বিসিবিতেও গাদা গাদা জাদা-জাদির গাদাগাদি!
· Prothom Alo

বঙ্গদেশীয় বংশতান্ত্রিক গণতন্ত্রে পৈতৃক দৌলতের বদৌলতে বলশালী পুত্র-কন্যাকুলের মন্ত্র হলো-‘পিতা ত্রাতাঃ; পিতা নেতাঃ, পিতাহি চরম নমস্যঃ’। কারণ এখানে নবাবের পর নবাবজাদা কিংবা সাহেবের পর সাহেবজাদি-শাসিত রাজনীতিতে ‘বাপের সম্পত্তি’ বিরাট ব্যাপার। এখানে ‘পতির ক্ষমতায় সতীর ক্ষমতা’ই শেষ কথা।
রাজনৈতিক গদিগুলোতে গাদা গাদা ‘জাদা-জাদির’ গাদাগাদি এতই যে, এখানে চিনপরিচয়হীন দীনদরিদ্র খুঁটে খাওয়া পরিবার থেকে উঠে আসা নবীন-প্রবীণদের গদিনশীনের ক্ষীণ চেষ্টাকেও হীন চোখে দেখা হয়।
Visit rouesnews.click for more information.
পাল-সেন-সুলতানি-নবাবি আমল থেকে যে পরিবারতান্ত্রিক সিলসিলা চলে এসেছে, গিরিঙ্গিবাজ ফিরিঙ্গি শাসনেও তার অবসান আসেনি।
কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জঠরে জন্মানো জমিদারি জমানা অস্ত গেলেও উপমহাদেশের অ্যারিস্ট্রোক্রেটিক ডেমোক্রেসিতে বেচারা গণতন্ত্র বেয়াড়া পরিবারতন্ত্র ও স্বজনতোষণতন্ত্রের দৌড়ানিতে দাঁড়াতে পারেনি। তাই এখানে হইচই ছাড়াই নেপোটিজমের সাথে সই পাতিয়ে নেপোয় মারে দই।
ভারতে নেহরু বংশে মতিলালের ছেলে জওহরলাল, জওহরের মেয়ে ইন্দিরা, ইন্দিরার ছেলে রাজীব, রাজীবের ছেলে রাহুল; পাকিস্তানে ভুট্টো পরিবারে জুলফিকারের মেয়ে বেনজির, বেনজিরের ছেলে বিলাওয়াল।
এ দেশেও খান্দানি সিলসিলার সিল তিলপরিমাণ ঢিল হয়নি। এই ধারায় আমাদের অনেক লিডারের ফিডার খাওয়া ছেলেপেলে হেসেখেলে নেতা হয়ে গেছেন।
রাজনীতিতে জাদা-জাদির গাদাগাদি ছিল-আছে-থাকবে। আমরা তাদের ক্ষমতার বাড়াবাড়ি আর চেয়ার নিয়ে কাড়াকাড়ির সবটা জেনে নিয়েছি। মেনে নিয়েছি।
তবে এবার মনে হচ্ছে, এই নেপোটিজম অন্য সব ঘাট ঘেঁটে শেষমেশ হেঁটে হেঁটে ক্রিকেটের সেটে ঢুকে সোজা বিসিবির চেয়ারে এঁটে বসেছে।
গত ৭ এপ্রিল বিসিবির আগের কমিটি ভেঙে দিয়ে চক চক করা আনকোরা অ্যাডহক কমিটি বানানো হয়েছে। দেখা গেছে, দুপুরে বিসিবি সভাপতির কেদারায় বসে থাকা আমিনুল ইসলামকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে সন্ধ্যার আগেই অ্যাডহক কমিটির ১১ সদস্য নিয়ে বসে পড়েছেন নতুন সভাপতি তামিম ইকবাল। পেয়ারের চেয়ার হারানো আমিনুল বলেছেন, তাঁর হক নষ্ট করে অ্যাডহক কমিটি করে ‘সাংবিধানিক ক্যু’ করা হয়েছে।
নতুন এই কমিটিতে এমন অন্তত চারজনকে দেখা যাচ্ছে, যাঁদের ক্রিকেটের সঙ্গে কোনোকালে কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা, তা সাধারণ মানুষের একেবারেই অজানা রয়ে গেছে। তবে পর্দার আড়ালে বসে ক্রিকেট বোর্ড যেসব বড় বড় লোক চালান বলে লোকমুখে শোনা যায়, সেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এই চারজনের মধ্যে তিনজন সদস্যের বাপ-ছেলের সম্পর্ক আছে। আর একজনের আছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক।
