পারমাণবিক অস্ত্রই কি এখন ইরানের একমাত্র পথ?
· Prothom Alo

বোমা বিস্ফোরণ, জাহাজ জব্দ আর ধ্বংসের চরম হুমকির মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ইরানকে প্ররোচিতই করছেন। তিনি ইরানকে বাধ্য করছেন ‘শান্তিচুক্তি’ প্রত্যাখ্যান করে আত্মরক্ষার স্বার্থে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে দ্রুত এগোতে।
Visit extonnews.click for more information.
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি একটি আসন্ন হুমকি। অথচ বাস্তবতা হলো, ইরানের কোনো পারমাণবিক বোমা নেই। তবে এই অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে আছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা একমত যে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন বা রাজনৈতিক বিকল্প খোলা রাখলেও তারা আসলে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
বিশেষ করে ২০০৩ সালে তাদের একটি গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর থেকে এমন কোনো উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এক বছরের মধ্যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার উসকানিহীন হামলা এবং ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ খতমের ঘোষণার এখনই সময়ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু দুটি বড় ভুল করছেন। তাঁরা ভাবছেন যে ধ্বংসযজ্ঞ চালালেই ইরানিরা সবকিছু ভুলে যাবে। অথচ মিনাব স্কুলের গণহত্যা এবং যে কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা ওয়াশিংটন করেছে, তা ইরানিরা কখনোই ভুলবে না। শাসক দল যা-ই হোক না কেন, ইরানের দিক থেকে হুমকির অনুভূতি থেকেই যাবে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জেনারেলরা এখন মনে করছেন, ভবিষ্যৎ আক্রমণ ঠেকাতে পারমাণবিক অস্ত্রই একমাত্র নিশ্চিত উপায়। তাঁদের এই যুক্তিকে ভুল বলা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দুইবার কোনো সতর্কতা ছাড়াই কূটনৈতিক আলোচনার মাঝপথে হামলা চালিয়েছে।
এমনকি কোনো শান্তিচুক্তি হলেও ইরানিরা জানে যে ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই জোট বছরের পর বছর তাদের আগ্রাসন বজায় রাখতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ওপর ট্রাম্প যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তা আসলে লক্ষ্যভ্রষ্ট। কারণ, বোমা মেরে পারমাণবিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সহজে মুছে ফেলা যায় না। তা ছাড়া তেহরানকে নিজের দেশেই পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তারা চাইলে বিদেশের বাজার থেকে এই প্রযুক্তি কিনে নিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র উত্তর কোরিয়া হতে পারে প্রধান উৎস। আবার ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিম জং–উন এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়াননি ঠিকই। কিন্তু তিনি যেভাবে গোপনে ইউক্রেনে রুশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য সেনা পাঠিয়েছেন, তেমনিভাবে তিনি তেহরানকেও গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারেন। পারমাণবিক প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিমের অতীত ইতিহাস রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মোজতবা খামেনি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুবর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর আধিপত্যের শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশের সংখ্যা বাড়ছে। ইরানও সেই তালিকায় যোগ দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে ইউক্রেন এই শর্তে তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করেছিল যে পশ্চিমারা তাদের নিরাপত্তা দেবে।
কিন্তু ২০১৪ সালে রাশিয়ার হামলার সময় সেই প্রতিশ্রুতি মূল্যহীন প্রমাণিত হয়েছিল। ইরাক কিংবা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও আমরা একই চিত্র দেখেছি। প্রশ্ন জাগে, ভেনেজুয়েলার কাছে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত তবে কি ট্রাম্প দেশটিকে আক্রমণ করার সাহস দেখাতেন?
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করা দেশগুলো যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করত তবে অন্য দেশগুলোর পারমাণবিক ঢাল অর্জনের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু বড় শক্তিগুলো প্রতিনিয়ত তাদের কথা ভঙ্গ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বর্তমানে পারমাণবিক চুক্তির সুযোগগুলো নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহার করছে। আর ইসরায়েল তো এখন পর্যন্ত এই চুক্তিতে স্বাক্ষরই করেনি।
ইরান যে তিন কারণে পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে নাট্রাম্পের অযৌক্তিক এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। তাঁর এই সমরবাদ পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বিলিয়ন ডলার খরচ করে তাদের অস্ত্রাগার আধুনিকায়ন করছে। রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও একই পথ অনুসরণ করছে। অন্যদিকে চীনও দ্রুতগতিতে তাদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। অথচ ট্রাম্প স্নায়ুযুদ্ধের আমলের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো নবায়ন করতে বারবার অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ট্রাম্প বারাক ওবামার করা ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিটি বাতিল করেছেন, যা বর্তমান সংঘাতের প্রধান কারণ। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন। ফলে পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়ে তাঁর দেওয়া ধর্মীয় ফতোয়া বা আদেশও সম্ভবত এখন গুরুত্ব হারিয়েছে।
ইরানি সভ্যতার ওপর ট্রাম্পের এত আক্রোশ কেনইরান প্রশ্নে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু দুটি বড় ভুল করছেন। তাঁরা ভাবছেন যে ধ্বংসযজ্ঞ চালালেই ইরানিরা সবকিছু ভুলে যাবে। অথচ মিনাব স্কুলের গণহত্যা এবং যে কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা ওয়াশিংটন করেছে, তা ইরানিরা কখনোই ভুলবে না। শাসক দল যা-ই হোক না কেন, ইরানের দিক থেকে হুমকির অনুভূতি থেকেই যাবে। দ্বিতীয়ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হলেও ইরানের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নেই।
তেহরানের সামনে উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ রয়েছে। উত্তর কোরিয়া মূলত পাকিস্তান থেকে প্রযুক্তি সংগ্রহ করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছিল। কিম জং–উন পরবর্তী সময়ে বাশার আল–আসাদের সিরিয়াতেও সেই প্রযুক্তি সরবরাহ করেছেন। এমনকি ইরান ও রাশিয়ার কাছে এখন তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করছে।
ধারণা করা হচ্ছে, কিম জং–উন ইরানকে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহ করতে পারেন। অথবা উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম ও পারমাণবিক নকশার বিনিময়ে ইরানের কাছ থেকে তেল নিতে পারেন। এ বিষয়ে কেউ কিমকে থামাতে পারবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
ট্রাম্পের গত কয়েক বছরের কর্মকাণ্ড উত্তর কোরিয়াকে আরও সাহসী করে তুলেছে। কিম জং–উন সাফ জানিয়েছেন, ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের কারণেই বোঝা যায় যে পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়া তাঁর দেশের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তেহরান নিশ্চয়ই এই বার্তাটি শুনতে পেয়েছে।
প্রশ্ন হলো কেন ট্রাম্প উত্তর কোরিয়াকে ইরানের চেয়ে আলাদাভাবে দেখেন? উত্তর কোরিয়া তো পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বড় হুমকি এবং সেখানে একনায়কতন্ত্র চলছে। এর একমাত্র কারণ হলো উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ট্রাম্প যাই হোন না কেন, পারমাণবিক শক্তিধর দেশে হামলা করার মতো বোকা তিনি নন।
মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবেট্রাম্প ও পুতিনের এই আচরণ সারা বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা একটি বড় বিপর্যয়। ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে পা বাড়ায় তবে সৌদি আরব, মিসর কিংবা তুরস্কও কি একই কাজ করবে না? এই প্রবণতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান যুদ্ধের নজির ব্যবহার করে চীন কি তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারে? আর যদি তেমনটা ঘটে তবে তাইওয়ান বা জাপানও কি তখন নিজেদের রক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের সন্ধানে নামবে না?
এমন এক গুমোট পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আগামী সোমবার নিউইয়র্কে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির সম্মেলন শুরু হতে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কূটনীতির ব্যর্থতা এবং পারমাণবিক বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন এক পৃথিবীর যে স্বপ্ন আগে দেখা হতো, তা এখন ধীরে ধীরে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে রাশিয়া বারবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে ইরানের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও শোনা গিয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্রও হয়তো পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকতে পারে। এ ধরনের হুমকি এখন বিপজ্জনকভাবে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। যদি এখনই একটি যুক্তিপূর্ণ আলোচনার পথ বের করা না যায়, তবে ইরানসহ অন্য দেশগুলোকেও আর নিরস্ত্র রাখা সম্ভব হবে না। বিশ্ব এক ভয়ানক অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে পেশিশক্তিই হবে শেষ কথা।
সায়মন টিসডাল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত