জিন কেন সব সময় কাজ করে না
· Prothom Alo

জীবনের নীল নকশা ডিএনএ। কিন্তু শরীরের সব কোষে একই ডিএনএ থাকার পরও চোখের কোষ ও যকৃতের কোষের কাজ কেন সম্পূর্ণ আলাদা হয়? এই নকশা কখন কীভাবে কাজ করবে, তা ঠিক করে কে? উত্তর লুকিয়ে আছে জিনের এক জাদুকরী সুইচে! হ্যাঁ, জিন সব সময় কাজ করে না; প্রয়োজন বুঝে চালু ও বন্ধ হয়। ১৯৫০-এর দশকে জ্যাক মনো এবং ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব কীভাবে ছোট্ট এক ব্যাকটেরিয়ার ভেতর জিনের এই অন-অফ রহস্য আবিষ্কার করেছিলেন? চলুন জেনে নিই মলিকুলার বায়োলজির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের গল্প।
Visit sport-tr.bet for more information.
এরউইন চারগাফ যখন নিউইয়র্কের নির্জন ল্যাবরেটরিতে ডিএনএর জটিল গাণিতিক অনুপাত মেলানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই আটলান্টিকের ওপারে অন্য এক ল্যাবে আরেকটি প্রশ্ন ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল। নিউইয়র্কে বসে তিনি সংখ্যার সমীকরণে প্রকৃতির নিয়মগুলো মেলাতে চাইছিলেন। যেমন অ্যাডেনিন (A) ও থাইমিন (T) সমপরিমাণ হবে এবং গুয়ানিন (G) হবে সাইটোসিনের (C) সমান। বারবার পরীক্ষা, বারবার যাচাই, এবং প্রতিবারই একই ফলাফল। যেন প্রকৃতি নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে, ডিএনএ কোনো এলোমেলো অণু নয়; এর ভেতরে এক অমোঘ নিয়ম লুকিয়ে আছে।
ঠিক একই সময়ে ইউরোপের অন্য প্রান্তে, প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের পুরোনো ভবনের চিলেকোঠায় একদল বিজ্ঞানী ভাবছিলেন ভিন্ন এক প্রশ্ন নিয়ে। ডিএনএ-ই যদি জীবনের নীল নকশা হয়, তবে কোষ সেই নির্দেশ পড়ে কীভাবে? শরীরের প্রতিটি কোষে একই ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও চোখের কোষ ও যকৃতের কোষের কাজ কেন আলাদা? কোন শক্তি বলে দেয়, কখন একটি জিন সক্রিয় হবে আর কখন নীরব থাকবে?
বাঁ থেকে জ্যাক মনো, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব ও আন্দ্রে ল্যোভডাবল হেলিক্সের সেই বিখ্যাত প্যাঁচানো গঠন তখনো দুনিয়ার সামনে আসেনি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন, ডিএনএই জীবনের আসল চাবিকাঠি। চারগাফ তো আগেই ডিএনএর ভেতরের বর্ণমালার এক অদ্ভুত ভারসাম্য আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে A ও T, কিংবা G ও C জোড়ায় জোড়ায় থাকে। কিন্তু জীবন কি শুধুই বর্ণমালার বিন্যাস? মোটেও না। জীবন মানে সেই অক্ষরগুলো ব্যবহারের সঠিক সময় এবং নিয়ন্ত্রণের এক রোমাঞ্চকর গল্প।
বিজ্ঞানীদের সামনে তখন নতুন সব পাহাড়প্রমাণ চ্যালেঞ্জ। একটা কোষ ঠিক কখন প্রোটিন বানাবে? কখন আবার কাজ থামিয়ে দেবে? বাইরের পরিবেশ বদলালে কোষ কীভাবে সেই সংকেত বুঝে নিজেকে মানিয়ে নেয়? একদিকে তখন চলছিল ডিএনএর ভৌত কাঠামো বোঝার লড়াই, অন্যদিকে কাজের ধরন বোঝার চেষ্টা। যেন একই মহাকাব্যের দুটি আলাদা অধ্যায়—একটি স্থির কাঠামো, অন্যটি নিরন্তর গতির খেলা। এই গতির রহস্য ঘিরেই শুরু হলো জিন নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস।
ডান–বাঁয়ের ব্যাপারটা কি জিন–নিয়ন্ত্রিত?চারগাফ তো আগেই ডিএনএর ভেতরের বর্ণমালার এক অদ্ভুত ভারসাম্য আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, কীভাবে A ও T, কিংবা G ও C জোড়ায় জোড়ায় থাকে।
যুদ্ধের পর ল্যাবরেটরিতে নতুন প্রশ্ন
প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট তখন এক অদ্ভুত সময় পার করছে। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা কাটিয়ে শহরটা কেবল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কিন্তু মানুষের মনে সেই নাৎসি দখলদারত্ব, গোপন বৈঠক ও প্রতিরোধের স্মৃতিগুলো দগদগে। ভয় ও অনিশ্চয়তার সেই দিনগুলো কাটিয়ে যাঁরা বেঁচে ফিরেছেন, জীবনের প্রতি তাঁদের দেখার ভঙ্গিটাই বদলে গেছে। যুদ্ধ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনের সেই কেন আর কীভাবের প্রশ্নগুলো থামেনি। বরং তা আরও গভীরে শেকড় গেড়েছে।