এই সদস্যদের একজন হলেন বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাস; আরেকজন হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ; তৃতীয়জন হলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু। চতুর্থজন হলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী। তাঁর নাম রাশনা ইমাম।
কষ্ট-কল্পনাবিলাসী কেউ কেউ কামনা করেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে নেপোটিজম থাকবে না; নেপোয় দই মারবে না; বাপের ক্ষমতায় ছেলের শাসন চলবে না। ইলেকশনে বড় দলের নমিনেশন ‘বাপের সম্পত্তি’ হবে না। অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন, দলের জন্য জেল-জরিমানায় জ্বলে খাক হওয়া খাঁটি ত্যাগী নেতারাই নেতৃত্ব ভোগ করবেন।
টক করে করা অ্যাডহক কমিটির দায়িত্বের সীমা তিন মাসে লক করা হয়েছে। এই সিকি বছরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে একটি নির্বাচিত কমিটি করাই হবে তাঁদের কাজ। তবে বোর্ডের অধিপতি হিসেবে সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, সেই কাজের বাইরে তাঁদের একটি ‘প্রথম এবং প্রধান’ কাজ আছে। দামি কাজটি হলো, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটের সুনাম ফিরিয়ে আনা।’
গত কয়েক মাসে আমিনুল ইসলামের কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ আমরা শুনেছি। তাতে বিসিবির নামের চেয়ে বদনাম এবং দুর্নাম শোনা গেছে বেশি। এই অবস্থায় বিসিবিকে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও, আমি তো এখন আর নই কারও’ কায়দায় ফেলে রাখার মানে হয় না। এই জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন উপলব্ধি থেকেই হয়তো অ্যাডহক কমিটি বিসিবির ‘অধিকতর জরুরিভিত্তিক সুনাম পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ হাতে নিতে যাচ্ছে।
তবে কথা হলো, দুর্নামের কালি খালি গায়ে লেগে গেলে, তা তোলা টিনের চালা থেকে কালা আলকাতরা তোলার চেয়ে কঠিন হয়। সুনাম ফেরাতে সময় লাগে। তিন মাসে তা আসে না। কয়েক বছর লাগে।
যেহেতু তামিমের টিমের ‘মূল কাজ’ বাংলাদেশের ক্রিকেটের সুনাম ফেরানো, সেহেতু তাদের তিন মাসের বেশি থাকা দরকার হবে। এর জন্য নিতান্ত দায় ঠেকে হলেও তাঁদের নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নির্বাচিত সভাপতি ও সদস্য হতে হবে।
অ্যাডহক কমিটিতে থেকেই নির্বাচন করলে লোকে দুর্নাম দেবে জেনেও শুধুমাত্র ক্রিকেটের সুনাম ফেরানোর স্বার্থে তিনি নির্বাচন করার বিষয়ে ইতিমধ্যে ‘সদয় সম্মতি জ্ঞাপন’ করেছেন। কমিটির অন্য সদস্যরাও ক্রিকেটের সুনামের স্বার্থে নিজেদের ‘স্বার্থ দিয়া বলি’ একই ধরনের ক্লেশ স্বীকার করে নির্বাচন করবেন বলে ধারণা করি।
নেতার ছেলে এবং নেতার স্ত্রী পরিচয়ের বাইরে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট নিজস্ব পরিচয় বা অভিজ্ঞতা না থাকা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। ক্রিকেটের সুনাম ফেরানোর মতো মহান ইচ্ছাকে বিতর্কিত করার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
