১০ দিনে ৮ কোটি ভিউ! চমকে দিল ‘অ্যাপেক্স’

· Prothom Alo

এখন সব বড় তারকাকে অবধারিতভাবে নেটফ্লিক্সের ‘কর্তব্য’ পালন করতে হয়। শার্লিজ থেরন সেটা কয়েক বছর ধরেই করেছেন। এসব সিনেমা হয় ঝাঁ–চকচকে, কিন্তু ভেতরে প্রাণ থাকে না। কিছু আশাজাগানিয়া মুহূর্ত থাকলেও ‘অ্যাপেক্স’ তাই মোটাদাগে চলনসই সিনেমা। তবু সারা দুনিয়ার মানুষ দেখছে, গত ২৪ এপ্রিল মুক্তির পর থেকেই এখনো নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক টপ চার্টের শীর্ষে ছিল সারভাইভ্যাল থ্রিলারটি। এখন রয়েছে দুইয়ে। মুক্তির প্রথম ১০ দিনেই হয়েছে ৮ কোটি ভিউ!

আইসল্যান্ডীয় নির্মাতা বালতাসার কোরমাকুরের সিনেমাটি পুরোনো ঢঙের। শুরুর দৃশ্যটাও দুর্দান্ত, যা মনে করিয়ে দেয় ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সিনেমা ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’কে। নরওয়ের এক সুউচ্চ পাহাড় চূড়া আরোহণে ব্যস্ত সাশা (শালিজ থেরন) ও টমিকে (এরিক বানা)। ভয়ংকর ট্রল ওয়ালের খাড়া পাহাড়ে শীতকালে চড়া সহজ নয়। দিনের শুরুতে তাঁরা তাঁবু থেকে মাথা বের করে চারপাশ দেখেন, আর দর্শক তখন হাঁ করে আবিষ্কার করে—তাঁদের তাঁবু ঝুলছে প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া এক পাথুরে পাহাড়ের গায়ে। তাঁদের ছোট্ট আশ্রয়ের নিচে আছে শুধু ভয়ংকর এক অতল খাদ। প্রথম দৃশ্য থেকেই পরিচালক কোরমাকুর ও চিত্রগ্রাহক লরেন্স শের এমন সব মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া ড্রোন শট ব্যবহার করেন, যা পুরো ছবিজুড়েই বিপদের অনুভূতিকে তীব্র করে তোলে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

‘অ্যাপেক্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ঝড় ঘনিয়ে এলেও সাশা থামতে চায় না। আঙুল রক্তাক্ত ও ব্যান্ডেজে মোড়া থাকা সত্ত্বেও সে আরও ওপরে উঠতে চায়। কিন্তু বাস্তববাদী টমি দিন শেষ করার পরামর্শ দেয়। সামান্য পা ফসকে যাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সে সাশাকে রাজি করায়। টমি সাশাকে জানায়, এ ধরনের চরম অ্যাডভেঞ্চারে সে নিজের সীমায় পৌঁছে গেছে এবং আর এগোতে চায় না। ফলে পরদিন নিরাপদে নিচে নামার চেষ্টায় ট্র্যাজেডি ঘটলে তা খুব একটা অপ্রত্যাশিত লাগে না।

পাঁচ মাস পর, গল্প চলে আসে অস্ট্রেলিয়ায়। টমিকে হারিয়ে শোকাহত সাশা এখানে এসেছে একা ক্যাম্পিং করতে, নির্জনতা খুঁজতে। কাল্পনিক ওয়ানডারা ন্যাশনাল পার্কে পৌঁছে সে এক পার্ক রেঞ্জারের (অ্যারন পেডারসন) সঙ্গে দেখা করে। তিনি সাশাকে সতর্ক করেন—এত নির্জন জায়গায় একা যাওয়া নিরাপদ নয়। তাঁর অফিসের দেয়ালে ঝোলানো অসংখ্য ‘নিখোঁজ ব্যক্তি’র পোস্টারই সেই আতঙ্কের ইঙ্গিত দেয়।

একনজরেসিনেমা: ‘অ্যাপেক্স’ধরন: সারভাইভ্যাল ড্রামাপরিচালনা: বালতাসার কোরমাকুরঅভিনয়: শার্লিজ থেরন, ট্যারন এগারটনস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সদৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট

শুরুতেই সম্ভাব্য হুমকির আভাস পাওয়া যায়। স্থানীয় এক ভয়ংকর ক্যাঙারু শিকারি (ম্যাট হোয়েলান) ও তার মাতাল সঙ্গী (রব কালটন) সাশাকে বারবার বিরক্তি করে। এরপরেই দৃশ্যপটে হাজির হয় তুলনামূলক নিরীহ, সদা হাস্য স্থানীয় যুবক বেন (ট্যারন এগারটন)। পেট্রলপাম্পে সে সাশাকে বলে, সরাসরি রাস্তা না নিয়ে একটু ঘুরপথে যেতে, কারণ দৃশ্যগুলো নাকি অসাধারণ সুন্দর। সে মিথ্যা বলে না, প্রকৃতিই সেখানে ছবির অন্যতম আকর্ষণ।

‘অ্যাপেক্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

পরদিন সকালে সাশা নদীতে কায়াকিং করতে নামে। দৃশ্যগুলো ‘দ্য রিভার ওয়াইল্ড’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। পাথর, জলপ্রপাত আর ভয়ংকর স্রোতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর লড়াই। আসল বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন সাশার ব্যাগ চুরি হওয়ার পর বেন হাজির হয়ে তাকে নতুন সরঞ্জাম ও সকালের নাশতার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, তার উদ্দেশ্য ভয়ংকর। কিছুটা সময় পর বোঝা যায়, হাতের ক্রসবো দিয়ে বেন আসলে সাশাকে শিকার করতে চায়! এরপর শুরু হয় শিকারি বেন আর সাশার ইঁদুর-বেড়াল দৌড়।

‘অ্যাপেক্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

‘অ্যাপেক্স’-এর গল্প এগোয় চেনা টেমপ্লেট মেনেই। ‘উলফ ক্রিক’, ‘কিলিং গ্রাউন্ড’, ‘ফ্রি সোলো’ থেকে শুরু করে ‘ওয়েক ইন ফ্রাইট’—অনেক সিনেমার সঙ্গেই এটির মিল আছে। কোরমাকুর অস্ট্রেলিয়ার পাহাড়ি প্রকৃতি ও ঘন জঙ্গলকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সাশার প্রাণপণ দৌড়ের দৃশ্যগুলো প্রবল রোমাঞ্চ তৈরি করে।

এগারটন বেন চরিত্রটিকে যথেষ্ট শীতল ও ভয়ংকর করে তুলেছেন। কখনো অদ্ভুত হাস্যরস, কখনো শিশুসুলভ আচরণ—সব মিলিয়ে তার মধ্যে মানসিক বিকারের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। যখন সে সাশাকে ধরে নিজের ভয়ংকর আস্তানায় নিয়ে যায়, তখন সাশা ভয়াবহতা বুঝতে শুরু করে। এগারটন দারুণভাবে অস্ট্রেলিয়ার কঠিন উচ্চারণও রপ্ত করেছেন।

২৪৮ মিলিয়ন বাজেটে ৬৪১ মিলিয়ন ডলার আয়, চমকে দিল যে সিনেমা

তবে এসব মুহূর্তের চেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ হলো—কখন কার হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে, সেই টানাপোড়েন। এগারটনের উন্মাদ চিৎকার আর ভয়ংকর ক্রোধ ভরা চোখের বিপরীতে থেরনের সংযত দৃঢ়তা ও সহনশীলতা তৈরি করেছে দুর্দান্ত এক দ্বন্দ্ব। সাশা চরিত্রে শালিজ থেরন কোনো অজেয় সুপারহিরো নন বরং সত্যিকারের আতঙ্কিত ও বিধ্বস্ত এক নারী। তাই যখনই সে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়, সেটি দর্শকের জন্য রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সরু গিরিখাতে আটকে পড়ার পর তার পাহাড়ে ওঠার দক্ষতা আবার কাজে লাগে। পর্দায় যারা শার্লিজকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন—সবচেয়ে কঠিন অ্যাকশন চরিত্রও সামলানোর মতো শারীরিক সক্ষমতা তাঁর আছে। এবার তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম প্রকৃতির মধ্যে, যেখানে একদিকে প্রকৃতির ভয়ংকর শক্তি, অন্যদিকে এক উন্মাদ সিরিয়াল কিলার—দুইয়ের সঙ্গেই লড়তে হয়। তবে এটিকে তাঁর জন্য খুব কঠিন অভিনয় বলেও মনে হয় না। একেবারে দায়সারা নয়, কিন্তু নিজেকে নতুনভাবে চ্যালেঞ্জও করেননি। বরং মনে হয়, তাঁর বাকি অ্যাকশন ক্যারিয়ারে তিনি হয়তো সব সময়ই ‘ফিউরিওসা’র ছায়া বয়ে বেড়াবেন।

‘অ্যাপেক্স’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

২০২৪ সালে রোমান্টিক ড্রামা ‘টাচ’-এর পর কোরমাকুর আবার ফিরেছেন তাঁর চেনা সারভাইভ্যাল থ্রিলারের জগতে। এখানে তিনি তুলে ধরেছেন এমন এক রোমাঞ্চপিপাসু নারীর গল্প, যার কাছে নিজের সীমা পরীক্ষা করাই যেন জীবনের উদ্দেশ্য, বিশেষ করে যখন সব প্রতিকূলতা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। কোরমাকুর তাঁর লোকেশন ব্যবহারে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। গল্পের প্রতিটি মোড়, গুহা, নদীর স্রোত আর জলপ্রপাতকে তিনি এমনভাবে কাহিনির সঙ্গে মিশিয়েছেন যে প্রতিটির সম্ভাবনাই পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়েছে।

তবে সিনেমাটি কেবল এই সময়ের গল্প বলে, একবারে সহজবোধ্য ভাষায়; চরিত্রের গভীরে যেতে চায় না। ফলে সাশা আর বেনের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার অংশগুলো কখনো কখনো কিছুটা পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতে পারে। সাশার মতো শক্ত মনের একজন চরিত্র সহজে ভয় পাবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এত বুদ্ধিমান একজন মানুষ কেন একেবারে অচেনা কারও পরামর্শে জনবিরল পথে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
গল্প খুব ছকবাঁধা হলেও মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের ‘অ্যাপেক্স’ একবার দেখা যেতেই পারে।

Read full story at source