বাংলাদেশের ঐশ্বর্য সন্ধান ২৯: যেখানে গাছেরা এখনো শোনায় নরেন জমিদারের গল্প

· Prothom Alo

ঢাকার ব্যস্ততার আড়ালে আজও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে বলধার স্মৃতি—গাছপালার ভাঁজে লুকানো এক প্রকৃতিপাগল জমিদারের স্বপ্ন। সময়ের পরিক্রমায় ক্ষয়ে জৌলুশ ম্লান হলেও ইতিহাস আর সবুজের মায়া এখনো ডেকে যায় বলধা গার্ডেনের পথে।

Visit salonsustainability.club for more information.

বলধা গার্ডেন। ঢাকার ঐতিহ্য উদ্যান। রাজধানীতে বসবাস করছেন অথচ বলধা গার্ডেনের নাম শোনেননি, এমনটি হওয়ার কথা নয়। আমার জন্য বলধা গার্ডেন আবেগপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের মে মাসের কোনো এক শুক্রবার শুরু করেছিলাম আমার ঐতিহ্যযাত্রা। জন্ম হয়েছিল ‘কোয়েস্ট: আ হেরিটেজ জার্নি অব বাংলাদেশ’-এর বলধা গার্ডেন ভ্রমণের মাধ্যমে।

বলধা জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ

এর মধ্যে অনেকটাই শ্রীহীন হয়েছে বলধা গার্ডেন। পরিবেশ, পরিস্থিতি, উদ্ভিদ ও চারপাশ ভীষণ ম্রিয়মাণ। বলধা গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতিপ্রেমী জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী হয়তো কল্পনাতেও ভাবেননি এই রকম বিপন্ন অবস্থার কথা।

বলধা নামের উৎস সন্ধানে

বলধা জমিদার বাড়ির একাংশ

আমার সব সময়ই মনে হতো বলধা গার্ডেন নামটি কোথা থেকে এল! সেই আগ্রহ থেকেই খুঁজে পাওয়া বলধা জমিদারবাড়ি। বলধা গার্ডেনের অবস্থান কিংবা প্রতিষ্ঠাতার নাম বলধা নয়। কিন্তু গার্ডেনের নামটা ‘বলধা গার্ডেন’ হলো কেন? এরই উৎস সন্ধানে পাওয়া গেল ‘বলধা’ নামে একটি গ্রামের অস্তিত্ব। সেই বলধা গ্রামের জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী গিয়েছিলেন ঢাকার ওয়ারীতে, গড়ে তুলেছিলেন একটা ‘কালচার হাউস’। ধীরে ধীরে একে ঘিরে গড়ে ওঠে উদ্যান। বলধার জমিদার উদ্যানটি গড়েছিলেন বলেই ওটা পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বলধা গার্ডেন’ নামে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বলধা গ্রামটি কোথায়? যেখানে জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর বাড়ি? বলধা গ্রামের অবস্থান ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলায়।

গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর বাজার মোড়। সেখান থেকে তিন কিলোমিটার পর তিতারকুল। চিলাই নদের ব্রিজ পেরিয়ে আমার বাহন চলল উঁচু–নিচু, আঁকাবাঁকা পাকা পথ পেরিয়ে বলধা গাঁয়ের দিকে। খানেকটা পাহাড়ি পথের মতো। গড় এলাকা। মাঝে মাঝে ঢিবি বা টিলার মতো। আশপাশে নিচু জলাবসা, বাইদ জমিন। ঘন গাছগাছালির মধ্য দিয়ে একটা পথ তিতারকুল থেকে চলে গেছে বারিয়া বাজার। সেই পথে এক থেকে দেড় কিলোমিটার যেতেই থামতে হলো বলধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠের সামনে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করতেই জেনে গেলাম, এটাই জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর বলধা গ্রাম।

মন্দিরের বারান্দায় লেখক

স্কুলঘরের মাঠ পেরিয়ে দু–তিনটি দোকান। বেঞ্চে বসে খানেক জিরিয়ে নিলাম। দোকানের সামনে অন্য একটি বেঞ্চে বসে আছেন বয়স্ক একজন, এই গ্রামেরই। গাঁয়ে আগন্তুক দেখেই জানতে চাইলেন কোথায় এসেছি? তিনি দেখেছেন জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর জমিদারবাড়ি, বলধার জমিদারবাড়ি। দেখেছেন এর ধ্বংসটাও।
‘প্রাইমারি স্কুলের পেছনে ওই যে বড় বড় গাছের বাগানটা দেখছেন, ওখানেই ওই টেকের ওপরেই ছিল জমিদারবাড়িটা। দোতলা বাড়িটায় মোট ছত্রিশটা কক্ষ ছিল। এখন মাটি খুঁড়ে ইট বের করা যায়, দালান নেই।’ তাঁর সঙ্গে আলাপ শেষে এগোলাম জমিদারবাড়ির দিকে।

কোনো চিহ্নই কি নেই সেই জমিদারবাড়ির? একটা জীর্ণ দালান। পলেস্তারা খসে ইট বেরিয়ে পড়েছে দেয়ালের, ছাদ ভেঙে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে চুন–সুরকি, ছাদের কার্নিশে জন্মানো গাছপালার শিকড় গেড়ে বসেছে দেয়ালে। বুড়ো ইটগুলো যেন রক্তচোখে তাকিয়ে আছে। চালার টিন মরচে পড়ে ভেঙে ঝুলে পড়েছে। ঘরটার আশপাশে ভাঁটগাছের জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা বলছেন এই স্থাপত্য গুলো মন্দিরের অংশবিশেষ

জানা গেল, জমিদারগিন্নি মৃণালিনী রায়চৌধুরী বলধা গ্রামে একটি স্কুল করার জন্য কিছু জমি দান করেছিলেন। সেখানে ১৯৩৪ সালে যে স্কুলঘরটি নির্মিত হয়, সেটিই ‘৯৮ নং বলধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পুরোনো স্কুলটিকে এখন নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। আগে জয়দেবপুর থেকে এ গাঁয়ের যোগাযোগ ছিল কাঁচা রাস্তা, হেঁটে যাতায়াত করতে হতো। বছর কয়েক হলো রাস্তা পাকা হয়েছে। সাহিত্যিক প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’ বইয়ে সে জমিদারবড়ির কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ‘এলহাবাদের ওস্তাদ, নাম ভোলানাথ মহারাজ। ঢাকার সবচেয়ে রহস্যময় পুরী মাইলজোড়া দেয়ালঘেরা বলধার জমিদার বাড়ির অতিথি তিনি।... জমিদারটি গানপাগল। একই বাড়িতে দুই পত্নী নিয়ে বাস করেন, মহল আলাদা।’ এতেই বোঝা যায়, সেকালে বলধা জমিদারবাড়ির জৌলুশ ছিল কী রকম।

বলধার জমিদার প্রকৃতিসখা নরেন্দ্র নারায়ণ

জানা যায়, জমিদারি সীমানার বাইরে তিনি কেন ভূমিতে একাধিক বাড়ি করেছিলেন। ঢাকা, কলকাতা, পুরী ও লক্ষ্ণৌতে। ঢাকাসহ কোনো বাড়িই টিকে নেই।
ঢাকার ওয়ারীর বাড়িটির নাম ছিল কালচার, অনেকে বলধা হাউস বলত। বলধা গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নারায়ণ রায়ের প্রশংসার অন্ত নেই। কিন্তু তিনি ছিলেন নাটকপাগল মানুষ, একজন সুলেখক ও নাট্যকার। ঢাকার বলধা হাউসে ছিল থিয়েটার হাউস। নারায়ণ রায়চৌধুরীর প্রণীত বইয়ের সঠিক তালিকা পাওয়া যায়নি। তবে নাম পাওয়া গেছে ১৩৮টির।

ঢাকার জাতিয় জাদুঘরে বলধা মিউজিয়ামের সংগ্রহ

সবাই জানি, বলধা গার্ডেনের দুটি অংশ। একটি সিবিলি, অন্যটি সাইকি। এখন সাইকিতে প্রবেশ নিষেধ। দুটি নামই জমিদারের নিজের দেওয়া। নারায়ণ রায়চৌধুরীর জীবদ্দশায় এই উদ্যানের নাম বলধা গার্ডেন ছিল না, সম্ভবত বলধা হাউস বিলুপ্ত হওয়ার পর এই উদ্যানের নাম দেওয়া হয় বলধা গার্ডেন। ১৯২৫ সালে তিনি তাঁর বাড়ি কালচার হাউসে প্রতিষ্ঠা করেন বলধা মিউজিয়াম ও বলধা পাঠাগার।

১৯৪৩ সালে জমিদারের মৃত্যুর পর মিউজিয়াম আর লাইব্রেরি অভিভাবকহীন হয়ে যায়। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এম এইচ দানীসহ কয়েকজন অধ্যাপক ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি সভা হয়। সভায় মিউজিয়ামের নিদর্শনগুলো ঢাকা মিউজিয়ামে এবং গ্রন্থাবলি পাবলিক লাইব্রেরিতে হস্তান্তর করা হয়। ঢাকা জাদুঘরে প্রায় চার হাজার নিদর্শন রয়েছে বলধা মিউজিয়াম থেকে সংগ্রহ করা। ঢাকা জাদুঘরে বেশ কয়েকটি গ্যালারিতে বলধা সংগ্রহ রয়েছে।

