শক্তি বাঁচাতে বন্ধ হলো ভয়েজার ১ নভোযানের আরও একটি যন্ত্র
· Prothom Alo

মহাকাশে প্রায় ৪৯ বছর ধরে টানা ছুটে চলেছে দুটি যমজ মহাকাশযান—ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। এত দীর্ঘ যাত্রার পর তাদের পরমাণু শক্তি এখন প্রায় শেষের দিকে। শক্তি বাঁচাতে নাসা তাই এক মরিয়া পদক্ষেপ নিয়েছে। ভয়েজার ১-এর টিকে থাকা সর্বশেষ যন্ত্রগুলোর মধ্যে আরও একটিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
Visit salonsustainability.club for more information.
আগামী গ্রীষ্মে নাসার বিজ্ঞানীরা ‘বিগ ব্যাং’ নামে একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছেন। তাঁরা আশা করছেন, এই কৌশল সফল হলে ভয়েজার নভোযান দুটির আয়ু হয়তো আরও কিছুটা বাড়ানো যাবে। এই ‘বিগ ব্যাং’ মুহূর্তের ঠিক আগেই যন্ত্রটি বন্ধ করার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিল নাসা।
গত ১৭ এপ্রিল, শুক্রবার নাসা ভয়েজার ১ নভোযানকে তার লো-এনার্জি চার্জড পার্টিকেল পরীক্ষাটি বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। গত ৪৯ বছর ধরে এই যন্ত্রটি মহাকাশযানের চারপাশের আয়ন, ইলেকট্রন এবং মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে দারুণ সব তথ্য দিয়ে আসছিল।
ভয়েজার ১ নভোযানের লো-এনার্জি চার্জড পার্টিকেল যন্ত্রের ছবিকিন্তু গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মহাকাশযানটির পূর্বপরিকল্পিত একটি রোল মেনুভারের কারণে হঠাৎ করেই এর শক্তি অনেকখানি কমে যায়। ফলে বর্তমানে যানটিতে পরমাণু শক্তির চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
১৯৭৭ সালে মূলত বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহ পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে এই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এরপর এর মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়। ২০১২ সালে ভয়েজার ১ আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করে। এটিই মানব ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান, যা আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে বাইরে থেকে তথ্য পাঠাতে শুরু করে। এখনো পর্যন্ত এটি মানুষের তৈরি সবচেয়ে দূরের মহাকাশযান!
ভয়েজার মিশন: মহাকাব্যিক যাত্রায় মানবসভ্যতার নিদর্শন১৯৭৭ সালে মূলত বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহ পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ভয়েজার ১ মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এরপর এর মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়।
এর যমজ ভাই ভয়েজার ২ বৃহস্পতি থেকে শুরু করে নেপচুন পর্যন্ত বাইরের সব কটি গ্রহ পর্যবেক্ষণ করেছিল। এর প্রায় ছয় বছর পর এটিও ইন্টারস্টেলার স্পেসে প্রবেশ করে। দুটি মহাকাশযানই এখনো মহাশূন্যের ওই ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে পৃথিবীতে সংকেত পাঠিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু তাদের সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই মহাকাশযান দুটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর বা পরমাণু ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যাটারি ক্ষয়িষ্ণু প্লুটোনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যান দুটি প্রতিবছর প্রায় ৪ ওয়াট করে শক্তি হারাচ্ছে।
ভয়েজার ২ মহাকাশযানের সাহায্যে তোলা ইউরেনাস (বামে) এবং নেপচুনের (ডানে) ছবিনাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা ১৭ এপ্রিল জানিয়েছে, ‘শক্তির মজুত এখন এতই কমে গেছে যে, আমাদের খুব সাবধানে হিসাব করে চলতে হচ্ছে। শক্তি বাঁচাতে হিটার ও বিভিন্ন যন্ত্র বন্ধ করতে হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হচ্ছে, মহাকাশযানগুলো যেন ঠান্ডা হয়ে জ্বালানির লাইনগুলোই জমে বরফ না হয়ে যায়!’
