ছোট্ট রাইসা এখনো মাকে খুঁজছে, না পেয়ে কাঁদছে
· Prothom Alo

‘মাত্র দুই বছর চার মাস বয়সী ছোট্ট রাইসা তার আম্মুকে খুঁজে বেড়ায়। খোঁজ করতে করতে মাঝেমধ্যে কান্নাও করতে থাকে। আবার কিছুক্ষণ পর একাই চুপ হয়ে যায়।’ কথাগুলো যখন বলছিলেন, তখন রাইসার বাবা রেজাউল করিমের চোখ ছলছল করছিল। তিনি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাসডুবিতে নিহত মর্জিনা আক্তারের (৩২) স্বামী। ওই ঘটনায় তাঁর মেয়ে রাফিয়া আক্তারও (১২) নিহত হয়েছে।
আজ শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চর বারকিপাড়ায় রেজাউল করিমের গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, নিহত স্ত্রী ও কন্যার জন্য কুলখানির আয়োজন করেছেন। এ উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের জমায়েত হয়েছে। উঠানে রেজাউলকে ঘিরে বসে আছেন স্বজনেরা। তাঁর কাছ থেকে সেদিনের দুর্ঘটনার বর্ণনা শুনছিলেন সবাই।
Visit betsport.cv for more information.
কিছুদিন আগে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানেও ছিলাম, আজ জানাজায়: প্রতিমন্ত্রীঢাকার সাভারে একটি কোম্পানির পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা করেন রেজাউল করিম। সেখানেই স্ত্রী মর্জিনা আক্তার, মেয়ে রাফিয়া আক্তার ও ছোট মেয়ে রাইসা জান্নাতকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। ১৯ মার্চ তাঁদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি চর বারকিপাড়ায় ঈদ উদ্যাপন করতে আসেন। পরে ২৫ মার্চ রেজাউলের কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। পারিবারিক ব্যস্ততার কারণে সেদিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজবাড়ী শহরের বড়পুল থেকে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
সেই দুঃসহ স্মৃতি হাতড়ে রেজাউল করিম বলেন, বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁদের বাস দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে পৌঁছালে কর্তব্যরত বিআইডব্লিউটিসির কর্মীরা ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পাঠিয়ে দেন। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি সেখানে পাঠানো হয়। বাসটি পন্টুনে ওঠার আগে সংযোগ সড়কে দাঁড়িয়ে থাকাকালে দেখা যায়, ঘাটে থাকা একটি ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। আরেকটি ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হবে বুঝে বাসচালক তাঁর সহকারী হালিমকে নিচে নেমে পরিস্থিতি দেখতে বলেন।
উঠানে রেজাউলকে ঘিরে বসে আছেন স্বজনেরা। তাঁর কাছ থেকে সেদিনের দুর্ঘটনার বর্ণনা শুনছিলেন সবাইবাসের সি–১ ও সি–২ নম্বর সিটে বসেছিলেন মর্জিনা ও রাফিয়া আক্তার জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ‘গাড়িতে এক হকার পেয়ারা নিয়ে উঠে। আমার স্ত্রী পেয়ারা খেতে চায়। পেয়ারা কিনে দেওয়ার পর আমাকে খাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। আমি খাব না বললেও সে একপ্রকার জোর করে মুখে তুলে দেয়। এ সময় সে (মর্জিনা) জানায়, সময় চলে যাচ্ছে আসরের নামাজ আদায় করব। পরে তার সিটের সামনে আমি আড়াল হয়ে দাঁড়াই আর ও আসরের নামাজ আদায় করে। ফেরির দেরি দেখে আমি ছোট মেয়ে রাইসাকে নিয়ে বাস থেকে নেমে পন্টুনে গিয়ে দাঁড়াই।’
ধরে আসা গলায় বলে যাচ্ছিলেন রেজাউল। এবার কিছুটা থেমে তিনি বলেন, কিছুক্ষণ পর একটি ছোট ফেরি ঘাটে ভিড়তে দেখেন। হঠাৎ শব্দ পেয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখেন, তাঁদের বাসটি দ্রুতগতিতে পন্টুনের দিকে চলে আসছে। এ সময় কেউ কেউ বলছিল, গাড়ির ব্রেক ফেল করেছে।
পদ্মায় বাসডুবি: তৃতীয় দিনের মতো ডুবুরি দলের অভিযান শুরুতখন চিৎকার করছিলেন জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ‘দেখছিলাম, গাড়ির চালক বারবার ব্রেকে চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু চেষ্টা করেও থামাতে পারছেন না। বাসটি সরাসরি পন্টুনের রেলিংয়ে আঘাত করে চোখের পলকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এক পাশ কাত হয়ে নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে স্ত্রী–মেয়ে পানিতে ডুবে গেল; কাউকে রক্ষা করতে পারলাম না। পরে রাতে বাসটি তোলার পর স্ত্রী ও মেয়ের লাশ শনাক্ত করি।’
ফেরিঘাটে যথাযথ ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে রেজাউল করিম বলেন, ‘ফেরির ভেতর অনেক উঁচু করে চারদিকে রেলিং থাকে, অথচ পন্টুনের চারদিকে কোনো রেলিং নেই। সামান্য একটু উঁচু করে রাখা এতে কোনো গাড়ি আটকে? এ ছাড়া ঘাটের সড়ক অনেক খাড়া হয়ে আছে। এ কারণে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কত টাকা কত দিকে খরচ হয়, দয়া করে ঘাটে নজর দেন।’
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছেলেকে হারিয়ে আজিজ বললেন, ‘আমার কেউ রইল না’