বিভাজনের পরও প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ঈপ্সিত মানোন্নয়ন হয়েছে কি
· Prothom Alo

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন প্রতিষ্ঠান ও কার্যপরিধি জ্যামিতিক হারে সম্প্রসারিত হলেও গাণিতিক বা আনুপাতিক হারে জনবল কাঠামোর বিস্তার উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এর ফলে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তার ওপর বহুমাত্রিক দায়িত্বের চাপ ক্রমাগত পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যা কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসনিক দক্ষতা, তদারকি ও একাডেমিক সহায়তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একধরনের নীরব অবসাদ ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।
Visit palladian.co.za for more information.
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক বিন্যাসে একদিকে যেমন বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান, অন্যদিকে তেমনি কাঠামোগত অসামঞ্জস্যও সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। এই অধিদপ্তরের অধীন ৯টি বিভাগীয় কার্যালয় এবং তাদের তত্ত্বাবধানে আঞ্চলিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১ হাজার ২৩২। এই বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে সুশাসনের আওতায় আনতে ইতিমধ্যে ৬৪টি জেলায় শিক্ষা অফিস এবং ৫১৬টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, কলেজ এবং স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলিয়ে প্রায় চার হাজার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে কোনো স্বতন্ত্র প্রশাসনিক দপ্তরের অস্তিত্ব নেই। ফলে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় তদারকি, জবাবদিহি ও মাননিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা বিরাজমান, যা সামগ্রিক শিক্ষা প্রশাসনের ভারসাম্য ও কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এই বাস্তবতার আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়, শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য কাঠামোগত বিভাজন অধিক যৌক্তিক, নাকি বিদ্যমান কাঠামোর সুসংহত সম্প্রসারণ ও জনবল পুনর্বিন্যাস অধিক ফলপ্রসূ? কেবল প্রশাসনিক পুনর্গঠন নয়, বরং ক্ষমতা, দায়িত্ব ও পেশাগত দক্ষতার ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাস ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। লক্ষ করলে একটি মৌলিক প্রশাসনিক বৈপরীত্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জেলা ও উপজেলায় মৎস্য, কৃষি কিংবা প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও সেক্টরভিত্তিক ক্যাডার দপ্তরের সুসংগঠিত উপস্থিতি বিদ্যমান থাকলেও স্বাধীনতার জয়ন্তীর দোরগোড়ায় এসেও শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রে সেই সমপর্যায়ের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো দৃশ্যমান না হওয়া নিয়ত অবহেলার এক দেদীপ্যমান দৃষ্টান্ত। ফলে শিক্ষা প্রশাসন একদিকে কেন্দ্রীভূত, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কাঠামোগতভাবে দুর্বল ও কার্যত অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
মাউশি ভেঙে দুটি অধিদপ্তর: কাদের স্বার্থে এই পরিবর্তনএই শূন্যতার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পভিত্তিক জনবলকে আত্তীকরণ করে, এমনকি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোর প্রশাসনিক সহায়ক শ্রেণির কর্মচারীদেরও বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একটি গভীর কাঠামোগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে নীতিগতভাবে উচ্চতর পেশাগত জ্ঞানসম্পন্ন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পরিবর্তে সহায়ক বা নিম্নতর প্রশাসনিক স্তরের কর্মীরা মাঠপর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভূমিকা পালন করছেন।