সর্বশেষ এই যন্ত্রটি বন্ধ করার পর, ভয়েজার ১-এর ১০টি বিজ্ঞানভিত্তিক যন্ত্রের মধ্যে মাত্র দুটি এখন চালু আছে। অন্যদিকে ভয়েজার ২-এ বর্তমানে তিনটি যন্ত্র কাজ করছে। এই যন্ত্রগুলোই সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ এবং হেলিওপজের ভৌত অবস্থা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করছে।
ভয়েজারের কথা এখনও কীভাবে শোনে মানুষনাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা ১৭ এপ্রিল জানিয়েছে, ‘শক্তির মজুত এখন এতটাই কমে গেছে যে, আমাদের খুব সাবধানে হিসাব করে চলতে হচ্ছে।'
বর্তমানে যে অবস্থা, তাতে এই সর্বশেষ যন্ত্রটি বন্ধ করার ফলে ভয়েজার ১ হয়তো বড়জোর আর এক বছর বাঁচতে পারবে। কিন্তু নাসার বিজ্ঞানীরা যানটি থেকে আরও কিছু পাওয়ার চেষ্টা করছেন। জেপিএল একটি ‘বিগ ব্যাং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে শুধু ভয়েজার ১ নয়, ভয়েজার ২-এরও কমে আসা শক্তিকে আরও কিছুটা বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
জেপিএলের বিজ্ঞানীরা ব্লগে লিখেছেন, ‘আমাদের মূল বুদ্ধিটা হলো একসঙ্গে একগাদা চালু যন্ত্র বদলে ফেলা! এ জন্যই এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিগ ব্যাং’। আমরা কিছু জিনিস একেবারে বন্ধ করে দেব এবং সেগুলোর জায়গায় এমন বিকল্প ব্যবস্থা চালু করব, যা খুব কম শক্তিতে চলে। এতে মহাকাশযানটি বিজ্ঞানের তথ্য সংগ্রহ চালিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট উষ্ণ থাকবে।’
ভয়েজার ১ নভোযানের কাল্পনিক ছবিবর্তমানে ভয়েজার ১-এ থাকা দুটি যন্ত্র মহাকাশের চৌম্বকক্ষেত্র এবং প্লাজমার ঢেউ নিয়ে কাজ করছে। তবে সবকিছু যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তাহলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, বিগ ব্যাং থেকে তাঁরা এতটাই শক্তি ফিরে পাবেন, যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া এলইসিপি যন্ত্রটি আবারও চালু করা যাবে! মজার ব্যাপার হলো, এই যন্ত্রটি যাতে ভবিষ্যতে আবার ব্যবহার করা যায়, সে জন্য প্রকৌশলীরা আপাতত এর ভেতরে থাকা মাত্র আধা ওয়াটের একটি ছোট মোটর চালু রেখেছেন।
সৌরজগতের কয়টি গ্রহে গেছে মানবসৃষ্ট নভোযানবিজ্ঞানীরা আশা করছেন, বিগ ব্যাং থেকে তাঁরা এতটাই শক্তি ফিরে পাবেন, যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া এলইসিপি যন্ত্রটি আবারও চালু করা যাবে!
কবে হবে এই ‘বিগ ব্যাং’
মে এবং জুন মাসে জেপিএল ভয়েজার ২-এর ওপর বিগ ব্যাংয়ের কিছু পরীক্ষা চালাবে। ভয়েজার ২ নভোযানের কাছে এখনো কিছুটা বেশি শক্তি আছে এবং এটি পৃথিবীর তুলনামূলক কাছাকাছি আছে। এই পরীক্ষা যদি সফল হয়, তবেই কেবল ভয়েজার ১-এর ওপর এই ঝুঁকিপূর্ণ বিগ ব্যাং কৌশল প্রয়োগ করা হবে। আর সেটি জুলাই মাসের আগে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ভয়েজার ১ পৃথিবী থেকে এতই দূরে আছে যে, সেখানে কোনো নির্দেশ পাঠাতে প্রায় ২৩ ঘণ্টা সময় লাগে! পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি কিলোমিটার। জেপিএল নির্দেশ পাঠানোর পর এলইসিপি যন্ত্রটি বন্ধ করার প্রক্রিয়া শেষ হতে তিন ঘণ্টার একটু বেশি সময় লেগেছিল। এত বিশাল দূরত্ব ও চরম ঠান্ডার মধ্যে ওই যন্ত্রটি পুনরায় চালু করাটা কিন্তু মোটেও সহজ কাজ হবে না!
লেখক: সহকারী শিক্ষক, গণিত বিভাগ, পদ্মা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীয়তপুরসূত্র: নাসা জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিস্পেস ডটকমসায়েন্স অ্যালার্টইউরোপার উদ্দেশে যাত্রা করেছে ক্লিপার নভোযান