স্মরণে রঘু রাই: এক আলোকময় যাত্রা

· Prothom Alo

ফেব্রুয়ারি ২০১৬। হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত ছাত্র রোহিত ভামুলার আত্মহত্যা নিয়ে ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে তুমুল আন্দোলন চলছিল। দলিতদের অধিকার নিয়ে ভারতজুড়ে চলছিল নানা আন্দোলন। পড়া ও কাজের সুবাদে আমরা তখন দিল্লিতে। আন্দোলনের এক তুঙ্গ মুহূর্তে রোহিতের মা দিল্লিতে ইন্ডিয়া গেটের সামনে আন্দোলনে বসে পড়েন। পুলিশ প্রচণ্ড মারমুখী ছাত্র আন্দোলনকারীদের ঘিরে রেখেছে। আমরা রঘু রাইয়ের সঙ্গে গাড়ি থেকে নামলাম। সবার হাতে ক্যামেরা। পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত। ছয় ফুট উচ্চতার রঘু রাই। গায়ে আলখাল্লার মতো একটি কাপড় চাপানো। তাঁকে দেখে পুলিশ কিছুটা সতর্ক হয়ে পথ করে দিল।

ঘেরাটোপের মাঝখানে সাংবাদিকদের ভিড়। প্রায় কোনো জায়গাই নেই। সামনে সাদা চুলের এক লোক, হাতে ক্যামেরা ধরা; খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার আনন্দ পট্টবর্ধন। ‘আনন্দ, একটু জায়গা মিলবে?’ রঘু বলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা ফাঁক তৈরি হলো। মাত্র এক মিনিট সময় নিলেন। কয়েকটি ছবি তুলেই আমাদের বললেন, ‘চলো, এখানে থাকা নিরাপদ নয়।’ কিছুদূর সামনে হেঁটে গিয়ে একটা আইসক্রিমের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবিগুলো আমাদের কয়েকজনকে দেখালেন। বিস্ময়কর! এমন পরিস্থিতিতে এত কম সময়ে এক জাদুকরি আলো ও কম্পোজিশন ধরা পড়েছে তাঁর চোখে!

Visit betsport24.es for more information.

আলোকচিত্রের জাদুকর রঘু রাই। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের এক অনন্য চিত্রভাষা নির্মাণ করেছেন। যুদ্ধ থেকে ধ্রুপদি শিল্পকলা—সবকিছুই তাঁর চোখে এক নান্দনিক রূপে ধরা পড়েছে। একটি বৃহৎ অঞ্চলের মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার নানা অনুষঙ্গ তাঁর ক্যামেরায় অবলোকনে ঐতিহাসিক হয়ে উঠেছে।

রঘু রাইয়ের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের অধুনা পাকিস্তানের ঝং নামের এক গ্রামে। মা–বাবার কনিষ্ঠ সন্তান। বাবার আগ্রহ ছিল রঘু যেন একজন ইঞ্জিনিয়ার হন। পড়াশোনা করে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দিল্লিতে সরকারি চাকরিও নিয়েছিলেন। কিন্তু ভালো লাগেনি। বড় ভাই এস পল ফটোগ্রাফার হিসেবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। ফটোগ্রাফিতে আগ্রহের কথা ভাইকে জানালেন। আগ্রহ দেখে পল তাঁকে এক বন্ধুর কাছে পাঠালেন। ১৯৬২ সালে পলের সেই বন্ধুর কাজ দেখতে তাঁদের গ্রামে গেলেন। ঘুরলেন আর শিখলেন নিজের মতো করে। জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে গেল ফটোগ্রাফি। ১৯৬৫ সালে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রধান আলোকচিত্রী হিসেবে যোগ দিলেন। যেখানে তিনি অকপট, উচ্চ-কন্ট্রাস্ট আলোকচিত্রে তাঁর স্বাক্ষর ও শৈলী বিকাশ করতে শুরু করলেন।

রঘুর কর্মজীবনের শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি দেখেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে ভারত ও বিশ্বে বিশেষ পরিচিত করে তুলেছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অবদান ও মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী, যুদ্ধ এবং পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের শক্তিশালী চিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা এনে দেয়। ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের সম্মানিত বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রীতে ভূষিত হন। বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাঁকে ফ্রেন্ডস অব লিবারেশান ওয়ার অনার দেয়।

১৯৭১ সালে আরেক কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কারতিয়ের-ব্রেসোঁ তাঁর এক প্রদর্শনী দেখে তাঁকে বিশ্বখ্যাত ম্যাগনাম ফটো এজেন্সিতে যোগ দিতে অনুরোধ জানান। ১৯৭৭ সালে ম্যাগনামে তিনি পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে দ্য স্টেটসম্যান ছেড়ে একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনে আলোকচিত্র সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। ম্যাগাজিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী বছরগুলোতে এর দৃশ্যভাষা সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে তিনি মূল ভূমিকা পালন করেন।

