মুস্তাফা জামান আব্বাসী: রঙিলা নায়ের মাঝি
· Prothom Alo

‘গোধূলির ছায়াপথে’ শীর্ষক যে কলামটি আমার পিতা মুস্তাফা জামান আব্বাসী প্রথম আলোতে লিখতেন, তা ছিল সমাদৃত। তবে তাঁর নিজ জীবনের সায়াহ্ন কেটেছিল মৌনতার সরোবরে। ১০ মে ২০২৫ বাবা চলে যাওরার পর একটি বছর কেটে গেল।
Visit biznow.biz for more information.
তিনি ছিলেন বড়ই সহজ মানুষ, কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তাশৈলীর গভীরতা প্রগাঢ়। বাবার বিষয়ে প্রতিভা ছাপিয়ে শুভ্র হৃদয়, সারল্য, মাটি ও মানুষের দরদি সত্তাই আমাকে সারাটি জীবন মুগ্ধ করেছে। তাই তিনি আমার আদ্য গুরু ও জনমদাতা পিতা।
তাঁর পিতা কৃতিময় আব্বাসউদ্দীন আহমদ, যাঁর আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৫৭ বছর। তিনি তাঁর অধরা স্বপ্নকে পূর্ণ করে গেছেন। সেটি হলো লোকসংগীত। কালের যাত্রাপথে কনিষ্ঠ পুত্র আব্বাসীর—ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজন যতটুকু, তার বেশি সময় তিনি অর্থকড়ি জীবনকে দেননি।
একজন প্রশ্ন করেছিলেন আমাকে, তাঁর (আব্বাসী) এত সুন্দর কণ্ঠ, কিন্তু তাঁর কোনো সিগনেচার গান নেই কেন? কারণ, তিনি নাম করতে চাননি। আধুনিক বা চলচ্চিত্রের গান না করে লোকসংগীতকে পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের অনন্য সার্থকতা।
তিনি (আব্বাসী) লোকসংগীত আহরণ করেছেন পৃথিবীর বৃহত্তম গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলা ভূমির গ্রাম, বনানী, শত নদীর তীর ও জনপদ থেকে। তিনি বিশ্বাস করতেন, গ্রাম চেনে না, সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। গ্রামই আমাদের দেশের সৌন্দর্যের আকর।
মুস্তাফা জামান আব্বাসীবাবা তাঁর পশ্চিমবঙ্গে ফেলে আসা কালজানি কিংবা তোর্সা নদীর উথালপাতালের প্রবল টান সারাটি জীবন অনুভব করেছিলেন। তিনি বলতেন, সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কীর্তি এই নদীতীর। যারা নদীকে ভালোবাসবে, নদী তাদের উপহার দেবে এমন কিছু, যা শাশ্বত। নীল নদ দিয়েছে মিসরের সভ্যতা। গঙ্গা, পদ্মা ও যমুনা দিয়েছে আমাদের সভ্যতা।
তাই বাবা লোকসংগীত আহরণে বাউলের মতো ঘুরেছেন এ দেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সর্বত্র। বিটিভির কল্যাণে পরিশ্রমী প্রযোজক, কুশীলব আর কোনোরকমে চলমান মাইক্রোবাসটি নিয়ে তাঁরা গ্রাম, নদীর তীর ঘুরে বেড়িয়েছেন। উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালিসহ প্রায় ১১৪ ধরনের লোকসংগীত সংগ্রহ করেছেন। সেসব সংগীতে পুত্র-সন্তানের আগমনী গান, কখনো বিবাহ আগমনী, মন্ত্র গান, অষ্টক আহিরা, ক্ষিরল, গিদালি, চাপান, জ্ঞান, ঝুমুর, বিচার, বিরুয়া, ভুঁইমারি আরও কত ধরনের গানের নাম, যা বর্ণনা সম্ভব নয়।
আজ যেসব গান ব্যান্ড সংগীত বা অন্য শিল্পীরা গেয়ে খ্যাতি পাচ্ছেন, তার সিংহভাগ আব্বাসীর সংগ্রহ করা। রাধারমণের ‘ভ্রমর কইও গিয়া’, হাসন রাজা, আবদুল করিমের ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’। বিজয় সরকারের মর্মস্পর্শী গান—যেটি আব্বাসী–আবিষ্কৃত কুষ্টিয়ার তরুণ আকবর আলী সাঁইয়ের কণ্ঠে ‘দয়াল চাঁদ আসিয়া কবে পার করিবে এমন সৌভাগ্য আমার কবে হবে’ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে আদৃত।
বিটিভিতে দুই দশকের বেশি ‘আমার ঠিকানা’ ও ‘ভরা নদীর বাঁকে’ নামের অনুষ্ঠান দুটি ছিল অতীব জনপ্রিয়। যে জনপদে যেতেন, সেখানে গান চয়ন ও সংগ্রহ করে সেই গানগুলো ওই অঞ্চলের স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনের ধরন অনুযায়ী ধারণ করতেন। পাশাপাশি একই অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত লোকগীতিশিল্পী ও জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠে গানগুলো পরিবেশনের কারণে দর্শক–শ্রোতার মন জয় করেছে।
