দেশে ৪ বছরে তরমুজ উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ
· Prothom Alo

গ্রীষ্ম মৌসুমের অন্যতম দেশি ফল তরমুজ। তাপমাত্রা বেশি থাকায় গরমকালে রসালো এ ফলের বেশ চাহিদা থাকে। প্রতিবছরই এটির চাহিদা ও চাষাবাদ বাড়ছে। বদৌলতে গত চার বছরে দেশে তরমুজ উৎপাদন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ১৭ লাখ ৮৯ হাজার টন তরমুজ উৎপাদন হয়েছে, সেখানে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৫ লাখ ৫২ হাজার টনে উঠেছে। মাঝে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টন ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার টন তরমুজ উৎপাদন হয়েছে।
Visit turconews.click for more information.
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তরমুজ উৎপাদন আরও বাড়বে বলে মনে করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে গতবারের তুলনায় তরমুজের দাম এবার কিছুটা কম।
এবার দাম কম
দেশে তরমুজের ভরা মৌসুম হচ্ছে মার্চ ও এপ্রিল মাস। বর্তমানে পাড়ামহল্লার অলিগলিতেও তরমুজ বিক্রি করতে দেখা যায়। দাম গতবারের তুলনায় কিছুটা কম। গত বছর এপ্রিলের শুরুতে প্রতি কেজির দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। এবার একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দুই সপ্তাহ আগে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হয়েছে। কারওয়ান বাজারে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজিতেও পাওয়া যায়। তবে মৌসুমের শেষ দিকে এখন দাম কিছুটা বেড়ে ৪৫–৫০ টাকা হয়েছে।
দামের বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হর্টিকালচার শাখার কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রথম আলোকে জানান, গরমের কারণে চাহিদা বাড়ে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় তরমুজ সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। তাই দাম কিছুটা কম।
স্বাদ নিয়ে অভিযোগ
এবার তরমুজের ভেতরে লাল রং থাকলেও স্বাদ কিছুটা কম বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। কারওয়ান বাজারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে মো. জাহাঙ্গীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার তরমুজে কোনো স্বাদ নেই। দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। দুইবার কিনে একই অবস্থা দেখলাম। তৃতীয়বার কিছুটা ভালো ছিল। আর কিনব না।’
একই বাজারে ইকবাল হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী ১০০ টাকায় একটি তরমুজ কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে একটি তরমুজ কিনেছিলাম। ভালো পড়েনি। ঝুঁকি নিয়ে তাই আবারও কিনলাম।’
তরমুজে স্বাদ না থাকা বা স্বাদ কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে ফল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তাঁরা জানান, অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহারের কারণে এমনটা হতে পারে। দ্রুত বড় করার প্রবণতা ফলকে অপরিপক্ব রেখে দেয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বারটান) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বল্প সময়ে দ্রুত বড় করতে গেলে সমস্যা হয়। তখন ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই বাজারে আনা হয়। আবার বেশি বড় করা হলে পানির পরিমাণ বেড়ে গিয়ে মিষ্টি কম হতে পারে। তাতে স্বাদ কম লাগতে পারে।’
বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে হরমোনের ব্যবহার বেড়েছে। সে জন্য স্বাদ কম হয় বলে জানান আবদুর রাজ্জাক। তাঁর মতে, অতিরিক্ত না খেলে কোনো সমস্যা হবে না।
উৎপাদন বেশি উপকূলে
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার চরাঞ্চলে তরমুজের উৎপাদন বেশি হয়। এর মধ্যে পটুয়াখালী, ভোলা, খুলনা, বাগেরহাট ও বরিশাল অঞ্চলে তরমুজ উৎপাদন হয় সবচেয়ে বেশি। মৌসুমের শুরুতে বাজারে আসে বরিশাল-ভোলার তরমুজ। এখন বাজারে আসছে খুলনার তরমুজ।
ডিএইর তথ্যমতে, দেশে সবচেয়ে বেশি তরমুজ উৎপাদিত হয় পটুয়াখালীতে। এরপরেই ভোলা ও বরগুনায়। শুধু ভোলাতেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তরমুজের উৎপাদন ছিল প্রায় ৮ লাখ টন। এবার গতবারের তুলনায় আরও ৪ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে তরমুজের চাষ করা হয়েছে।
ভোলা জেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক প্রথম আলোকে জানান, এবার ফলন ভালো হয়েছে। উৎপাদন বেশি হওয়ায় শেষ সময়ে দাম কিছুটা কম। তবে রোজায় দাম ভালো ছিল। তাই কৃষকেরা লোকসানে নেই। ভালো লাভ পাওয়ায় বছর বছর উৎপাদনও বাড়ছে।
চাষে লাভ কেমন
উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কয়েক গুণ লাভ হওয়ায় তরমুজের চাষাবাদ বাড়ছে। খুলনার দাকোপ উপজেলায় এবার ২০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন শংকর মন্ডল। এপ্রিলের ২০ তারিখের পর এসব ফল সংগ্রহ করা হবে। নাবি জাতের এই তরমুজ সবার শেষে বাজারে আসে। তখন অবশ্য দাম বেশি থাকে।
শংকর মন্ডল প্রথম আলোকে জানান, প্রতি বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদে খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আর ফলন ভালো হলে বিঘাপ্রতি ফল বিক্রি করা যায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতিটি ফলের ওজন হয় ৪-৫ কেজি। পানি কম ব্যবহার করায় মিষ্টিও ভালো হবে বলে জানান তিনি।