হরমুজ খোলা নিয়ে ইরানের প্রস্তাবে ট্রাম্প কেন অসন্তুষ্ট, কী ভাবছে মার্কিন প্রশাসন

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টাদের বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খোলা এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে তিনি সন্তুষ্ট নন। সোমবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিষয়ে অবগত একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি জানিয়েছেন।

Visit umafrika.club for more information.

নতুন প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার বিস্তারিত জানাশোনা আছে—এমন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা এ কথা জানিয়েছেন।

ইরান নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করার মার্কিন প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

ট্রাম্প ঠিক কী কারণে নতুন প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে তিনি বারবার জোর দিয়ে বলে আসছেন, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব মেনে নিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিজয়ী বলে মনে না হতে পারে।

ট্রাম্পের চিন্তাভাবনার বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, চলমান যুদ্ধ এবং তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তৎপরতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

ওমানের মুসান্দাম উপকূলের অদূরে হরমুজ প্রণালিতে থাকা জাহাজ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এমন অনেক জাহাজ সেখানে আটকা পড়ে আছে। ২৭ এপ্রিল ২০২৬

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাইরে কী কথাবার্তা হচ্ছে, সেটা ধরে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করবে না। আমরা আমাদের রেড লাইন (চূড়ান্ত সীমারেখা) নিয়ে শুরু থেকেই স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছি। প্রেসিডেন্ট কেবল এমন একটি চুক্তি করবেন, যা আমেরিকান জনগণ ও পুরো বিশ্বের জন্য মঙ্গলজনক হয়।’

প্রণালিটি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে একটি জোরালো বিতর্ক চলছে। সেটি হলো এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরানের মধ্যে কে প্রভাব খাটাতে পারছে এবং এই জলপথ বন্ধ থাকায় যে অর্থনৈতিক দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে টিকে থাকার ক্ষেত্রে কোন দেশ বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ইরান আদৌ কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা। তাঁরা বলছেন, প্রণালিটি খোলার বিষয়ে একটি চুক্তি করাই এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত রোববার পাকিস্তানে প্রস্তাবটি হস্তান্তর করেন। সেটি হাতে পাওয়ার পর সোমবার ট্রাম্প তাঁর উপদেষ্টাদের নিয়ে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের আরেকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে একটি শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তির বিষয়ে ছাড় দেওয়ার জন্য ইরানের নেতৃত্ব তাঁদের আলোচকদের ক্ষমতা দেয়নি। ফলে আপস বা শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর যেকোনো চেষ্টা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি ও ইরানের অবস্থান নির্দেশকারী মানচিত্রের ইলাস্ট্রেশন

ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইরান এবং দেশটির অক্ষমতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কে তাদের নেতা, ইরান সেটি বুঝতেই হিমশিম খাচ্ছে! আসলেই তারা জানে না!’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে চরমভাবে হারতে থাকা “কট্টরপন্থী” এবং কেবল নামে মধ্যপন্থী এমন “মধ্যপন্থীদের” (তবে তারা সম্মান অর্জন করছে!) ভেতরের কোন্দল একেবারে পাগলামির পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে!’

কী ভাবছে মার্কিন প্রশাসন

বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারের ওপর থেকে চাপ কমাতে পরমাণু আলোচনা পিছিয়ে দেওয়াটা হয়তো দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর একটি উপায় হতে পারত। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত করার যেকোনো সিদ্ধান্ত, এমনকি তা সাময়িক হলেও এটি এই বার্তা দেবে যে যুদ্ধ (যুক্তরাষ্ট্রের) একটি প্রধান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। আর সেই লক্ষ্যটি ছিল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি করতে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানো।

প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে করা আলোচনা সমস্যাসংকুল হবে। মার্কিন অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানির সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু টোল না দেওয়া জাহাজে ইরানের হামলার হুমকির কারণে অন্যান্য তেলবাহী জাহাজ চলাচলও ব্যাপক হারে কমে গেছে।

প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে করা আলোচনা সমস্যাসংকুল হবে। মার্কিন অবরোধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের তেল রপ্তানির সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু টোল না দেওয়া জাহাজে ইরানের হামলার হুমকির কারণে অন্যান্য তেলবাহী জাহাজ চলাচলও ব্যাপক হারে কমে গেছে।

ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলে আসছেন, প্রণালিটি খুলে দেওয়ার যেকোনো চুক্তিতে ওই পথে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর তাদের কর বা ফি আরোপের সুযোগ রাখতে হবে।

ঐতিহাসিকভাবে আন্তর্জাতিক জলপথ বা প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতার ওপর এ ধরনের যেকোনো বিধিনিষেধের বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ ক্ষেত্রে মিশ্র বার্তা দিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্কের মূলে ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের কিছু আলোচনা। সেসব আলোচনা ছিল অর্থনৈতিক প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা ঘিরে এবং আলোচনার টেবিলে তেহরানকে বড় কোনো ছাড় দিতে বাধ্য করতে আরও কী ধরনের মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে, তা নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা ঘিরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ১০ এপ্রিল ২০২৬

ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মন করেন, আরও দুই মাস এই অবরোধ চালিয়ে নিলে তেহরানের জ্বালানিশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

তেল কূপগুলো চাইলেই চালু বা বন্ধ করা যায় না। বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখলে কূপগুলোর ক্ষতি হবে এবং মেরামতের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে। ওই কর্মকর্তাদের যুক্তি, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা এড়াতে ইরান শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি করবে।

তবে প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা বলেছেন, এই মূল্যায়ন ত্রুটিপূর্ণ। তাঁরা উল্লেখ করেছেন, ইরানের অবস্থান এখন আরও কঠোর হয়েছে। আর ক্ষমতাকাঠামোয় ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের নিয়ন্ত্রণ কেবল আরও মজবুতই করেছে।

মার্কিন সরকারের মূল্যায়ন হলো ইরানের আলোচকদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতা বা রেভোল্যুশনারি গার্ডস কোরের শীর্ষ কর্মকর্তারা—কেউই দেননি। নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ইরানের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে করার তেমন কোনো কারণ নেই।

এমনকি আবার বোমা হামলা শুরু করা হলেও সেটা যে ইরানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বদলাতে পারবে, তেমন জোরালো সম্ভাবনাও কম।

ইরান আদৌ কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা। তাঁরা বলছেন, প্রণালিটি খোলার বিষয়ে একটি চুক্তি করাই এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়।

Read full story at source