পাস্তুর ইনস্টিটিউটের পুরোনো ভবনের সেই কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে দেখা যেত অন্য এক জগৎ। সেখানে ল্যাবরেটরিগুলোতে ফিরতে শুরু করেছে প্রাণের স্পন্দন। কাঁচের টেস্টটিউব, ধাতব যন্ত্রপাতি ও নোটবইয়ের পাতায় ছড়িয়ে থাকা গাণিতিক হিসাব—সবই নতুন করে সাজানো হচ্ছে। সেখানেই কাজ করছিলেন জ্যাক মনো।
১৯৫০-এর দশকের প্যারিস ও পাস্তুর ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারের পরিবেশযুদ্ধের সময় মনো শুধু একজন নিভৃতচারী বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক। জীবন-মৃত্যুর খুব কাছ থেকে দেখা সেই দিনগুলো মনোকে আগাগোড়া বদলে দিয়েছিল। তাঁর চিন্তায় যুক্ত হয়েছিল এক গভীর দার্শনিক বোধ। তিনি শুধু পরীক্ষার ফল জেনেই শান্ত হতেন না; তিনি খুঁতখুঁতে মনে জানতে চাইতেন, কেন এমনটা হয়? প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মের আড়ালে কি কোনো যৌক্তিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে?
মেধাও কি জিন–নিয়ন্ত্রিত?যুদ্ধের সময় মনো শুধু একজন নিভৃতচারী বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের এক লড়াকু সৈনিক।
ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে মনোর পাশে এসে দাঁড়ালেন আরেক অনন্য প্রতিভা, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব। তাঁর জীবনটাও ছিল যুদ্ধের আগুনে পোড়া। তরুণ বয়সে জ্যাকবের স্বপ্ন ছিল, তিনি একজন নামকরা সার্জন হবেন। কিন্তু বিধাতা হয়তো তাঁর জন্য অন্য কোনো নকশা তৈরি করে রেখেছিলেন। যুদ্ধে তিনি এতই গুরুতর আহত হলেন যে, তাঁর সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। যে হাত দিয়ে জটিল সব অস্ত্রোপচার করার কথা ছিল, সেই হাত তখন কাঁপছে। অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে ছুরি-কাঁচি চালানো তাঁর পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।
জ্যাক মনোজীবন যখন এক দেয়াল তুলে দিল, জ্যাকব তখন অন্য এক পথ খুঁজে নিলেন। শেষ পর্যন্ত গবেষণাগারই হয়ে উঠল তাঁর নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। তবে এবারের লড়াইটা ছিল অজানার বিরুদ্ধে, প্রকৃতির রহস্যের বিরুদ্ধে। জ্যাকব ছিলেন অসম্ভব শান্ত ও ধীরস্থির মানুষ। যুদ্ধ তাঁকে শিখিয়েছিল, তাড়াহুড়ো করে কোনো বড় জয় আসে না। সত্যকে উন্মোচন করতে হলে সীমাহীন ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তাঁর এই ধৈর্যই পরে জিন নিয়ন্ত্রণের রহস্য খুঁজে পেতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
প্রত্নতত্ত্বে জিন প্রকৌশলতরুণ বয়সে জ্যাকবের স্বপ্ন ছিল, তিনি একজন নামকরা সার্জন হবেন। কিন্তু যুদ্ধে তিনি এতই গুরুতর আহত হলেন যে, তাঁর সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া থেকে বিশাল আবিষ্কারের শুরু
এরপর শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক যাত্রা। দুই বিজ্ঞানী একসঙ্গে কাজ করতে বসলেন। তাঁদের সামনে রাখা অতি সাধারণ এক ব্যাকটেরিয়া, নাম ই. কোলাই। বাইরে থেকে দেখলে এর বিশেষ কোনো মহিমা নেই। কিন্তু জ্যাকব ও মনোর চোখে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবটিই হয়ে উঠল জীবনের এক বিশাল জানালা। তাঁরা যেন এই খুদে জানালার ওপারেই দেখতে পাচ্ছিলেন গোটা প্রাণের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
তাঁদের মনে তখন হাজারো প্রশ্ন। একটি কোষ ঠিক কীভাবে বুঝতে পারে, কখন তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট জিন চালু করতে হবে? কখন সেটিকে একদম চুপ করে রাখতে হবে? বাইরের পরিবেশের কোনো বদল কি আড়ালে থাকা জিনের আচরণকেও বদলে দিতে পারে?
জিন নিয়ন্ত্রণ গবেষণার অন্যতম প্রধান মডেল ব্যাকটেরিয়া ই. কোলাইপাস্তুর ইনস্টিটিউটের সেই পুরোনো ল্যাবরেটরিতে তখন কোনো হইচই নেই, নেই কোনো বড়সড় ঘোষণা। সেখানে শুধু চলছে নিবিড় আলোচনা, কাটাকুটি ও সূক্ষ্ম সব গাণিতিক হিসাব। কিন্তু সেই শান্ত ঘরটিতেই জন্ম নিচ্ছিল এক যুগান্তকারী ধারণা। তাঁরা বুঝতে পারলেন, ডিএনএ কেবল একটি নিশ্চল কাঠামো নয়; এর ভেতরে আছে অদৃশ্য সব সুইচ। এক জাদুকরী কলকাঠি, যা ঠিক করে দেয় ঠিক কখন কোন প্রোটিন তৈরি হবে।
ক্রীড়াজগতে জিন প্রকৌশলপাস্তুর ইনস্টিটিউটের সেই পুরোনো ল্যাবরেটরিতে তখন কোনো হইচই নেই, নেই কোনো বড়সড় ঘোষণা। সেখানে শুধু চলছে নিবিড় আলোচনা, কাটাকুটি ও সূক্ষ্ম সব গাণিতিক হিসাব।
জিনেরও কি অন-অফ সুইচ আছে
পাস্তুর ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতে করতে মনো এক অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন। একটি ছোট্ট ব্যাকটেরিয়া—ই. কোলাই তার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে নিজের আচরণ বদলে ফেলছে! যখন তার আশপাশে ল্যাকটোজ থাকে, তখন সে ল্যাকটোজ হজম করার জন্য একটি বিশেষ এনজাইম তৈরি করে। এর নাম বিটা-গ্যালাক্টোসিডেজ। এই এনজাইম ল্যাকটোজ ভেঙে ব্যাকটেরিয়াকে শক্তি জোগায়।
বিটা-গ্যালাক্টোসিডেজ এনজাইমকিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, ল্যাকটোজ না থাকলে ব্যাকটেরিয়াটি আর সেই এনজাইম তৈরি করে না। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই একে বলতেন অভিযোজন বা মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু মনো এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, এই মানিয়ে নেওয়ার আসল মানে কী? ব্যাকটেরিয়া কি সচেতনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো সূক্ষ্ম জৈব-রাসায়নিক কলকাঠি?