আজ যেসব গান ব্যান্ড সংগীত বা অন্য শিল্পীরা গেয়ে খ্যাতি পাচ্ছেন, তার সিংহভাগ আব্বাসীর সংগ্রহ করা। রাধারমণের ‘ভ্রমর কইও গিয়া’, হাসন রাজা, আবদুল করিমের ‘বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে’। বিজয় সরকারের মর্মস্পর্শী গান—যেটি আব্বাসী–আবিষ্কৃত কুষ্টিয়ার তরুণ আকবর আলী সাঁইয়ের কণ্ঠে ‘দয়াল চাঁদ আসিয়া কবে পার করিবে এমন সৌভাগ্য আমার কবে হবে’ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে আদৃত।
গ্রামীণ শিল্পীরা ঢাকায় এলে আব্বাসীর বাসায় উঠতেন। মনে পড়ে, দৃষ্টিহীন শিল্পী তৈয়ব আলী এসে সপ্তাহের পর সপ্তাহ থাকতেন। তাঁর সঙ্গে সুরেশ্বরে বাবার পরিচয়। শরীয়তপুরের সুরেশ্বরে রাতভর গানের মেলায় আমরা সপরিবার গিয়েছি। লালন শাঁইকে নিয়েও তিনি অনেক গবেষণা করেছেন। তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘লালন যাত্রীর পশরা’য় এসব বিবৃত হয়েছে। বাণীর আড়ালে অগণ্যের সন্ধান।
মুস্তাফা জামান আব্বাসীর গানের একটি অ্যালবামের প্রচ্ছদআব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে গীত ইসলামি গান, নাতে রাসুল (সা.) ও হামদ অনন্য। আমার মতে, খোদায় সমর্পিত আশেকে রাসুল আমাদের পিতা সেই সব নাত ও হামদকে যেভাবে গাইতে পেরেছেন, তা অতুলনীয়।
তিনি পরিণত বয়সে হাতে–কলম তুলে নিলেন। তা যেন রঙিলা নায়ের এক নতুন পাল। একেক করে তুলির টানে লিখে গেলেন পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ। তখন তিনি অন্য মানুষ। সারা দিনমান ধ্যানস্থ নিজের পড়ার ঘরে।
বাবার প্রথম বই ‘মুহাম্মদের নাম’। নবীজিকে নিয়ে অসাধারণ এ গ্রন্থেই পাওয়া যাবে তাঁকে অনুসরণের এক প্রশান্ত চিত্ত, পাওয়া যাবে জীবনপথের আশা-নিরাশার মাঝে সরল–সহজ পুণ্য পন্থার সন্ধান। আহা, তিনি কী বিভোর হয়ে গাইতেন—
‘যার যার ভজনা করো
থাকিতে মন এ সংসারে
তালাশ করগা আগে তারে তালাশ কর গা আগে’
আমি তাঁর বইগুলো বারবার পড়তাম। দাগ দিয়ে রাখতাম, নোট করতাম। তিনি প্রসন্ন মনে বলতেন, ‘মা, আর একটি পাঠকও যদি না জোটে, তুমি যেমন করে আমার বইগুলো পড়ো, তাতেই আমার যা পাবার পেয়ে গেছি।’
বড় বড় ওস্তাদের কাছ থেকে তালিম নিয়েছিলেন মুস্তাফা জামান আব্বাসীনবীন প্রজন্মের জন্য ঝরঝরে, কাব্যিক, কিন্তু সরল কথামালায় অনুবাদ করেছেন কোরআন শরিফ—স্পষ্ট জ্যোতি আল কোরআন। এ ছাড়া তাঁর লিখিত অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘জীবন নদীর উজানে’, ‘রুমির অলৌকিক বাগান’, নজরুলের ওপর ফিকশনধর্মী ‘পুড়িব একাকী’, ‘আব্বাসউদ্দিন মানুষ ও শিল্পী’, ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’, ‘যে নামেই ডাকি’, ‘গোধূলীর ছায়াপথে’ প্রণিধানযোগ্য।
তিনি (আব্বাসী) শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছেন বাঘা বাঘা শিল্পী ও ওস্তাদদের কাছে। মজার বিষয়, বাবা নৃত্য শিখেছেন গওহর জামিলের কাছে। রবীন্দ্রসংগীত শিখতেন প্রখ্যাত শিল্পী কলিম শরাফীর কাছে। তিনি তবলাসহ দোতারা বাজাতেন ভালো। অভিনয়ও করতেন। শুনেছি, তাঁকে চলচ্চিত্রের হিরো বানাতে চেয়েছিলেন এহতেশাম সাহেব। যাহোক, আমরা এ নিয়ে মজা করেছি, বাবা বেঁচে গেলেন। তিনি পানজেগানা নামাজি শুনে আমার নানু বাবার সঙ্গে মায়ের বিবাহে রাজি হন।
তাঁর ছোট বোন প্রখ্যাত ফেরদৌসী রহমান ও তিনি ঢাকা, কলকাতা, করাচি, লাহোর ছাড়িয়ে স্টেজ পারফরম্যান্স করতেন এবং কিছু চলচ্চিত্রেও গান গাইতেন। আব্বাসীর সুর করা—
‘যেজন প্রেমের ভাব জানে না,
তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা
খাঁটি সোনা ছাড়িয়ে যে নেয় নকল সোনা
সেজন সোনা চিনে না...’
