হাওরে বোরো ধানের ক্ষতির তালিকা ‘প্রস্তুত’, কবে আসবে সরকারি বরাদ্দ
· Prothom Alo
সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই লক্ষাধিক কৃষকের ৫২ হাজার হেক্টরের ফসলহানি। ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে মাঠের ধান। নৌকা থেকে ডোবা ধান কাটতে মাঠে নামছেন এক কৃষক। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের মিঠামাইন হাওরেহাওরে এবার বোরো ধানের ভালো ফলনের আশায় ছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সেই আশা ভেসে গেছে। পাঁচ জেলায় প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৫৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক।
Visit rocore.sbs for more information.
তবে হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি জানিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় থেকেই কীভাবে, কারা তালিকা করবে, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার কৃষকেরা। এখন পর্যন্ত মোট ফসলহানির প্রায় ৭১ শতাংশই হয়েছে এই দুই জেলায়। এ ছাড়া মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকেরাও ক্ষতির শিকার হয়েছেন। চার জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা এখনো কোনো সহায়তা পাননি। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আড়াই শ কৃষককে প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে।
পানিতে ডুবে থাকা ধান কেটে হাওরপাড়ে স্তূপ করে রাখা ধান শুকানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে উঁচু স্থানে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরেহাওরাঞ্চলের কৃষকেরা একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। এই আয় দিয়েই তাঁদের সারা বছরের খাওয়া-পরা, সন্তানের লেখাপড়াসহ প্রয়োজনীয় সব খরচ মেটে। তলিয়ে যাওয়া ধানখেতের পাশে দাঁড়িয়ে এখন অনেক কৃষক ঋণ আর ক্ষতির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন। কেউ গরু বিক্রির চিন্তা করছেন, কেউ ভাবছেন জমি বন্ধক দেওয়ার কথা।
স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার তিন মাসমেয়াদি মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা প্রতি মাসে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা ৫ হাজার টাকা এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেতে পারেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে ২০ থেকে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পাশাপাশি আগামী মৌসুমে কৃষকদের সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
গত ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে জানান, হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হবে।
এই কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দুটি জেলার কৃষকদের তথ্য এসেছে। বাকি জেলাগুলো থেকে আজ শনিবারের মধ্যে তথ্য পাওয়া যাবে। ঈদুল আজহার আগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হবে।
হাওরের সব জেলা থেকে তালিকা এসেছে কি না—প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন উল্লেখ করে সচিব আরও বলেন, আগামী তিন মাসের জন্য কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হবে। প্রতি পরিবার প্রতি মাসে ১৫ কেজি করে চাল পাবে। এ ছাড়া কৃষকদের একটি কার্ড দেওয়া হবে। তিন মাস তাঁদের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়া হবে।
বেশি ক্ষতি সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায়
সুনামগঞ্জে এবার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৮৫ ভাগ। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত হয়নি, এটি আরও বাড়বে।
জেলায় কৃষক পরিবার আছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭০৫টি। কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক হলেন ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন। ভূমিহীন কৃষক ৪৯ হাজার ১২৪ জন। এর মধ্যে ৯৮ হাজার কৃষকের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ইতিমধ্যে তালিকা তৈরি নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। এর সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যুক্ত হয়ে পড়েছেন। যাঁরা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁরা যেন সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, ‘আমরা চাই ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষক সরকারঘোষিত সহায়তা পাক। এ ছাড়া আগামী মৌসুম শুরু হলে কৃষকদের সার-বীজসহ কৃষি উপকরণ দিয়ে পাশে থাকতে হবে। ঋণগ্রস্ত কৃষকদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সেটিও ভাবতে হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে কাজ করছেন। সরকারঘোষিত বিশেষ সহায়তার বাইরে কৃষকদের কৃষি উপকরণ, আগামী মৌসুমে সার-বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়া যেতে পারে।
সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির পানি জমে অনেক হাওরে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এতে ক্ষতি হয় ধানের। এরপর ২৬ এপ্রিল শুরু হয় অতি ভারী বৃষ্টি, সেই সঙ্গে নামে উজানের পাহাড়ি ঢল। এতে জেলার সব হাওরেই কমবেশি বোরো ধানের জমি তলিয়ে যায়।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে জেলার দেখার হাওরপারের রাবারবাড়ি গ্রামের কৃষক আবদুল মকব্বির (৫০) বলছিলেন, তাঁরা শুনেছেন এলাকার মেম্বার (ইউপি সদস্য) ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম-ঠিকানা নিচ্ছেন। কিন্তু তাঁর নাম নেননি।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেছেন, প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে করা সেটি এখন যাচাই-বাছাই হচ্ছে। তালিকা চূড়ান্ত করে সেটি দ্রুত মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। ঋণগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, জেলায় কৃষিঋণ প্রদানসংক্রান্ত কমিটি আছে। দরকার হলে কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন।
এদিকে নেত্রকোনায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন ধান।
স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে করা তালিকা অনুযায়ী, ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৬৫ হেক্টর। ক্ষতির মুখে পড়া কৃষকের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৩৬৩।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের বিষয়ে কোনো বরাদ্দ আসেনি জানিয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, আগামীকাল রোববারের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হবে বলে তিনি আশা করছেন।
এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি
মৌলভীবাজার জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ২০৬ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ২৫ হাজারের বেশি কৃষক কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর কৃষকেরা ভালো ফসল পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। কিন্তু আকস্মিক অতিবর্ষণ ও ঢলে হাওরাঞ্চলে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে অনেক ফসল তলিয়ে যায়। শ্রমিকসংকট, ঘন ঘন বৃষ্টিসহ নানা কারণে পাকা ধান কাটা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অনেকে পানির মধ্য থেকে ডুব দিয়ে পাকা ধান তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে ধান পচে যাওয়ায় এই চেষ্টাও খুব একটা কাজে আসেনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা স্থানীয় প্রশাসনসহ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছি। তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নয়, এমন লোক ফাঁকে তালিকায় ঢুকে যায়। প্রকৃত কৃষক বাদ পড়ে যায়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কেউ যাতে বাদ না পড়ে, সে বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে দেখছি। এখনো ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ এলে নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া হবে।’
মঙ্গলবার রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না হলে সংশ্লিষ্ট ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কেউ সহায়তা থেকে বাদ যাবেন না। বাদ পড়লেও তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বর্গাচাষিদেরও সহযোগিতা করা হবে। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষাবাদ করেন। এ ক্ষেত্রে কাউয়াদীঘি হাওরাঞ্চলেই প্রায় সাত হাজার কৃষক। এ বিষয়ে স্টাডি দরকার, কীভাবে তাঁদের সহযোগিতা করা যাবে।
এদিকে হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে। তবে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে জেলার প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২৩ হাজার ৯০৪ জন কৃষক। তবে এখনো কেউ সরকারি সহায়তা পাননি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, যেসব কৃষক ঋণ নিয়ে বোরো চাষ করেছিলেন কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে পারেননি, তাঁদের ঋণসংক্রান্ত বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বর্গাচাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
‘গরু বেচে ঋণের টাকা দেওন লাগব’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৬৫। এ বছর জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে বোরো লাগানো হয়েছিল। বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫ হেক্টর জমি। তবে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে জেলায় হাওর নয় এমন এলাকায় ৮৯২ হেক্টর এবং নাসিরনগর, বিজয়নগর, নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর উপজেলার হাওর এলাকায় ৩০৭ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ হাজার ৬৫১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নাসিরনগর উপজেলায়। ১৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমির ধানের মধ্যে ২৮৫ হেক্টরের ক্ষতি হয়েছে। এতে উপজেলার ৩ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত উপজেলার ২৫০ জন কৃষককে সহায়তা হিসেবে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। নাসিরনগরে ফসলি জমি তলিয়ে যেতে দেখে জমিতেই মারা যাওয়া কৃষক আহাদ মিয়ার (৫৫) পরিবারকে দুই লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তিন হাজার কৃষকের তালিকা করেছেন। এই তালিকা এখনো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোস্তফা এমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষকদের সহায়তার জন্য ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে ৬০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করেছে। ঋণ নিয়ে যেসব কৃষক বোরো চাষ করেছিলেন, কিন্তু ফসল ঘরে তুলতে পারেননি, তাঁদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
নাসিরনগরের গোয়ালনগর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা অগ্নি সরকার পুরোদমে একজন কৃষক। স্ত্রী, চার মেয়েসহ ছয়জনের পরিবার তাঁর উপার্জনে চলে। স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা সুদে ঋণ নিয়ে এবার ছয় কানি (৩০ শতকে এক কানি) জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে তাঁর স্বপ্ন। পাঁচ কানির জমির ধানই তলিয়ে গেছে। এক কানি জমির ধান বাঁচাতে পারলেও তাঁর মাথায় এখন ঋণের বোঝা।
অগ্নি সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪০ হাজার টাকা ঋণ করছিলাম। সুদ (লাভ) ছাড়া কি কেউ টেহা দে? প্রতি হাজারে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে লাভ দিতে অইব। ঘরে দুটি গাভি ও দুটি বাছুর আছে। অহন গরু বেচে ঋণের টাকা দেওন লাগব।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন আকমল হোসেন, মৌলভীবাজার, খলিল রহমান, সুনামগঞ্জ, হাফিজুর রহমান, হবিগঞ্জ, শাহাদৎ হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পল্লব চক্রবর্তী, নেত্রকোনা]