তিনি আরও গভীরে গিয়ে ভাবলেন, একটি জিন হঠাৎ কীভাবে জেগে ওঠে? জিন তো ডিএনএর অংশ, যা তার নিজের জায়গায় স্থির থাকে। তাহলে কীভাবে তার কাজ শুরু বা বন্ধ হয়? জিনের সামনে কি কোনো প্রহরী বসে থাকে, যে হুকুম দেয়—এখন কাজ শুরু করো বা এখনই থামো? এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে জিনের নিয়ন্ত্রণ বা জেনেটিক রেগুলেশনের ধারণার দিকে ঠেলে দেয়।
জিন শব্দটি কীভাবে পেলামঅবাক করা বিষয় হলো, ল্যাকটোজ না থাকলে ব্যাকটেরিয়াটি আর সেই এনজাইম তৈরি করে না। বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই একে বলতেন অভিযোজন বা মানিয়ে নেওয়া।
পাজামো এক্সপেরিমেন্ট: প্রথম প্রমাণ
পাস্তুর ইনস্টিটিউটের করিডোরে তখন দিনরাত আলোচনা চলছে ল্যাকটোজ ও জিনের সুইচ নিয়ে। জ্যাক মনো ও ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবের সেই ভাবনার মিছিলে যোগ দিলেন আমেরিকান বিজ্ঞানী আর্থার পার্ডি। তিনজনের লক্ষ্য তখন একটাই—শুধু অনুমান নয়, এবার হাতেনাতে প্রমাণ চাই।
তাঁরা এমন এক পরীক্ষার পরিকল্পনা করলেন যা জিনের নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চোখের সামনে তুলে ধরবে। তখনকার সময়ে এটি ছিল এক দুঃসাহসী ও বিপ্লবী ভাবনা। তাঁরা বেছে নিলেন ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন বা জিন স্থানান্তরের এক প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এটি অনেকটা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়ায় তথ্যের আদান-প্রদান।
তাঁরা দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়া নিলেন। একদল এনজাইম তৈরি করতে পারে (দাতা), আর অন্যদল পারে না (গ্রহীতা)। দাতা ব্যাকটেরিয়া থেকে ল্যাকটোজ হজমের জিন যখন গ্রহীতা কোষে ঢুকল, দেখা গেল গ্রহীতা কোষটি এনজাইম তৈরি করতে শুরু করেছে। এটুকু পর্যন্ত প্রত্যাশিতই ছিল।
আসল মোড় এল পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপে। তাঁরা জিনের সঙ্গে যোগ করলেন এক বিশেষ উপাদান, নাম দিলেন ‘i জিন’। পরে জানা গেল, এই i জিন-ই হলো সেই কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণকারী জিন। এই জিনটি এক বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে, যার কাজ হলো ল্যাকটোজ হজমের জিনকে পাহারা দেওয়া।
দাতা কোষ থেকে যখন এই i জিনটি গ্রহীতা কোষে প্রবেশ করল, বিজ্ঞানীরা বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করলেন, কীভাবে জিনের কাজ মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক পরীক্ষাই বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘পাজামো এক্সপেরিমেন্ট’ নামে পরিচিত। এর নামকরণ করা হয়েছে দাতা ও বিজ্ঞানীদের নামের আদ্যক্ষর (Pardee, Jacob, Monod) দিয়ে। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই মানুষ প্রথম জানতে পারল, জিনের ভেতর সত্যিই সুইচ আছে!
জিন প্রকৌশলে ক্রিসপারi জিন-ই হলো সেই কাঙ্ক্ষিত নিয়ন্ত্রণকারী জিন। এই জিনটি এক বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে, যার কাজ হলো ল্যাকটোজ হজমের জিনকে পাহারা দেওয়া।
রিপ্রেসার: জিনের এক রহস্যময় প্রহরী
পাজামো পরীক্ষার শুরুতে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে বিজ্ঞানীরা চমকে গেলেন। গ্রহণকারী কোষে তখনো ল্যাকটোজ নেই, অথচ অবাক কাণ্ড; ব্যাকটেরিয়াটি ঠিকই এনজাইম তৈরি শুরু করে দিয়েছে! এ তো অনেকটা সেই গল্পের মতো—ঘরে চিনি নেই, তবু কেউ যেন আয়েশ করে চা বানিয়ে ফেলেছে!
এমনটা কেন হলো? কারণ, গ্রহণকারী কোষটি ছিল ‘i⁻’। মানে তার ল্যাক জিনের সামনে কোনো প্রহরী বা রিপ্রেসার ছিল না। রিপ্রেসার না থাকায় জিনটি ছিল অনেকটা খোলা দরজার মতো। পরিবেশে ল্যাকটোজ থাকুক আর না থাকুক, সে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিল।
কিন্তু গল্পের আসল মোড় এল একটু পরেই। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, কিছুক্ষণ পর এনজাইম তৈরি আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেল। কেন? কারণ, দাতা কোষ থেকে আসা সুস্থ ‘i⁺’ জিনটি ততক্ষণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সে তৈরি করে ফেলেছে রিপ্রেসার প্রোটিন। আর সেই প্রোটিন গিয়ে ল্যাক জিনের সামনে পাহারাদারের মতো বসে পড়েছে। ব্যস, জিনের কাজ বন্ধ!