গানটি মন কেড়েছিল সবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনে তিনি (আব্বাসী) সব বছরই ডাকসুতে সংস্কৃতি ও সাহিত্যবিষয়ক পদে জয়ী হতেন।
তাঁকে নিয়ে লিখতে হলে কত প্রহর যে গড়িয়ে যাবে! ভীষণ সহজ মানুষ ছিলেন। পুরানা পল্টনের রূপকথার মতো জীবনে কত–কী যে ঘটত। হীরামন মঞ্জিল। সেই পল্টনের বাড়ি বাংলাদেশের সংগীত ও সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর বলা যায়। সেখানে পয়লা বৈশাখও উদ্যাপন করা হতো। কালের আবর্তে সেটি আর নেই। কিন্তু কখনো হারিয়ে যাবে না উদ্ভাসিত সেই দিনগুলো।
বাবা এতই সারল্যে ভরা মানুষ ছিলেন, সেই কালে বায়তুল মোকাররমের ফুটপাত থেকে ৫০০ লিচু নিয়ে বাড়ি ফিরে বললেন, ‘শোনো তোমরা, দোকানিরা আমাকে এমন জেঁকে ধরল আজ। বলে, “স্যার, কাল রাইতে আপনার “আমার ঠিকানা” অনুষ্ঠান দেখার জন্য সময়ের আগে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছি।”’ আমরা দুই বোনে বললাম, ‘তাতো বটেই। কিন্তু আব্বা ২০০ লিচুই পচা।’ তিনি বললেন, ‘এত ধরতে নেই। ওরা দরিদ্র। ওদেরও তো বাঁচতে হবে।’
মুস্তাফা জামান আব্বাসী ছিলেন একজন সুলেখক। সঙ্গীত, লোকসাহিত্য, স্মৃতিকথা, ধর্ম, জীবনী—নানা বিষয়ে লিখেছেন পঞ্চাশের অধিক বই।জীবনের শেষ ছয়টি বছর তিনি নিশ্চুপ হয়েই থাকতেন। আমার বিশ্বাস তিনি পরমাত্মার সঙ্গে ছিলেন। সাদা চুল, শুভ্র দাড়ি, টানা টানা স্বপ্নিল চোখে জ্যোতি–বিভাসিত নুরের প্রকাশ।
একদিন বাবা বললেন, ‘মা, গতকাল রাতে স্বপ্নে ৫০ বছর আগে ফেলে আসা কোচবিহারের বলরামপুরের বাড়ির আঙিনায় ফেলে আসা কাঁঠালিচাঁপার সুবাস পেলাম অবিকল। ছিপ বাঁধা আহত মাছের চাহনি দেখলাম। এ–ও কি সম্ভব? তাহলে কিছুই কি হারায় না?’
কাঁঠালিচাঁপার সুবাস, আহত মাছের চাহনি কিংবা ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া মাউথ অর্গানের সুর! বললাম, ‘হতেই পারে বাবা। মানুষ যা ভাবে আজীবন, স্বপ্ন দেখে যে মহত্ত্বের পিপাসার, এর সবকিছুই বেঁচে থাকে, ভগ্নাংশে নয়, পুরোপুরি।’
আদ্যন্ত শুভ্র, পরাক্রান্ত এক রাজাধিরাজ, নানা প্রতিভায় উদ্ভাসিত আমাদের পিতা ছিলেন এক ক্ষণজন্মা মানুষ। দেখতে পাই, পুবালি বাতাসে পাল তুলে অন্য কোথাও চলেছেন। এই রঙিলা নায়ের মাঝি, সেই অমরাবতীর ঘাটে প্রভুর অসীম দয়ায় আবার নিশ্চয়ই দেখা হবে।
শারমিনী আববাসী আইনজীবী ও লেখক; মুস্তাফা জামান আব্বাসীর মেয়ে