এই যুদ্ধবিরতি কেন পাকিস্তানের ‘সবচেয়ে বড়’ কূটনৈতিক বিজয়
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে সম্মত হয়েছে। এই ঘোষণার আগে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা (এর বেশিরভাগটাই আড়ালে হয়েছে) চলেছে বলে পাকিস্তানের দ্য ডন পত্রিকাকে জানিয়েছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের মতে, পাকিস্তানের ধারাবাহিক মধ্যস্থতা ছাড়া এই অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
Visit sport-tr.bet for more information.
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই ইসলামাবাদ তৎপর হয়ে ওঠে। প্রথম হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি কর্মকর্তারা কয়েকটি দেশের রাজধানীতে কূটনৈতিক যোগাযোগ সক্রিয় করতে শুরু করেন। প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও নীরবে পাকিস্তান নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। উল্লেখ্য, এ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ওয়াশিংটনে ইরানের স্বার্থ রক্ষাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা থাকায় তেহরান ও ওয়াশিংটন দুই রাজধানীতেই পাকিস্তানের একটি বিরল প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরি করে দেয়।
‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি প্রচেষ্টার মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে?’—এমন প্রশ্ন রেখে ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘প্রধান সব পক্ষের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক, হোয়াইট হাউসের আস্থা, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং পাকিস্তানের মিত্র চীনের সমর্থন—এসবই বড় কারণ।’ তিনি আরও বলেন, ‘তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।’
কুগেলম্যানের মতে, ইসলামাবাদের সামনে এগিয়ে আসার যথেষ্ট কারণও ছিল। তিনি বলেন, ‘এই সংঘাতের প্রভাব কী হচ্ছে, তার প্রতি পাকিস্তান বিশেষভাবে সংবেদনশীল। পাকিস্তান এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরার কৌশলগত স্বার্থও রয়েছে।’
পরে এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তান ‘বহু বছরের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য’ অর্জন করেছে।
কুগেলম্যান আরও বলেন, ‘অনেক সংশয়বাদী ও সমালোচকের ধারণাকে পাকিস্তান ভুল প্রমাণ করেছে। তারা মনে করত, এত জটিল ও উচ্চঝুঁকির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার সক্ষমতা পাকিস্তানের নেই।’
৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরান ঘোষণা দেয় যে তারা দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, এর ফলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে এবং সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার পথ খুলবে। বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা এই অচলাবস্থা ভাঙার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ধারাবাহিক মধ্যস্থতাকে—বিশেষ করে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতাকে—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে স্বীকার করেছেন।
ওয়াশিংটনে ইরানবিষয়ক গবেষক ভ্যালি নাসর আরেকটি অপ্রত্যাশিত দিক তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত পোস্টটি শেয়ার করে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুদ্ধবিরতিতে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’ তিনি যোগ করেন, ‘ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এটি দাবি করে আসছিল, তবে এটি সব সময়ই একটি অযৌক্তিক সর্বোচ্চ দাবি বলে মনে হয়েছে। এখন এটি আলোচনায় এসেছে, এটি সত্যিই অপ্রত্যাশিত ফলাফল।’
পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগের সবচেয়ে দৃশ্যমান ধাপটি দেখা যায় ২৯-৩০ মার্চ। সে সময় পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে বৈঠক করেন উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুঁজতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে না দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ শুরু করার একটি কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রস্তাবে ইসলামাবাদে একটি কাঠামোবদ্ধ আলোচনা শুরু করার কথা বলা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আলোচনা শুরু না হওয়ায় কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, উদ্যোগটি ভেস্তে গেছে। কিন্তু কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামাবাদ তখন পিছু না হটে বরং তাদের যোগাযোগ আরও জোরদার করে।
পরবর্তী দিনগুলোয় প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো, তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরবসহ একাধিক দেশের শীর্ষ নেতা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এর লক্ষ্য ছিল আনুষ্ঠানিক আলোচনার পূর্ব ধাপ হিসেবে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা।
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বও এতে ভূমিকা রাখে। কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেসামরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করে।
একই সময়ে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখেন। এর মধ্যে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ছিলেন।
এপ্রিলের শুরুতে ইসলামাবাদ একটি যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রস্তাব ছড়িয়ে দেয়। এই প্রস্তাবে অবিলম্বে সংঘর্ষ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। এর সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দুই পক্ষের একটি কাঠামোবদ্ধ আলোচনা চালানোর কথা বলা হয়। প্রস্তাবে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোয় উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়, যা এই সংকটের একটি প্রধান স্পর্শকাতর বিষয় ছিল।
এ প্রস্তাবে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছিল। কেননা, আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য প্রকট ছিল। তবু বাড়তে থাকা সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সমঝোতার সুযোগ তৈরি করে দেয়। ট্রাম্পের দেওয়া ডেডলাইন শেষ হয়ে আসছিল এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র হচ্ছিল। ফলে পাকিস্তানের প্রস্তাব গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরান ঘোষণা দেয় যে তারা দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে, এর ফলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ থাকবে এবং সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার পথ খুলবে। বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা এই অচলাবস্থা ভাঙার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ধারাবাহিক মধ্যস্থতাকে—বিশেষ করে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার সক্ষমতাকে—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসেবে স্বীকার করেছেন।
ইসলামাবাদের এই ভূমিকা সম্ভব হয়েছে তার অনন্য কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘ ও স্পর্শকাতর সীমান্ত রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরব, তুরস্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গেও তাদের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক রয়েছে, যা উত্তেজনা প্রশমনের প্রক্রিয়ায় গতি আনতে সহায়ক হয়েছে।
এই যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ শুরু হওয়ার কথা ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে। সেখানে বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা একটি আরও টেকসই সমঝোতার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করবেন। এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে এই সীমিত কূটনৈতিক সুযোগকে কতটা কাজে লাগানো যাবে, তার ওপর।
তবে ইসলামাবাদের জন্য এই যুদ্ধবিরতি একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। এটি প্রমাণ করে, জনসমক্ষে কম দৃশ্যমান হলেও ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক সংকটের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
আনোয়ার ইকবাল ডন পত্রিকার ওয়াশিংটন প্রতিনিধি
দ্য ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত