হাসি কেন সংক্রামক

· Prothom Alo

কখনো কি এমন হয়েছে, খুব সিরিয়াস কোনো পরিবেশে আপনি হাসতে চাইছেন না, কিন্তু পাশের একজনের হাসি দেখে আপনার হাসিও আর বাঁধ মানছে না? আপনি যত থামার চেষ্টা করছেন, হাসি যেন তত বেশি প্রবল হয়ে ফিরে আসছে। এই যে অনিয়ন্ত্রিত হাসি, যা একজনের কাছ থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে; এর পেছনে কাজ করে আমাদের মস্তিষ্কের এক জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক বিজ্ঞান।

গবেষণা বলছে, মানুষের হাসি মূলত দুই ধরনের। প্রথমটি হলো অসহায় বা অনিচ্ছাকৃত হাসি। তীব্র আবেগের মুহূর্তে এমন হাসি আপনার অজান্তেই চলে আসে। দ্বিতীয়টি হলো ভদ্রতাসূচক বা সামাজিক হাসি, যা আমরা সচেতনভাবে দিয়ে থাকি। বন্ধুর কোনো জোকস বা কৌতুক খুব একটা মজার না হলেও তাকে খুশি করতে আমরা হেসে থাকি।

Visit syntagm.co.za for more information.

মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অংশ এই দুই ধরনের হাসিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের সচেতন বা স্বেচ্ছামূলক হাসি মস্তিষ্কের সেই অংশ থেকে আসে, যা শারীরিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু অনিচ্ছাকৃত হাসি আসে মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশ থেকে। অ্যামিগডালা এই নিয়ন্ত্রণ করে। এ অংশটি আমাদের সচেতন নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে কোনো পরিস্থিতি মজার মনে হলে আপনার চিন্তাশীল মস্তিষ্ক থামুন বলার আগেই আপনি হেসে ফেলেন। জার্মানির গটিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিশন, ইমোশন ও বিহেভিয়ার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অ্যান শ্যাখট বলেন, সাধারণ হাসি দমানো কঠিন মনে হলেও এটি একটি স্বাভাবিক আবেগীয় ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া। এটি সাধারণত আনন্দ, পরিবেশ ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে অনেক সময় মানুষ কেন অর্থ ছাড়াই হঠাৎ হাসে বা কাঁদে। এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজ্ঞানীরা একে সাধারণ হাসির চেয়ে আলাদা বলছেন। ২০১৯ সালের আলোচিত সিনেমা ‘জোকার’–এ আর্থার ফ্লেক চরিত্রের অনিয়ন্ত্রিত হাসিকে বিজ্ঞানীরা একটি বিরল স্নায়বিক রোগ সুডোবুলবার প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সাধারণ হাসি ও এই রোগের লক্ষণের মধ্যে পার্থক্য অনেক।

আমরা যখন একা থাকি, তার চেয়ে কারও সঙ্গে থাকলে হাসার সম্ভাবনা প্রায় ৩০ গুণ বেশি থাকে। গটিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এক গবেষণায় দেখেছেন, হাসির সামাজিক বা সংক্রামক প্রকৃতিই একে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন করে তোলে। গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবকদের কৌতুক শোনানো হয়েছিল এবং তাঁদের মুখমণ্ডলের মাংসপেশির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। দেখা গেছে, তাঁরা যখন হাসি থামানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন অন্য কোনো ব্যক্তির হাসির শব্দ কানে আসামাত্রই তাঁদের পক্ষে আর গম্ভীর থাকা সম্ভব হয়নি। মস্তিষ্কের কাছে তখন অন্য কারও হাসির শব্দ একটি সিগন্যাল বা সংকেত হিসেবে কাজ করে।

বিজ্ঞানী শ্যাখট ব্যাখ্যা করেন, হাসি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। হাসি আসলে এককভাবে কোনো মজার জিনিসের প্রতি একটি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রতিক্রিয়া নয়। এটি একটি দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয় সামাজিক প্রতিক্রিয়া, যা অন্য মানুষের উপস্থিতি দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়।

হাসি থামানো কেন কঠিন, তার আরেকটি কারণ হলো মস্তিষ্ক হাসির জন্য আমাদের পুরস্কার দেয়। যখন মানুষ একসঙ্গে হাসে, তখন মস্তিষ্কে এন্ডোজেনাস ওপিওড নামক একধরনের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এর মধ্যে থাকা এনডোরফিনসহ অন্য রাসায়নিকগুলো আমাদের শরীরে ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে, মন ভালো রাখে, মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বাড়ায় ও হার্টকেও সুরক্ষা দেয়। যেহেতু হাসলে শরীর ও মনের আরাম অনুভূত হয়, তাই একবার হাসি শুরু হলে আপনার মস্তিষ্ক চাইলেও সহজে তা বন্ধ করতে রাজি হয় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কৌশল হাসি দমাতে সাহায্য করে। অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করে মনোযোগ ঘুরিয়ে নেওয়া, মুখমণ্ডলের পেশি শক্ত রাখা বা কৌতুকটি মোটেও মজার নয়—এমন চিন্তা করা। কিন্তু অনেক সময় জোর করে হাসি থামানোর চেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় রিবাউন্ড ইফেক্ট। কোনো কিছু সম্পর্কে না ভাবার চেষ্টা করলে যেমন সেটি আরও বেশি করে মনে আসে, হাসির ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটে। যাঁরা হাসিকে প্রবলভাবে চেপে রাখার চেষ্টা করেন, তাঁরা পরে সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ হাসতে থাকেন।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

Read full story at source