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে আত্তীকরণ কিংবা শিক্ষা-বহির্ভূত কর্মচারীদের পদায়নের ফলে শিক্ষার মতো জনজীবনের মৌলিক ক্ষেত্রে নানাবিধ ত্রুটি ও অসামঞ্জস্যতা দৃশ্যমান হচ্ছে। প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে জাল সনদের ভিত্তিতে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হওয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে, কোন স্বার্থান্বেষী চক্রের প্রভাব ও পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের অযোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং ঠিক কী প্রক্রিয়ায় তাঁরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নির্বিঘ্নে ফাইল উপস্থাপন করতে সক্ষম হন? এই অস্বচ্ছতার অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত করা গেলে জেলার শিক্ষা প্রশাসনে দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাগত সততার ভিত্তিতে একটি সুসংহত পদসোপান গড়ে তোলার অপরিহার্যতা নীতিনির্ধারকদের কাছে আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।
শিক্ষকতাকে ভ্যাকেশন থেকে নন-ভ্যাকেশন ঘোষণা করার সাতকাহনবর্তমান বাস্তবতায় আরও উদ্বেগজনক হলো অনেক ক্ষেত্রে অধ্যক্ষ বা সমমানের ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও প্রশাসনিক নির্দেশনা ও পরামর্শ দিচ্ছেন এমন ব্যক্তিরা, যাঁরা প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত, কিংবা স্কুল-কলেজের কেরানি পদ থেকে উন্নীত হয়ে কর্মকর্তা হয়েছেন অথচ তাঁদের শিক্ষকতা–সংক্রান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। এই পরিস্থিতি প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাস, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স এবং প্রশাসনিক মর্যাদার স্বাভাবিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এটি কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পেশাগত মর্যাদা, কর্তৃত্বের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানগত শৃঙ্খলার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করে।
প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর আলাদা হওয়ার পর মান বেড়েছে, না অবনমন হয়েছে, চলুন তথ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিচার করি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক শুমারি (এপিএসসি), ২০২৫ অনুযায়ী দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি, এর মধ্যে সরকারি ৬৫ হাজার ৫৬৭টি, আর ৪৯ হাজার ৬৩টি বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ দুই কোটি প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় এক কোটিই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয় সরকারি করার পরও অর্ধলক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর স্রোত যেন এক নীরব রায়।
রাষ্ট্র কি শুধু শিক্ষকদের বেলায় এসে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছেঅবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও মানোন্নয়ন না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পাঠদান, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, মাসিক উপবৃত্তি এবং মিড ডে মিলের মতো আকর্ষণীয় প্রণোদনা উপেক্ষা করে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। এসব মৌলিক প্রশ্নের আশু সুরাহা করতে হবে? এদিকে মন্ত্রণালয় পৃথক হওয়ার ফলে প্রশাসনিক স্তর স্ফীত হয়েছে। ১ জন সচিব, ৪ জন অতিরিক্ত সচিব, ৫ জন যুগ্ম সচিব ও ১৬ জন উপসচিবের পদ সৃজন হয়েছে। অধিদপ্তরের প্রধানের পদ তৃতীয় গ্রেড পরিচালক থেকে গ্রেড-১ ডিজিতে উন্নীত হয়েছে, পাঠদানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাবিহীন প্রশাসনিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা হয়েছে, অবকাঠামো বেড়েছে, কিন্তু মান কি বেড়েছে?
মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও চিত্র ভিন্ন নয়। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর পৃথক সত্তা হওয়ার পরও আলিয়া ও কওমি—উভয় ধারাতেই জটিলতা রয়ে গেছে। ইবতেদায়ি, ফোরকানিয়া, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল—এই ধারার শিক্ষার্থীরা সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে। কওমি মাদ্রাসার প্রায় ৩০ হাজার প্রতিষ্ঠানে আধুনিক কারিকুলাম ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি স্পষ্ট, স্বায়ত্তশাসনের আড়ালে কার্যত নিয়ন্ত্রণশূন্যতা কাজ করছে। অধিদপ্তর আলাদা হলেও গুণগত রূপান্তর ঘটেনি, স্বাভাবিকভাবেই বিভাজনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে?
বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন? অনুসরণ করুন এই ৫ ধাপএখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে বিভাজনের উদ্যোগ ঘিরে যে বিতর্ক, তা নিছক প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, এটি রাষ্ট্রের জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতাবণ্টনের গভীর সংকটের লক্ষণ। অনেকেই এটিকে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শিক্ষা পেশাজীবীদের ক্রমেই প্রান্তিক করে অশিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ডিরেক্টরেট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন ভেঙে যখন কারিগরি, প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরগুলো গঠিত হয়, তখন প্রশাসনিক নেতৃত্বে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের উপস্থিতি ক্রমেই ক্ষীণ হয়েছে।
এই বিতর্কের মূলে ফিরে যেতে হলে আমাদের ঔপনিবেশিক সূচনায় নজর দিতে হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষার ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মহাসনদ হিসেবে পরিচিত ১৮৫৪ সালের Wood’s Despatch আধুনিক শিক্ষা প্রশাসনের নকশা নির্মাণ করে। ১৮৫৫ সালে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ডিরেক্টরেট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন নামে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো, যার অধীন প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমন্বিতভাবে পরিচালিত হতো। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথে সেই ঐক্য ভেঙে গেছে। ১৯৬০ সালে কারিগরি শিক্ষা পৃথক হয়ে ডিরেক্টরেট অব টেকনিক্যাল এডুকেশন গঠিত হয়, ১৯৭৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা আলাদা সত্তা পায়, ১৯৮১ সালে ডিপিআই রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান মাউশিতে পরিণত হয়। ফলে আজকের প্রাথমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা—সবই একসময়ের ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর খণ্ডিত প্রতিরূপ। এখন যদি মাউশিকেও পুনরায় বিভাজন করা হয়, তবে সেটি হবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, যার নীতিগত যুক্তি এখনো অনির্দিষ্ট।
এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি উঠে আসে, একীভূত না বিভাজিত এবং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, নেতৃত্বে কারা? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বিন্যাসে নয়, জ্ঞানতত্ত্বে নিহিত। আধুনিক Public Policy–এর আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত সত্য নীতি কেবল নথি নয়, এটি বাস্তবতার সঙ্গে অবিরাম সংলাপ। Michael Lipsky এর ‘street-level bureaucracy’ আমাদের জানায়, মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই নীতির প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করেন। শিক্ষা খাতে এই কর্মীরা শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, একাডেমিক প্রশাসক—যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে নীতিকে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করেন।
অন্যদিকে Public Administration–এর ‘professional expertise in governance’ ধারণা দেখায়, সেক্টর নির্দিষ্ট জ্ঞান ছাড়া নীতির সূক্ষ্মতা অধরা থেকে যায়। শিক্ষা এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে শ্রেণিকক্ষের গতিশীলতা, শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব, মূল্যায়নের জটিলতা সবই অভিজ্ঞতানির্ভর। কেবল জেনারেলিস্ট প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে এর গভীরতা অনুধাবন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত Peter Haas–এর ‘epistemic communities’ যা নির্দেশ করে, বিশেষজ্ঞদের সংগঠিত জ্ঞানই নীতিকে দিকনির্দেশনা দেয়।
এই তাত্ত্বিক আলোচনার আলোকেই বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নীরব বৈপরীত্য উন্মোচন করে। একদিকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের যুক্তি, অন্যদিকে পেশাগত জ্ঞানের দাবি। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে শিক্ষা প্রশাসন হয় অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ও বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন, অথবা খণ্ডিত ও সমন্বয়হীন।
সাত কলেজশিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কেন মুখোমুখি হলোএই প্রেক্ষাপটে একটি আইনি ভিত্তিও স্মরণযোগ্য BCS (General Education) Composition and Cadre Rules, 1980 যেখানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা—সব শিক্ষা অধিদপ্তরের ক্যাডার পদগুলো শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃত। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই একসময় স্বীকার করেছে শিক্ষা প্রশাসনের কেন্দ্রে থাকা উচিত শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের।
অতএব, মাউশি বিভাজনের প্রশ্ন কেবল কাঠামোগত নয়, এটি একটি নীতিগত পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় যদি পেশাগত জ্ঞানকে প্রান্তিক করে কেবল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে ফল হবে বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন, কার্যত অকার্যকর একটি শিক্ষা প্রশাসন। আর যদি রাষ্ট্র স্বীকার করে যে শিক্ষা একটি জ্ঞাননির্ভর খাত, যেখানে নীতির প্রাণ নিহিত মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায়, তবে পথ খুলবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জ্ঞানভিত্তিক শাসনব্যবস্থার।
সিদ্ধান্তটি নীতিনির্ধারকদের কিন্তু এর প্রতিধ্বনি বহন করবে একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
* লেখক: সচিব তালুকদার, জাহিদ প্রভাত, অরিয়ন তালুকদার—শিক্ষক ও লেখক