পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, চাপে সাধারণ মানুষ

· Prothom Alo

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান একটি বেসরকারি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করেন। তাঁর মাসিক বেতন ৫৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঘরভাড়া, দুই সন্তানের লেখাপড়া, ওষুধ ও যাতায়াতের জন্য খরচ হয় ৩৮ থেকে ৩৯ হাজার টাকা। গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা–বাবাকে মাসে ১০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। বাকি ৯-১০ হাজার টাকা খরচ করেন দৈনন্দিন বাজারের জন্য।

Visit sport-tr.bet for more information.

কয়েক মাস আগেও বেতনের এই টাকায় টেনেটুনে হাবিবুরের সংসার চলে যেত। কিন্তু চার-পাঁচ মাস ধরে সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। কারণ, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় খরচ সামলাতে গরুর মাংস ও ফল খাওয়া কমিয়েছে তাঁর পরিবার। আগে ছুটির দিনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাঝেমধ্যে ঘুরতে বের হতেন হাবিবুর। এখন সেটাও বন্ধ। তারপরও ব্যয় সামলাতে পারছেন না। এখন প্রতি মাসে তাঁকে ঋণ করতে হচ্ছে।

হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবজি থেকে শুরু করে পোশাক, ওষুধ—সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগে ৬-৭ হাজার টাকায় মাসের বাজার হয়ে যেত। এখন লাগছে ৯-১০ হাজার টাকা। গত এক সপ্তাহে ফার্মের মুরগির ডিম, চিনি, বেগুন, পটোলের দাম বেড়েছে। সোনালি মুরগির কেজিও ৩৫০ টাকার ওপরে। বাড়তি এই খরচ আমার জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বিক্রেতারা জানান, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে একসঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানিসংকট হওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে নতুন করে খরচের চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

হাবিবুরের সঙ্গে কথা হয় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে। এরপর রাজধানীর জোয়ার সাহারা, মহাখালী, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও টাউন হল কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে এসব পণ্যের পাশাপাশি মোটা ও মাঝারি চাল, খোলা আটা, ময়দা ও সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত এক-দুই মাসে খুচরা পর্যায়ে আরও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুগন্ধি চাল, ডিটারজেন্ট ও সাবানের মতো পণ্য। তেলাপিয়া, রুই, পাঙাশ, গরুর মাংসের দামও আগের তুলনায় বাড়তি।

বিক্রেতারা জানান, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে একসঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানিসংকট হওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে নতুন করে খরচের চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

লাইজু বেগম, গৃহকর্মী, আদাবর এলাকাআমি ভাড়া বাসায় থাকি। সেখানে লাইনের গ্যাস নাই। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করি। গত কয়েক দিনে সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা বাড়ছে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। এত খরচ সামলাব কেমনে।

ভোগাচ্ছে জ্বালানির দাম

দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে বিএনপি সরকার। এর মধ্যে চলতি মাসে দুই দফায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজির) দাম কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেড়েছে। এতে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ টাকা দাম বেড়েছে। তবে বাজারে এর চেয়ে বাড়তি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয়।

দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দামও বাড়িয়েছে সরকার। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা ও পেট্রলে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে। এসব জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পণ্যের দামে।

রাজধানীর আদাবর এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন লাইজু বেগম। তিনি বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি ভাড়া বাসায় থাকি। সেখানে লাইনের গ্যাস নাই। সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করি। গত কয়েক দিনে সিলিন্ডারের দাম ৬০০ টাকা বাড়ছে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে। এত খরচ সামলাব কেমনে।’

সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ ও ব্রয়লার মুরগির দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে।

ডিম-মুরগির দাম বেড়েছে

সাধারণ মানুষের জন্য পুষ্টির বড় উৎস ফার্মের মুরগি ও ডিম। গত দুই সপ্তাহে বাজারে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ২০ টাকা বেড়েছে। এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। খুচরা বিক্রেতারা জানান, গাড়িভাড়া বাড়ায় পাইকারি বিক্রেতারা ডিমের দাম বাড়িয়েছেন।

এদিকে বাজারে এখনো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি মুরগি। গতকাল প্রতি কেজি হাইব্রিড সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩২০-৩৩০ টাকায় আর সোনালি ৩৫০-৩৬০ টাকায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে প্রতি কেজি সোনালি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ঈদের পর সোনালি মুরগির দাম বেড়ে ৪২০ টাকায় উঠেছিল। পরে দাম কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকায়।

সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ ও ব্রয়লার মুরগির দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন বাজারে গতকাল ছোট আকারের রুই মাছ ২৮০-৩৫০ টাকা এবং তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ ২০০-২২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।

আব্বাস আকন্দ, সবজি বিক্রেতা, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটএখন বাজারে গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে গ্রীষ্মের সবজির দাম কিছুটা কমার কথা। কিন্তু গাড়িভাড়া বাড়ার কারণে সবজির দাম কমছে না।

সবজির দাম চড়া

বাজারে বর্তমানে আলু ছাড়া ৫০ টাকা কেজির নিচে তেমন কোনো সবজি কেনা যায় না। বেশির ভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। আর বেগুন, কাঁকরোলের মতো দু-তিনটি সবজি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকার ওপরে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দৈনিক ১৫টি সবজির খুচরা দামের তালিকা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে নয়টি সবজির দাম বেশি; আর দাম কম রয়েছে চারটি সবজির। দাম বেশি বেড়েছে দেশি টমেটো, মিষ্টিকুমড়া ও করলার। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি টমেটো ৫০-৬০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০ টাকা ও করলা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের সবজি বিক্রেতা আব্বাস আকন্দ জানান, এখন বাজারে গ্রীষ্ম মৌসুমের সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। ফলে গ্রীষ্মের সবজির দাম কিছুটা কমার কথা। কিন্তু গাড়িভাড়া বাড়ার কারণে সবজির দাম কমছে না।

খুচরা দোকানে এখন প্রতি কেজি খোলা চিনির দাম ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে ৫ টাকা কম ছিল। গত এক সপ্তাহে বাজারে মাঝারি চালের (বিআর-২৮ ও পাইজাম) দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে। এসব চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। আর মোটা চাল (স্বর্ণা ও চায়না ইরি) বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫৩ টাকায়। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুসারে, এক মাসের ব্যবধানে মোটা ও মাঝারি চালের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ–সংকট চলছে। অনেক সময় ক্রেতারা কয়েক দোকান ঘুরেও সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না।

মূল্যবৃদ্ধির যেসব কারণ

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দেখিয়েছেন খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা। তাঁরা জানান, গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে বেশ কিছু পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ায় দেশে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। সরবরাহ–সংকট থেকেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। আর সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়তে শুরু করেছে।

প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ–সংকট চলছে। অনেক সময় ক্রেতারা কয়েক দোকান ঘুরেও সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না। ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে চায়। কিন্তু সরকার এখনো অনুমতি দেয়নি। তবে ইতিমধ্যে কোম্পানিগুলো ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়িয়েছে। এ কারণে ভোক্তাদেরও আগের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।

রাজধানীর জোয়ার সাহারা বাজারের মুদি বিক্রেতা জালাল দেওয়ান বলেন, ‘বাজারে বোতলের সয়াবিন তেল নেই বললেই চলে। কোম্পানিগুলো আমাদের কাছে গায়ের রেটে (এমআরপি) তেল বিক্রি করে। তাহলে গ্রাহকদের কাছে আমরা বেচব কত টাকায়।’

এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, সভাপতি, ক্যাব বাজারে একসঙ্গে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তারা, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষেরা খরচের চাপে পড়েছেন। পরিবহন খরচসহ সামগ্রিকভাবে পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগকে পুঁজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ

বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। কারণ, মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খায় মানুষ। সরকারি হিসাবে দেখা গেছে, টানা তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে দেশ। সাধারণত সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি থাকছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় তিন বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ ‘লাল’ শ্রেণিতে রয়েছে। এর মানে হলো, বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে না; বরং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে তা আরও বাড়তে পারে।

ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে একসঙ্গে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তারা, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষেরা খরচের চাপে পড়েছেন। পরিবহন খরচসহ সামগ্রিকভাবে পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগকে পুঁজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

Read full story at source