১৯৮৪ সালে রঘুর ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সমাহিত শিশুর চিত্র বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে এবং একে শিল্প বিপর্যয়ের ভুতুড়ে প্রতীক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। তিনি ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর বিচারক ছিলেন বেশ কয়েকবার। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মাদার তেরেসা, দালাই লামা, ইন্দিরা গান্ধীর ওপর জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। এ ছাড়া খাজুরাহো, তাজমহল, কলকাতা, মুম্বাই শহরসহ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫০টির বেশি। সারা পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত প্রকাশনা ও গ্যালারিতে তাঁর ছবি ছাপা ও প্রদর্শিত হয়েছে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার বেঙ্গল গ্যালারিতে ‘বাংলাদেশ দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম’ নামে একটি একক প্রদর্শনীতে রঘু প্রথম তাঁর তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো প্রদর্শন করেন। যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সীমাহীন মূল্য দিতে হয়েছে।’ ২০১৯ সালে ঢাকায় ছবিমেলায় অংশগ্রহণ করে বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘তথাকথিত রাজনীতি নয়, শিল্পী ও সাংবাদিকদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের কাজ।’

২০০৪ সালে আমার নেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলে বুদ্ধিজীবী ও গণহত্যা যে মেধাশূন্যতা তৈরি করেছে, সেই বিষয়ে বলেছিলেন। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনেও একই শূন্যতার কথা আমি রঘুকে বলেছিলাম। কিন্তু নকশাল আন্দোলনকে তিনি খুব সহজভাবে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, দুই পক্ষ আরও অহিংস হতে পারত এবং নকশালরা সন্ত্রাসী উপায় অবলম্বন করেছে। এ সময় আলাপ খানিকটা উত্তপ্তও হয়ে উঠেছিল। সেদিন তাঁর নির্ধারিত বক্তৃতাও বেশ খানিকটা পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুই বাংলায় সত্তরের দশকে যে মেধাশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা একমত হয়েছিলাম।

কাজের সুবাদে রঘু দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিলেন এবং বাঙালিদের আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে বেশ অবগত ছিলেন। ২০১৬ সালে দিল্লির গুরগাঁওয়ে রঘু রাই স্কুল অব ফটোগ্রাফিতে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের জন্য বিশেষ করে মাছ রান্না করতে বলেছিলেন, ‘আমি জানি তোমরা বাঙালিরা মাছ খেতে ও আড্ডা দিতে ভালোবাসো।’ তাঁর সেই স্কুলে আমরা যখন পৌঁছাই, তখন তিনি গাছে পানি দিচ্ছিলেন এবং একটি মুমূর্ষু গাছের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মালিকে খুব আফসোস করে বলছিলেন, ‘ঠিকঠাক যত্ন না নেওয়ার কারণে গাছটি কষ্ট পাচ্ছে। ওকে সারিয়ে তুলতে হবে।’ পুরো ভারত থেকে তিনি শত শত দুষ্প্রাপ্য গাছ এনে সেখানে রোপণ করেছিলেন। বেশ কয়েকজন মালি ও তিনি নিজে সেগুলোর দেখাশোনা করতেন। শুধু গাছ নিয়েই তাঁর বেশ কয়েকটি বই আছে।

মুক্তিযুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশকে রঘু কেমন দেখেছেন জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলেন, ‘দেখো, মন্দ কাজে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমরা সবাই এক। স্বাধীনতার এত দিন হয়ে গেল, কিন্তু এখনো দেখবে গাছপালা, পশুপাখি ও প্রকৃতির প্রতি আমরা উদাসীন ও নির্মম। গণতন্ত্রকে আমরা শুধু দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছি। তাই তোমাকে সন্তোষজনক কোনো উত্তর আমি দিতে পারছি না।’

মুক্তিযুদ্ধের চিত্র ধারণ করা ভারতীয় আলোকচিত্রী রঘু রাই মারা গেছেন

প্রতিবার ঢাকায় এলেই রঘু রাই সকালবেলা ছবি তুলতে বের হতেন। মূলত শহরতলিতে যেতে ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসতেন। বয়স হয়েছিল, তাই উঁচু-নিচু কোথাও গেলে সহায়তার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতাম, কিন্তু উনি কখনোই সহায়তা নিতেন না। উল্টো আমাকে দেখিয়ে অট্টহাসি দিয়ে লাফ দিয়ে নেমে আমাকে বলতেন, ‘আমি এখনো গাছে উঠতে পারি। তুমি পারবে আমার সঙ্গে?’

রঘু ছিলেন গুরুভক্ত। বিশ্বাস করতেন মানুষের সৃজনশীল ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি দীর্ঘদিন ম্যাগনামের ওয়েবসাইট দেওয়া ছিল ‘পিকচার কামস ফ্রম গড’। তাঁর ভুবনবিখ্যাত ছবিগুলোর মতোই তিনি চিররহস্যে অন্তর্ধান নিলেন। তাঁর ছবি দেখে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত আলোকচিত্রের জীবনে সাহস করে পা রেখেছিলাম আমরা অনেকেই। এই অঞ্চলের জীবন, নন্দন ও আধ্যাত্মিকতার মানচিত্রে নতুন এক চিত্রভাষা তিনি চিরকাল আমাদের অবগাহনের জন্য রেখে গেলেন।

আজ রঘু রাইয়ের নয়ন মুদিত, কিন্তু তাঁর চোখ যা দেখেছে ও দেখিয়েছে তা আমাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

মায়েস্ত্রো, আপনার পথ অপার করুণাধারা এবং সোনালি আলোয় আলোকিত হোক!

আমিরুল রাজিব: শিল্প ইতিহাসবিদ ও আলোকচিত্রী; দুনিয়াদারি আর্কাইভের সহঃপ্রতিষ্ঠাতা

Read full story at source