বিসিবি কার্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবালঘটনার পরপর সাবেক ক্রিকেটার আফতাব আহমেদ ফেসবুকে ছাড়া এক ভিডিওতে বলছেন, ‘ভাই রে ভাই, যে পরিমাণ সার্কাস চলতেছে ক্রিকেট বোর্ডে, যদি দুই হাজার টাকা খরচ করেও টিকেট কিনেন, আপনার টিকেট বৃথা যাবে না।’
চায়ের দোকান, মহল্লার গলি থেকেও নেতাদের ছেলেদের ও এক নেতার স্ত্রীর বিসিবি সদস্য হওয়া নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। এই সমালোচনা চলে গেছে সংসদেও। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘এখন আর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নাই। এটা এখন বাপের দোয়া ক্রিকেট বোর্ডে পরিণত হয়ে গেছে।’
হাসনাতের এই কথার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ (বিসিবির অ্যাডহক সদস্য সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদের বাবা) বলেছেন, ‘আমরা এই দেশের কৃতি ক্রিকেটার তামিম ইকবালকে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি করেছি। আমরা এখানে কোনো বাপের দোয়া মায়ের দোয়া করি নাই।’ তাঁর এই কথা শুনে আমরা ‘দুঃখ পেলেও খুশি হলাম জেনে।’ কারণ আমরা তো জানিই, আজকের নেতার সন্তান ‘ত্যানা’ হলেও সে আগামী দিনের নেতা।
আমরা যেহেতু বহুলাংশে বংশগত রক্তের ভক্ত, সেহেতু ইউপি থেকে এমপি নমিনেশনে যেসব কালেকশন দেখা যায়, তাদের একটি অংশ পোষ্য কোটায় ইলেকশনকে বাইপাস করে সিলেকশনের মধ্য দিয়ে আসে।
দেখা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান লিটু মিয়ার পর তাঁর ‘আগুনের গোলা’ মার্কা পোলা টিটু মিয়ার জন্য চেয়ারম্যানগিরির পথ খোলা থাকে। এরপর মেরিট থাকুক আর না থাকুক টিটু মিয়ার সিট ইনহেরিট করেন তাঁর ছেলে হিটু মিয়া। বংশানুক্রমিক রাজনীতির ওপর দলগুলোর এই অ্যাফেকশন নিয়ে আমাদের, মানে আমজনতার তেমন কোনো অবজেকশনও নেই। ইউপি থেকে এমপি-সব ইলেকশনে পোষ্যদের হাস্যমুখে চর্ব্য-চোষ্য দিয়ে তোষ্য করাই আমাদের কাজ।
কষ্ট-কল্পনাবিলাসী কেউ কেউ কামনা করেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে নেপোটিজম থাকবে না; নেপোয় দই মারবে না; বাপের ক্ষমতায় ছেলের শাসন চলবে না। ইলেকশনে বড় দলের নমিনেশন ‘বাপের সম্পত্তি’ হবে না। অনেকে হয়তো আশা করেছিলেন, দলের জন্য জেল-জরিমানায় জ্বলে খাক হওয়া খাঁটি ত্যাগী নেতারাই নেতৃত্ব ভোগ করবেন।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নতুন বাংলাদেশের পুরোনো নেতারা সেই আশার গুড়ের গামলায় খাবলাখানিক বালি মেরে দিয়েছেন। ‘নেতার ছেলে’ পরিচয়টাই মুখ্য হয়ে উঠছে। বাপের বলে ছেলে বলশালী হলে তলের নেতাদের দলের না হলেও চলে।
এ নিয়ে খোলাখুলি মুখ খুললেও পদে পদে বিপদ আসছে। তাই বাড়িতে বসে বড়জোর বিড়বিড় করে দাঁত কিড়িমিড়ি দিয়ে বঞ্চনার ব্যথা সয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ওয়ে থাকছে না।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
sarfuddin2003 @gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব