সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, দরকার জবাবদিহিও

· Prothom Alo

সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, দরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহির কাঠামো। পাশাপাশি শিশু উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে বিনিয়োগকে সামাজিক ব্যয় হিসেবে না দেখে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট টু হিউম্যান ক্যাপিটাল: লেভারেজিং সোশ্যাল প্রটেকশন ফর সোশ্যাল মোবিলিটি’ শীর্ষক কর্মশালার একটি অধিবেশনে বিশেষজ্ঞরা এমন মত দিয়েছেন।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং অক্সফোর্ড পলিসি ম্যানেজমেন্টের যৌথ আয়োজনে দিনব্যাপী এ কর্মশালায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমগুলোকে একটি সমন্বিত ও সুসংহত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় রূপ দিতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও নিয়মভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সেলিম রায়হান বলেন, কোনো মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার মাথায় হঠাৎ নতুন কার্যক্রমের ধারণা এলেই সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ না করে তা চালু করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এই অতিরিক্ত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতা রাখে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বাইরে থেকে ঋণ নিয়ে সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বাড়ানো দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। সরকার হয়তো স্বল্প মেয়াদে কিছুটা সুবিধা পাবে; কিন্তু টেকসই অর্থায়নের কাঠামো ছাড়া আমরা আবার একই জায়গায় ফিরে আসব।’

সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, এমন উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমগুলোকে একটি ছাদের নিচে আনার সুযোগ হতে পারে; কিন্তু বিদ্যমান কার্যক্রমগুলোর কাঠামোগত সমস্যা না সারিয়ে নতুন কার্যক্রম যোগ করলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর পারস্পরিক সমঝোতা বা বিকল্প বাছাইয়ের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ করা হলে সম্মিলিত ভবিষ্যতের জন্য একটি দূরদর্শী এবং অর্থবহ বিনিয়োগ করা হবে।

সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে বিনিয়োগকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন। তিনি বলেন, সমন্বিত সেবা প্রদান নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। এই অসংগতি ও বিকেন্দ্রীকরণের চ্যালেঞ্জকে একসঙ্গে মোকাবিলা করার আহ্বান জানান তিনি।

নীতি ও বাস্তবতায় ফারাক

শিশুর প্রারম্ভিক যত্ন ও বিকাশ (ইসিডি) কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে বিচ্ছিন্নতার কথা তুলে ধরেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ইরাম মরিয়ম। তিনি বলেন, শিশুর বয়স নিয়ে নীতিনির্ধারকদের প্রচলিত ধারণা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। পাঁচ বছরকে আদর্শ বয়স ধরে নীতি তৈরি হলেও মাঠে দেখা যায়, চার বছর বয়সী শিশুরাও স্কুলের কাছাকাছি থাকে এবং তাদেরও কার্যক্রমে যুক্ত করা সম্ভব।

ইরাম মরিয়ম বলেন, ইসিডি কার্যক্রমে অবকাঠামো নির্মাণে সব মনোযোগ দেওয়া হয়; কিন্তু শিশুদের সঙ্গে কে, কীভাবে যুক্ত হবে সে বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। চমৎকার শ্রেণিকক্ষ থাকলেই হবে না, সেখানে শিশুদের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে কাজ করার মানুষ না থাকলে কার্যক্রম কার্যকর হবে না।

কৌশলগত বিনিয়োগ

কর্মশালায় সেশন চেয়ার ছিলেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, শিশুদের প্রতি বিনিয়োগ যে নিছক সামাজিক ব্যয় নয়, এটি এখন বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। একটি দেশের সবচেয়ে কৌশলগত অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এটি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিশেষত উন্নয়নশীল বিশ্বে শৈশবকালীন পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও পারিবারিক সহায়তা দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজারের ফলাফল, বৈষম্য হ্রাস, সহনশীলতা এবং সামাজিক সংহতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, এ কারণেই সামাজিক সুরক্ষার আলোচনা বিশ্বজুড়ে নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে— শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবেই নয়, বরং সুযোগ সৃষ্টি, ঝুঁকি হ্রাস এবং মানবিক সক্ষমতা বিকাশের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে।

এ আলোচনায় আরও যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের (বেন) চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ।

Read full story at source