ফিটনেস মানে শুধু মাসল তৈরি নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রে টিকে থাকার সক্ষমতা: রুসলান হোসেন
· Prothom Alo

তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় দ্বাদশতম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ‘রুসলানস স্টুডিও’র প্রতিষ্ঠাতা রুসলান হোসেন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘ডিসিপ্লিন, ট্রান্সফরমেশন এবং শূন্য থেকে বাংলাদেশের ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রি গড়ার গল্পে রুসলান হোসেন’।
‘জীবনে কোনো কিছু অর্জন করতে চাইলে লক্ষ্যটির প্রতি আন্তরিক হতে হয় ও কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ রাখতে হয়। আজ করলাম, কাল করলাম না—এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে কোনো কাজে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন রুসলান হোসেন। পর্বটি প্রচারিত হয় গত রোববার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
শৈশবে জাংক ফুডের প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল রুসলান হোসেনের, ফলে তাঁর ওজন ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে তিনি কীভাবে ফিটনেসের দিকে ঝুঁকলেন?
Visit extonnews.click for more information.
উত্তরে রুসলান হোসেন বলেন, ‘যখন আমি স্কুলে পড়তাম, তখন বেশ ওভারওয়েট ছিলাম। এ কারণে বন্ধুরা আমাকে নিয়ে মজা করত। তখন থেকেই আমার মাথায় ছিল, একজন মানুষের লুকের একটা গুরুত্ব আছে। এটা যেমন একটা কারণ ছিল, তেমনি আরেকটা বিষয়ও ছিল—আমি ফিট ছিলাম না। একসময় আমার মা আমার ফিটনেস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই দুই বিষয় আমাকে ভাবতে বাধ্য করে—কিছু একটা পরিবর্তন করতেই হবে। সেখান থেকেই আমার ফিটনেস–যাত্রা শুরু।’
ফিটনেসের সংজ্ঞাটা আপনার কাছে কী—জানতে চাইলে রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমার কাছে ফিটনেস মানে শুধু পেশিবহুল শরীর নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে টিকে থাকার ক্ষমতা—সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট।’ তিনি বলেন, ফিটনেস একজন মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে সাহায্য করে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করে।
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ২০০৯ সালে মা–বাবার ডাইনিংরুম থেকে একটি ফিটনেস স্টুডিও শুরু করেছিলেন—নিজেকে পরিবর্তন থেকে শুরু করে এই স্টুডিও গড়ে তোলার গল্পটা কী?
রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমার ট্রান্সফরমেশনটা শুধু শরীরের ছিল না, আমার পুরো লাইফস্টাইলই বদলে যায়। এটা দেখে আমার বন্ধুরা আমাকে বলত, আমি যেন নিজের একটা স্টুডিও শুরু করি। সেখান থেকেই চিন্তা শুরু। তখন বাংলাদেশে নিউট্রিশন নিয়ে সচেতনতা খুবই কম ছিল। ডায়েট মানেই মানুষ ভাবত কম খাওয়া বা বেশি খাওয়া। কিন্তু কী খেতে হবে, কখন খেতে হবে—এসব নিয়ে ধারণা ছিল না। পাশাপাশি মেয়েদের জন্য ভালো মানের জিমও তেমন ছিল না। পরে আমি বাবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি ও পাশের একটি রুম ব্যবহার করার অনুমতি চাই। মা–বাবা রাজি হন। এভাবেই “রুসলানস স্টুডিও”র যাত্রা শুরু হয়।’
স্টুডিওর শুরুর সময় ক্লায়েন্টদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল—জানতে চাইলে রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমার বেশির ভাগ ক্লায়েন্টই করপোরেট সেক্টরের ছিল এবং তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা দারুণ ছিল। শুরু থেকেই অনেকে আমার কাছে ট্রেনিং নিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। জায়গার সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমি কাউকে ফিরিয়ে দিইনি। প্রয়োজন হলে খুব ভোরবেলাতেও ট্রেনিং দিয়েছি। বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রচুর উৎসাহ পেয়েছি, যা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’
আপনার ব্যক্তিগত ট্রেইনারের কাছ থেকে এমন কী শিখেছেন, যা আপনার কাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমার ট্রেইনার প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী ধরনের বডি চাই। প্রশ্নটা আমাকে অবাক করেছিল। পরে বুঝেছি, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে নিজের মতো করে শরীর গঠন করা সম্ভব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি—ধারাবাহিকতা ও আন্তরিকতা। আজ করলাম, কাল করলাম না—এভাবে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, আপনি কেন সীমিতসংখ্যক ক্লায়েন্ট নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন?
উত্তরে রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমি কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটিকে বেশি গুরুত্ব দিই। কম মানুষ নিয়ে কাজ করলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে সময় দেওয়া যায় ও তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়। এতে ফলাফলও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই হয়।’
বর্তমান সময়ে তরুণদের মধ্যে ফিটনেস নিয়ে আগ্রহ বাড়ার কারণ সম্পর্কে রুসলান হোসেন বলেন, ‘এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব রয়েছে, প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। সবাই নিজেকে ভালো দেখতে চায়, মানসিকভাবে শক্ত হতে চায়। এই বিষয়গুলোই তরুণদের ফিটনেসের দিকে টানছে।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ফিটনেসে নিউট্রিশনের ভূমিকা কতটা?
রুসলান হোসেন বলেন, ‘নিউট্রিশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ছাড়া ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়। নিজের শরীরের ধরন বুঝতে হবে এবং ধরন বুঝে কী খাচ্ছি, তা জেনে চলা খুব জরুরি।’
বাংলাদেশে ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে রুসলান হোসেন বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনশক্তি। যদি আমরা এটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে রুসলান হোসেন বলেন, অনেকেই মনে করেন ফিটনেস খুব ব্যয়বহুল। কিন্তু ধারণাটি সঠিক নয়। চাইলেই ফিট থাকা সম্ভব। হাঁটা, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ—এসব দিয়েই ফিটনেস জার্নি শুরু করা যায়। ইউটিউবেও এখন প্রচুর তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা নিজেরাই ফিটনেসকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল করে ফেলি। এ ছাড়া ডায়েটও কিন্তু খুব যে ব্যয়বহুল তা কিন্তু নয়। আমাদের আশপাশেই এমন সহজলভ্য খাবার আছে যেমন ভাত, ডাল, স্থানীয় খাবার। সঠিক পরিমাণে ও সচেতনভাবে খেলে সহজেই ডায়েট মেইনটেইন করা সম্ভব।’