothom Alo

দেশের সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থায় কতটা নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে মানুষকে ভুক্তভোগী হতে হয়, তা চরমভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিটি ঈদযাত্রায়। এবারের ঈদযাত্রায়ও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ঈদের ছুটির শুরুর দিকে রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা এবং শেষে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনা গোটা জাতিকে শোকাহত করে তুলেছে। ভয়াবহ এ বাসডুবির ঘটনায় বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের চরম অনিরাপদ ও ভঙ্গুর নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এল।
Visit biznow.biz for more information.
দৌলতদিয়া ঘাটের পদ্মা নদীতে ২৬ জন মানুষের সলিলসমাধি কেবল একটি ‘দুর্ঘটনা’ নয়, এটি কাঠামোগত হত্যা। বাসডুবির ঘটনায় রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অতীতেও এমন অসংখ্য তদন্ত কমিটি হয়েছে, যাদের প্রতিবেদন প্রায়ই হিমঘরে ধুলা জমেছে। দৌলতদিয়া ঘাটের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একটি যাত্রীবাহী বাস কীভাবে নদীতে পড়ে গেল? পন্টুনের নিরাপত্তার অভাব, হাইমাস্ট লাইটের অপ্রতুলতা নাকি বিআইডব্লিউটিসির কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা—এই দায় কার? ফেরিতে গাড়ি ওঠানামার সময় যে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রটোকল থাকার কথা ছিল, তা কেন মানা হয়নি?
বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অভিযোগ, ফেরির জন্য অপেক্ষমাণ সময়ে চালক বাস থেকে নেমে গিয়েছিলেন এবং হেলপার বাসের চালকের আসনে বসেছিলেন। তদন্তের মাধ্যমে বাসচালক ও মালিককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হেলপারের গাড়ি চালানোর ঘটনা সড়কের প্রাণহানি আরও বাড়িয়ে তোলে। এটি যেভাবেই হোক বন্ধ করতেই হবে।
মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানের দাপট, অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া প্রতিযোগিতা এবং ঘাটে ঘাটে অব্যবস্থাপনা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কুমিল্লায় ভয়াবহ ট্রেন-বাস দুর্ঘটনাসহ সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনায় ঈদের ছুটির সাত দিনে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান ঈদযাত্রায় চরম অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা ও কাঠামোগত অবহেলার এক নির্মম দলিল। প্রতিবছর ঈদের আগে ‘নিরাপদ যাত্রা’র গালভরা বুলি আওড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র বলছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবন রক্ষায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন বাস কীভাবে রাজপথ পেরিয়ে ঘাট পর্যন্ত পৌঁছাল, সেই দায় ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটিএ এড়াতে পারে না।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেবল চালক নয়, বরং ঘাটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং ফিটনেসবিহীন বাসকে ছাড়পত্র দেওয়া বিআরটিএ কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দেশের প্রতিটি ফেরিঘাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে কিছু মানুষকে নদী থেকে মানুষ উদ্ধারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ফেরিতে ওঠার আগে গাড়ি থেকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে।
সড়ক, রেল ও নৌপথের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ সেল গঠন করতে হবে, যারা ২৪ ঘণ্টা সরাসরি তদারক করবে। ঈদের আগে নামমাত্র অভিযান না চালিয়ে বছরজুড়ে ফিটনেসবিহীন যান ও ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
দুর্ঘটনায় কেউ পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারান, কেউ সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেন। আক্রান্ত পরিবারগুলোকে সারা জীবন ভুগতে হয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে শুধু নামমাত্র অনুদান নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
রাষ্ট্র ও সরকার যদি দৌলতদিয়ার এ ভয়াবহ ঘটনার সঠিক বিচার ও দায় গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে এমন ট্র্যাজেডি আরও বাড়বে। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে গিয়ে কাউকে যেন আর লাশের মিছিলে শামিল হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এখন সরকারেরই। শোক প্রকাশ অনেক হয়েছে, এবার কঠোর পদক্ষেপ দেখার সময়।