একনজরে ল্যাক অপেরনের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াএই আবিষ্কার ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু এক মহাবিপ্লব। প্রথমবারের মতো মানুষের কাছে পরিষ্কার হলো, জিন সব সময় নিজে নিজে কাজ করে না। তার ওপর খবরদারি করার জন্য একধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রোটিন থাকে। ঠিক এই মুহূর্তেই জন্ম নিল জেনেটিক সুইচ বা জিনের অন-অফ সুইচ ধারণা। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন, জীবনের ভাষা মানে শুধু ডিএনএতে লেখা কিছু বর্ণমালা নয়; সেই ভাষা পড়ারও একটা নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলা আছে।
অস্ত্রের নাম জিন ড্রাইভল্যাক জিনের সামনে কোনো প্রহরী বা রিপ্রেসার ছিল না। রিপ্রেসার না থাকায় জিনটি ছিল অনেকটা খোলা দরজার মতো। পরিবেশে ল্যাকটোজ থাকুক আর না থাকুক, সে আপন মনে কাজ করে যাচ্ছিল।
ব্যাকটেরিয়ার মস্তিষ্কে এক ছোট সিদ্ধান্ত
এই পর্যবেক্ষণটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ এটি প্রমাণ করল, জিন কোনো স্থবির বা জমানো নির্দেশ নয়। এটি একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা, যা ঠিক সময়ে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। কোষের ভেতরে যেন একটি ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা আছে, যেখানে একদল প্রোটিন এসে বলে দেয়, ‘এখন কাজ করো’ বা ‘এখন থামো’।
অতি ক্ষুদ্র একটি ব্যাকটেরিয়ার ভেতরেও এমন সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকতে পারে। এই ধারণাটি তখন ছিল একেবারে নতুন। পাজামো পরীক্ষা বাইরে থেকে দেখতে ব্যাকটেরিয়ার ছোট একটি পরীক্ষা মনে হলেও, এর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আধুনিক মলিকুলার বায়োলজির ভিত্তি। এই পরীক্ষার ফলাফলগুলোই পরবর্তী সময়ে জন্ম দিয়েছিল বিখ্যাত অপেরন মডেলের।
অপেরন: জিনের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সংসার
পাজামো পরীক্ষার ফলাফলগুলো কিন্তু এক দিনেই বিজ্ঞানীদের সামনে সব রহস্য পরিষ্কার করে দেয়নি। এর জন্য লেগেছে মাসের পর মাস নিবিড় আলোচনা, ল্যাবরেটরির ব্ল্যাকবোর্ডে হাজারো আঁকিবুঁকি ও নোটবইয়ের পাতায় অগণিত হিসাব। ধীরে ধীরে জ্যাকব ও মনো বুঝতে পারলেন, জিন কোনো নিঃসঙ্গ দ্বীপ নয়। জিন একা কাজ করে না; বরং তার চারপাশে আছে এক সুসংগঠিত কাঠামো, যা তাকে সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই অভাবনীয় ভাবনা থেকেই জন্ম নিল ‘অপেরন’ ধারণা। তাঁরা কল্পনা করলেন, ল্যাক জিনের ঠিক সামনেই আছে একটি বিশেষ জায়গা। তাঁরা এর নাম দিলেন ‘অপারেটর’। এটি অনেকটা দরজার সামনে ঝোলানো মজবুত তালার মতো। রিপ্রেসার প্রোটিন যদি সেখানে এসে বসে থাকে, তবে জিনের কাজ করার সব পথ বন্ধ।
আরএনএ পলিমারেজ এনজাইমএখানেই শেষ নয়, এই ব্যবস্থায় আছে প্রোমোটার নামের আরেকটি অঞ্চল। এখানে এসে বসে আরএনএ পলিমারেজ নামে এক এনজাইম। এই এনজাইমটি অনেকটা মেশিনের স্টার্ট বাটন চাপার মতো কাজ করে। পুরো ব্যবস্থাটিকে তদারকি করার জন্য আছে একটি নিয়ন্ত্রণকারী জিন, যে নিয়মিত রিপ্রেসার বা সেই প্রহরী তৈরি করে যায়।
তথ্য, সেই তথ্য পড়ার মঞ্চ, কাজ থামানোর প্রহরী ও শুরু করার সুইচ—এই সবকিছু নিয়ে তৈরি হওয়া এই আস্ত ইউনিটের নামই হলো অপেরন। এটি জীববিজ্ঞানে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এল। আগে জিনকে ভাবা হতো শুধু কিছু তথ্যের টুকরো। কিন্তু এখন দেখা গেল, জিন আসলে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার অংশ।
জিন ব্যাংকআরএনএ পলিমারেজ এনজাইমটি অনেকটা মেশিনের স্টার্ট বাটন চাপার মতো কাজ করে। পুরো ব্যবস্থাটিকে তদারকি করার জন্য আছে একটি নিয়ন্ত্রণকারী জিন, যে নিয়মিত রিপ্রেসার তৈরি করে যায়।
জীবন যখন এক সুসংগঠিত ব্যবস্থা
বাইরে ল্যাকটোজ এলে রিপ্রেসার সরে যায়, আর জিন তড়িৎগতিতে কাজ শুরু করে। ল্যাকটোজ ফুরিয়ে গেলে রিপ্রেসার আবার ফিরে আসে, জিনও অমনি চুপ হয়ে যায়। তার মানে, জিন কেবল খাতার পাতায় লিখে রাখা কোনো নীরব অক্ষর নয়। সে পরিবেশ বুঝে কথা বলতে জানে, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে চুপ করে থাকাও চেনে।
এই আবিষ্কারের পর থেকেই জীববিজ্ঞানের দুনিয়ায় বদলে গেল সব প্রশ্ন। আগে সবাই জানতে চাইত, ডিএনএর গঠন কেমন? এখনকার প্রশ্ন হলো, ডিএনএ ঠিক কীভাবে ব্যবহৃত হয়? কোষ কীভাবে বেছে নেয় ঠিক কোন জিনটি সে পড়বে আর কোনটা এড়িয়ে যাবে? জীবন তখন আর শুধু হাজার হাজার অক্ষরের সমষ্টি রইল না; জীবন হয়ে উঠল এক চমৎকার নিয়ন্ত্রিত, সময়মতো চালু ও বন্ধ হওয়া এক জাদুকরী ব্যবস্থার নাম। অপেরন ধারণাটিই মূলত বিজ্ঞানের সেই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
mRNA: জিনের সেই অদৃশ্য বার্তাবাহক
পাজামো পরীক্ষার ধাঁধা যখন ধীরে ধীরে মিলছিল, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবের মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্য এক প্রশ্ন। তিনি শুধু জিনের সুইচ নিয়ে ভাবছিলেন না; তিনি ভাবছিলেন পুরো ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে কীভাবে?
ল্যাকটোজ আসার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যাকটেরিয়া এনজাইম তৈরি শুরু করে দেয়। এত কম সময়ে এটা সম্ভব হচ্ছে কীভাবে? যদি প্রতিবার নতুন প্রোটিন তৈরির জন্য আস্ত একটা নতুন রাইবোজোম (প্রোটিন তৈরির কারখানা) বানাতে হতো, তবে তো অনেক সময় লাগত। আবার কোষের ভেতরে আগে থেকেই যে রাইবোজোমগুলো আছে, তারাই বা হুট করে কীভাবে বুঝে ফেলছে যে এখন ঠিক কোন জিনের প্রোটিন বানাতে হবে?
ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবজ্যাকব বুঝতে পারলেন, ডিএনএ থাকে কোষের এক জায়গায় (নিউক্লয়েড অঞ্চল), আর প্রোটিন তৈরি হয় অন্য জায়গায় (রাইবোজোমে)। তার মানে, মাঝখানে নিশ্চয়ই কেউ একজন আছে। এমন এক বার্তাবাহক, যে ডিএনএ থেকে তথ্য নিয়ে রাইবোজোম পর্যন্ত দৌড়ে যায়।
তিনি কল্পনা করলেন এক রহস্যময় অণুর কথা। এটি কোষে স্থায়ীভাবে পড়ে থাকবে না; কাজ শেষ হলেই ভেঙে যাবে। তিনি মনে মনে এর নাম দিলেন ‘X’। তখন পর্যন্ত এই ‘X’-কে কেউ চোখে দেখেনি। কিন্তু যুক্তি বলছিল, এমন কিছু না থাকলে এত দ্রুত প্রোটিন তৈরি হওয়া অসম্ভব। ব্যাপারটা অনেকটা অফিসের সেই ভল্টে রাখা মূল দলিলের মতো। মূল দলিল কেউ ভল্ট থেকে বের করে না, বরং দরকার হলে তার একটা ফটোকপি বা খসড়া কর্মীদের হাতে দেওয়া হয়। কাজ শেষে সেই কাগজ ফেলে দেওয়া যায়।
জিন-রহস্য এবং জিনোম সিকোয়েন্সজিনের কাজ সুনিয়ন্ত্রিত। পরিবেশের সংকেত সরাসরি জিনকে প্রভাবিত করতে পারে। জিনের সামনে প্রহরী প্রোটিন বসতে পারে, আবার প্রয়োজন বুঝে সেই বাধা সরেও যেতে পারে।
