ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক শ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস

· Prothom Alo

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে গত ২৬ মার্চ টেলিভিশনে প্রচারিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সামরিক সাফল্য নিয়ে বেশ বড়াই করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাশে বসে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসে কখনো কোনো দেশের সামরিক বাহিনীকে এত দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি।’

Visit sport-newz.biz for more information.

এর পরদিন সৌদি আরবে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হন। ধ্বংস হয় ৭০ কোটি ডলার দামের একটি নজরদারি বিমান।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন হামলা ছিল না। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) হিসাব করেছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এবং কথিত ভুলবশত নিজেদের ওপর নিজেদের হামলার (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) একটি ঘটনা ২৩০ কোটি থেকে ২৮০ কোটি ডলার দামের মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সিএসআইএস তার একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেছে। বড় কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার করা এটিই প্রথম বিস্তারিত তালিকা। আল–জাজিরা প্রথম এ খবর প্রকাশ করেছে।

এ হিসাবের মধ্যে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কিংবা কোনো বিশেষ সরঞ্জাম বা নৌসম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সিএসআইএসের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান এই হিসাব করেছেন। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র যেসব ঘাঁটি ব্যবহার করে, সেগুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও তিনি খতিয়ে দেখেছেন।

তবে এ কাজ এখন আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। মহাকাশ থেকে ছবি পাওয়ার বৈশ্বিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবসের কোনো স্যাটেলাইট ছবিই আর সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত নেই। মার্কিন সরকারের অনুরোধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে ইরানের স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিগুলো পাওয়া যাচ্ছে। কানসিয়ান মার্কিন ঘাঁটিগুলোর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ওপর থেকে তোলা ছবি দেখে বুঝতে পারছি, কোন কোন ভবন আক্রান্ত হয়েছে। তবে ওই ভবনগুলোর ভেতর কী ছিল, তা জানা কঠিন।’

মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল

কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল

কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কথিত ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ বা নিজেদের হামলায়। মার্চ মাসের শুরুতে কুয়েতে এমন এক ঘটনায় তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়।

যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ বিমান ও রাডার ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। এর মধ্যে বিশেষ করে দুটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। গত ১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র অন্তত একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার হারায়। এটি থাড প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও কিছু অতি দ্রুতগতির বা হাইপারসনিক হুমকি শনাক্ত করত। রাডারটি অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু–সম্পর্কিত তথ্যও পাঠাত।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুটি রাডার ধ্বংস হয়েছে। এতে মোট খরচ হয়েছে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৯৭ কোটি ডলার।

এগুলোর অবস্থান নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী অবস্থান করছে। ওই সব দেশে থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বসানো হয়েছিল।

গত ২৭ মার্চ সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলা হয়। হেগসেথের বড়াই করার ২৪ ঘণ্টাও পার হয়নি, এর মধ্যেই ৭০ কোটি ডলারের একটি ই-৩ অ্যাওয়াকস/ই-৭ রাডার শনাক্তকারী বিমান ধ্বংস করা হয়।

এটি আসলে আকাশে ওড়ার উপযোগী একটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এটি শত শত কিলোমিটার দূরের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পারে। আকাশপথের লড়াই পরিচালনা করতেও এটি সহায়তা করে।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের নিরাপত্তা ও সামরিক বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ওমর আশুর এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা গবেষণা কর্মসূচিরও প্রতিষ্ঠাতা। ওমর আশুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিছু হিসাব প্রকাশ করেছে। তবে রাজনৈতিক কারণে তারা সব তথ্য পরিষ্কারভাবে জানাতে পারবে না।

ওমর আশুর আল–জাজিরাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক সরঞ্জাম ও লোকবল হারানোর খবর প্রচার করতে চাইবে না।’ তিনি আরও বলেন, এর জন্য হয়তো আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে চড়া দাম দিতে হতে পারে।

ওমর আশুর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়।

ওমর বলেন, ‘ভিয়েতনামে তারা একের পর এক যুদ্ধে জিতেছে। আফগানিস্তানেও তারা জিতেছিল। কিন্তু সবশেষে তাদের কৌশলগত পরাজয় হয়েছে। কারণ, ওই খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের জয় শেষ পর্যন্ত বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনে কাজে আসেনি।’

ওমর আশুর আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কৌশলগত লক্ষ্যগুলো খুবই রাজনৈতিক।’ তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং দেশটিকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কথা উল্লেখ করে এ মন্তব্য করেন।

ওমর আশুর জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানে এই অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময়ের তুলনায় ১০ ভাগের ১ ভাগও নয়। ইরাক যুদ্ধে যে কয়টি বিমানবাহী রণতরি ব্যবহার করা হয়েছিল, এখন তা–ও নেই। ইরান কীভাবে এর প্রতিশোধ নিল?

কানসিয়ান বলেন, ইরান শুধু মার্কিন ঘাঁটিতেই হামলা করেনি, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে। এতে তিনি অবাক হয়েছেন। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘আমি মনে করি এটা তাদের একটি কৌশলগত ভুল ছিল। তারা ভেবেছিল, এই হামলার ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিন্ন হবে। কিন্তু এটি উল্টো তাদের যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে।’

‘উড়ন্ত রাডার’ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজ

কানসিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় শিক্ষা। একটি নৌবাহিনী প্রস্তুত না থাকলে কী হতে পারে, এ ঘটনা তা মনে করিয়ে দেয়। যুদ্ধের শুরুতেই ইরান এই প্রণালি দিয়ে বেশির ভাগ জাহাজ চলাচলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এরপর গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। তারা ইরানের বন্দরগুলো এবং এই জলপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা ইরানি জাহাজগুলো অবরোধ করে।

কানসিয়ান বলেন, ‘এটি অবাক করার মতো। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ৪৫ বছর ধরে এ বিষয় নিয়ে ভাবছে।’ এরপর তিনি নিজের সামরিক জীবনের কথা উল্লেখ করেন। কানসিয়ান যুক্তরাষ্ট্র মেরিন কোরের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। তাঁর সামরিক জীবন তিন দশকেরও বেশি সময়ের। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ইরাক যুদ্ধে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।

কানসিয়ান কেশম দ্বীপ দখলের জন্য করা উভচর হামলার পরিকল্পনার অনুশীলনে অংশ নেওয়ার কথা স্মরণ করেন। ধারণা করা হয়, ইরান এই দ্বীপের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় তাদের বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মজুত করে রেখেছে। তিনি বলেন, ‘এ বিষয় যে হঠাৎ করে সামনে চলে এসেছে, তা নয়।’

কানসিয়ান বলেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যখন বর্তমান যুদ্ধটি শুরু করে, তখন তাদের হাতে পর্যাপ্ত বাহিনী প্রস্তুত ছিল না।

সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও বলেন, শুরুতে না করলেও এখন তারা এটি করছে। তবে কোনো কারণে সম্ভবত তারা হরমুজ প্রণালি খোলার সক্ষমতা হারিয়েছে। অথবা তারা এই মুহূর্তে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

আশুর বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনীও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনে দেশটির প্রথাগত সামরিক কাঠামো দুর্বল হয়ে গেছে। তবে তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও ড্রোন পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি।

আশুরের মতে, ইরানি নৌবাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি সত্য নয়।

ওমর আশুর বলেন, শক্তিশালী বা প্রথাগত নৌবাহিনী ছাড়াও সমুদ্রে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। ইরানের নৌবাহিনী দুর্বল হয়েছে ঠিকই, তবে তারা এখনো পরাজিত হয়নি। তারা মোটেও দমে যায়নি।

Read full story at source