ঢাকার বলধা গার্ডেনে লেখক

একসময় বলধা গার্ডেনের উদ্ভিদসংখ্যা ছিল ১৮ হাজার। উদ্যানের আয়তন প্রায় চার একর। কিন্তু সিবিলি অংশে প্রবেশ করলে তা মনে হয় না। আমার কাছে মনে হলো, ক্রমেই সরু হয়ে আসছে বলধা।

২০১৬ সালে যেসব গাছ দেখেছিলাম এর অনেকগুলোই আর পরে দেখতে পাইনি—বিশেষ করে ভুজ্জপত্র, প্যাপিরাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস ও আমাজন লিলি। সেগুলো সাইকি অংশে।

বলধা গার্ডেনে নরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীর সমাধি

যদ্দুর জানা যায়, জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর জন্ম ১৮৮০ সালে গাছার জমিদার মহিমচন্দ্রের ঘরে। তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৪, তখন নিঃসন্তান বলধার জমিদার হরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী দৈবচক্রে তাঁকে দত্তক নেন। পরে তিনিই হন বলধার জমিদার।

সেকালে কালচার হাউসে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না, সেটি ছিল দেয়ালঘেরা এক রহস্যপুরী। সেখানে বসত গানের জলসা। লোকলস্কর ও নামীদামি লোকজনের আনাগোনায় মুখর থাকত কালচার হাউস। কালচার হাউসের পাশে এলিট হাউসে একটি ঘর ছিল, যেখান থেকে সে সময়ই গোলাপ ফুল বিক্রি হতো। ১৯৪৩ সালের ১৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। বলধা গর্ডেনের সিবিলি অংশে নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর সমাধিগাত্রে তাঁর লেখা একটি ইংরেজি এপিটাফ রয়েছে, সেই এপিটাফে প্রকৃতির প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসার সাক্ষ্য পাওয়া যায়, সেখানে লেখা আছে প্রথম পঙ্‌ক্তিতে তিনি নিজের পরিচয় লিখেছেন, I am a passionate lover of nature. তবে তিনি শুধু প্রকৃতিপ্রেমীই ছিলেন না, সংগীত আর সাহিত্যেও ছিলেন সমান পারদর্শী।

বলধা জমিদার বাড়ির একটি দেয়াল

আজ আর সেই কালচার হাউস, এলিট হাউস, গোলাপবাগানের অস্তিত্ব নেই। সেসব ইতিহাস। সত্য শুধু দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ উদ্ভিদের মূল্যবান সংগ্রহশালা হিসেবে বলধা গার্ডেনের টিকে থাকা। জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর গাছপ্রেমী সতীর্থ ছিলেন অমৃতলাল আচার্য। তিনি বলধার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করলেও ১৯৮২ সাল পর্যন্ত বলধা গার্ডেনের গাছগুলোর পরিচর্যা করে গেছেন একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে। জমিদারের সমাধির পাশে তাঁর সমাধিও রয়েছে।

কবিগুরু ও বলধা গার্ডেন

‘নরেন, কালি কলম দিয়ে আমি সারাজীবন যা করেছি, তুমি গাছপালা দিয়ে তাই করে চলেছ।’—বলধা গার্ডেন দেখে এই ছিল কবিগুরুর মন্তব্য। ১৯২৬ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় সফরকালে ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে এই বাগান দেখতে এসেছিলেন কবি। ‘নরেন’ মানে গাজীপুরের বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী।

বলধা জমিদার বাড়িতে লেখক

‘দিবাকর “বাসাবাড়ি কোথাও নেই/ তাই তাঁবু পাতলেম নদীর ধারে সঙ্গী ছিল না কেউ/ কেবল ছিল সেই ক্যামেলিয়া।” কবিতার লাইনগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সঞ্চয়িতা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। যেহেতু নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর বাগানে সব ছিল বিদেশি উদ্ভিদ, সে জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানকার অনেক উদ্ভিদের বাংলা নামকরণ করেন। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ এই বলধা গার্ডেনেরই ‘জয় হাউস’-এ অবস্থান করেন এবং তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ক্যামেলিয়া’ রচনা করেন। কবিতাটি তিনি মূলত ফুলের প্রতি মুগ্ধ হয়ে রচনা করেছিলেন। এমন নানা বিচিত্র বৃক্ষরাজির সমাহার করেছিলেন নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরী।

ছবি: লেখক

Read full story at source