কল্পনার X যখন সত্যি হলো
ডিএনএ হলো সেই মূল দলিল, আর রাইবোজোম হলো তার কারখানা। জ্যাকবের সেই কল্পিত X হলো সেই ফটোকপি, যা তথ্য বয়ে নিয়ে যায়। কিছুদিন পর, ১৯৬১ সালে সিডনি ব্রেনার, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং ম্যাথিউ মেসেলসন এক যুগান্তকারী পরীক্ষায় প্রমাণ করলেন, সত্যিই কোষে এমন এক ক্ষণস্থায়ী আরএনএ তৈরি হয়। এর আয়ু খুব কম, কিন্তু কাজ বিশাল; প্রোটিন তৈরির নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া। এই অণুটির নাম দেওয়া হলো মেসেঞ্জার আরএনএ বা mRNA।
আজ আমরা খুব সহজেই স্কুলে শিখি: DNA → RNA → Protein। কিন্তু সে সময় এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য নতুন চিন্তা। আর এই বৈপ্লবিক ধারণার বীজ রোপিত হয়েছিল সেই পাজামো পরীক্ষার সময়। জিন কেন চালু বা বন্ধ হয়—এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিয়েছিল আরেক বড় প্রশ্ন: তথ্য ভ্রমণ করে কীভাবে? জ্যাকবের সেই অদৃশ্য X কোনো নিছক কল্পনা ছিল না; তা ছিল প্রখর এক বৈজ্ঞানিক যুক্তির ফল।
সরলতার ভেতর মহাবিপ্লব
বাইরে থেকে দেখলে পাজামো এক্সপেরিমেন্ট খুব সাধারণ মনে হতে পারে। এখানে কোনো ঝকঝকে দামি যন্ত্রপাতি ছিল না, ছিল না এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফির সেই নাটকীয় ছবি। তিনজন বিজ্ঞানী শুধু গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন ব্যাকটেরিয়ার খুদে জগৎকে, কখন এনজাইম তৈরি হচ্ছে আর কখন বন্ধ হচ্ছে।
কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় বড় পরিবর্তনই এসেছে এমন নিভৃত পর্যবেক্ষণ থেকে। পাজামো পরীক্ষার আসল বিশেষত্ব ছিল এর অসামান্য সরলতায়। ধাপে ধাপে যুক্তি মিলিয়ে তাঁরা দেখালেন, জিন কোনো যান্ত্রিক সুতো নয়, যা সব সময় একইভাবে চলবে। জিনের কাজ সুনিয়ন্ত্রিত। পরিবেশের সংকেত সরাসরি জিনকে প্রভাবিত করতে পারে। জিনের সামনে প্রহরী প্রোটিন বসতে পারে, আবার প্রয়োজন বুঝে সেই বাধা সরেও যেতে পারে। আর এই সব নির্দেশ ডিএনএ থেকে বার্তাবাহক আরএনএর হাত ধরে পৌঁছে যায় কোষের কারখানায়। মলিকুলার বায়োলজির এই নতুন ভাষাই আজ বদলে দিয়েছে আধুনিক চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের গতিপথ।
জীবনের নীল নকশা অথবা ডিএনএ উপাখ্যান১৯৬১ সালে সিডনি ব্রেনার, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং ম্যাথিউ মেসেলসন এক যুগান্তকারী পরীক্ষায় প্রমাণ করলেন, সত্যিই কোষে এমন এক ক্ষণস্থায়ী আরএনএ তৈরি হয়। এর আয়ু খুব কম, কিন্তু কাজ বিশাল।
জিন নিয়ন্ত্রণ: জীববিজ্ঞানের নতুন ভাষা
আজ আমরা বিজ্ঞানে যে রেগুলেটরি জিন বা নিয়ন্ত্রণকারী জিনের কথা বলি, তার ধারণা জন্মেছিল ঠিক এখান থেকেই। এই একটি ধারণা পুরো জীববিজ্ঞানের ভাষাই বদলে দিল। আগে প্রশ্ন ছিল, জিনে কী লেখা আছে? কিন্তু পাজামো পরীক্ষার পর প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়াল—কখন কোন জিন সক্রিয় হবে? এই রহস্যটি বোঝার পর থেকেই জীববিজ্ঞান এক নতুন যুগে পা রাখল।
১৯৬৫ সালে জিনের এই অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আবিষ্কারের জন্য জ্যাক মনো, ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং আন্দ্রে ল্যোভকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এই গবেষণার মাধ্যমেই জীববিজ্ঞানে এক নতুন দরজা খুলে গেল। আমরা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম, ভ্রূণের বিকাশের সময় কোন জিন ঠিক কখন জেগে ওঠে, কোষ বিভাজনের সময় কোন সংকেত কাজ করে, কিংবা ক্যানসারের সময় কেন কিছু জিন হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে যায়। এমনকি হরমোন কীভাবে আমাদের কোষের ভেতরে জিনের ওপর প্রভাব ফেলে, কিংবা ভাইরাস কীভাবে কোষের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়—এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর মিলল এই একটি সুতোয়, যার নাম জিন নিয়ন্ত্রণ।
১৯৬৫ সালে জিনের অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আবিষ্কারের জন্য জ্যাক মনো, আন্দ্রে ল্যোভ এবং ফ্রাঁসোয়া জ্যাকবকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়অক্ষরের শৃঙ্খলা থেকে নিয়ন্ত্রণের ছন্দ
চারগাফ দেখিয়েছিলেন ডিএনএর ভেতরের গাণিতিক শৃঙ্খলা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন অক্ষরগুলো এলোমেলো নয়; A-এর সঙ্গে T আর G-এর সঙ্গে C সমানভাবে থাকে। আর পাজামো পরীক্ষা দেখাল, এই অক্ষরগুলো শুধু সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোই নয়, বরং এরা সুনিয়ন্ত্রিত।
পুরো বিষয়টাকে যদি একটু কল্পনা করি, ডিএনএ হলো একটি বিশাল বই। আর অপেরন হলো সেই বইয়ের নির্দিষ্ট কোনো অধ্যায়ের সামনে থাকা একেকটি সুইচ। মেসেঞ্জার আরএনএ হলো সেই বার্তাবাহক, যে বই থেকে তথ্য কপি করে নিয়ে যায়। আর রিপ্রেসার? সে হলো সেই কড়া প্রহরী, যে দরজার সামনে বসে হুকুম দেয়, ‘এখন পড়া যাবে না!’
আসলে এই দুই বিজ্ঞানীর গল্প একই মহাকাব্যের দুটি অংশ। প্রথমে আমরা জানলাম জীবনের বর্ণমালা কীভাবে সাজানো থাকে। তারপর জানলাম সেই ভাষা ঠিক কীভাবে পড়া হয়। জীবন কেবল হাজার হাজার অক্ষরের সমষ্টি নয়; জীবন হলো এক সুনিয়ন্ত্রিত অক্ষরের ছন্দ।
ডিএনএ সংখ্যার রহস্যচারগাফ দেখিয়েছিলেন ডিএনএর ভেতরের গাণিতিক শৃঙ্খলা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন অক্ষরগুলো এলোমেলো নয়; A-এর সঙ্গে T আর G-এর সঙ্গে C সমানভাবে থাকে।
নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি
পাজামো পরীক্ষা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, জিন সব সময় একা কাজ করে না; সে নিয়ন্ত্রিত। কখনো সে নিস্তব্ধ থাকে, কখনো প্রবল বিক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোষ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে কখন কাজ শুরু হবে আর কখন থামবে। জিনের এই ছন্দই মূলত প্রাণের মূল সুর। পাজামো এক্সপেরিমেন্ট আমাদের শেখাল, জিন নিয়ন্ত্রণই হলো সেই মৌলিক চাবিকাঠি, যা প্রতিটি কোষের টিকে থাকা এবং বিবর্তন নির্ধারণ করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই নীরব বিপ্লবই আধুনিক মলিকুলার বায়োলজির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।
লেখক: সাজিদুর রহমান; রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সাকিব সামি; ইংরেজি বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়রাব্বি আল মাসুদ; অর্থনীতি বিভাগ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসূত্র: জার্নাল অব মলিকুলার বায়োলজি এবং কোম্পটাস রেন্ডাস ডি ল্য অ্যাকাডেমি ডেস সায়েন্সজিনবিজ্ঞানী ও তাঁর কুকুর