১০০ মাইল গতিতে ভবনে ধাক্কা! দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

· Prothom Alo

২০২২ সালের ৩১ জুলাই। ভোরবেলা। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের শান্ত শহর স্ট্রংসভিল তখনো ঘুমিয়ে। একটি হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টি শেষে ১৭ বছর বয়সী ম্যাকেঞ্জি শিরিলা গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রেমিক ডমিনিক রুসো ও বন্ধু ডেভিয়ন ফ্লানাগান। কয়েক মিনিট পরই ঘটে এমন এক ঘটনা, যা শুধু তিনটি পরিবার নয়, পুরো একটি সম্প্রদায়ের জীবন বদলে দেয়।

সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও তার পেছনের অন্ধকার বাস্তবতা নিয়েই নির্মিত হয়েছে নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘দ্য ক্র্যাশ’। গ্যারেথ জনসনের এই প্রামাণ্যচিত্র মুক্তির পর আবারও আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত সেই মামলা।

Visit newsbetsport.bond for more information.

ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। স্ট্রংসভিলের একটি নিরিবিলি আবাসিক সড়কে হঠাৎ গতিবেগ বাড়াতে শুরু করে ম্যাকেঞ্জির টয়োটা ক্যামরি। তদন্তে পরে জানা যায়, গাড়িটি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মাইল বেগে ছুটছিল। এরপর মুহূর্তেই সেটি গিয়ে সজোরে ধাক্কা খায় একটি ইটের ভবনে।

তদন্তে পরে জানা যায়, গাড়িটি ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মাইল বেগে ছুটছিল। নেটফ্লিক্স

ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা দেখেন, গাড়িটি প্রায় ধাতব স্তূপে পরিণত হয়েছে। তিনজনই অচেতন। ডমিনিক রুসো ও ডেভিয়ন ফ্লানাগান ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় ম্যাকেঞ্জিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল।

কিন্তু দুর্ঘটনার পর তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই তৈরি হতে থাকে নতুন প্রশ্ন। এটি কি নিছক দুর্ঘটনা ছিল? নাকি এর পেছনে ছিল ইচ্ছাকৃত কিছু?

২০২২ সালের ৩০ জুলাই রাতে তিনজনই একটি গ্র্যাজুয়েশন পার্টিতে ছিলেন। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁরা গাড়িতে ওঠেন। ডমিনিক সামনে, ডেভিয়ন পেছনের সিটে।তদন্তকারীদের মতে, ম্যাকেঞ্জি খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালিয়ে একটি মোড় নেন। এরপর হঠাৎ গতি বাড়াতে শুরু করেন। গাড়ির ‘ব্ল্যাক বক্স’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাক্সেলেটর পুরোপুরি চাপা ছিল। ব্রেক ঠিকঠাক কাজ করছিল। স্টিয়ারিংও সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

প্রেম, টিকটক আর কৈশোর জীবনের মুখোশ
‘দ্য ক্র্যাশ’ তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে ম্যাকেঞ্জি শিরিলা ও ডমিনিক রুসোর চার বছরের সম্পর্কের গল্প। স্ট্রংসভিল হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তাঁদের সম্পর্ক। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ভবিষ্যতে বিয়ের পরিকল্পনাও করেছিলেন।

‘দ্য ক্র্যাশ’–এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

বন্ধুরা বলছেন, দুজন প্রায় সব সময় একসঙ্গেই থাকতেন—কখনো রান্না, কখনো শপিং, কখনো বাইরে ঘুরে বেড়ানো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ম্যাকেঞ্জির ভালো অনুসারীসংখ্যা ছিল। পোশাক ব্র্যান্ডের প্রচারণা করতেন তিনি। তবে ডমিনিকের কয়েকজন বন্ধু তাঁকে ‘মিন গার্ল’ ধরনের আচরণকারী হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।
এই বন্ধুদের দলে ছিলেন ডেভিয়ন ফ্লানাগানও। প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড় ডেভিয়নের স্বপ্ন ছিল কলেজ ফুটবল ও এনএফএলে খেলার। কিন্তু হাঁটুর গুরুতর চোটে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং ম্যাকেঞ্জি-ডমিনিকের বন্ধুমহলের অংশ হয়ে ওঠেন।

তথ্যচিত্রের শুরুতে সবকিছুই যেন সাধারণ মার্কিন কিশোর জীবনের গল্প। কিন্তু তদন্ত যত সামনে এগোয়, গল্পের রং বদলাতে থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে। ডমিনিক তাঁর মাকে ফোন করে বলেন, তিনি ম্যাকেঞ্জির গাড়িতে আছেন এবং ভয় পাচ্ছেন। তিনি বন্ধুকে এসে তাঁকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। ফোনের ওপাশে সেই বন্ধু নাকি শুনেছিলেন, ম্যাকেঞ্জি চিৎকার করে বলছেন, ‘আমি এই গাড়ি ক্র্যাশ করব।’ এই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে আদালতে বড় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সেই রাতের শেষ কয়েক মিনিট
২০২২ সালের ৩০ জুলাই রাতে তিনজনই একটি গ্র্যাজুয়েশন পার্টিতে ছিলেন। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁরা গাড়িতে ওঠেন। ডমিনিক সামনে, ডেভিয়ন পেছনের সিটে।
তদন্তকারীদের মতে, ম্যাকেঞ্জি খুব নিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালিয়ে একটি মোড় নেন। এরপর হঠাৎ গতি বাড়াতে শুরু করেন। গাড়ির ‘ব্ল্যাক বক্স’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাক্সেলেটর পুরোপুরি চাপা ছিল। ব্রেক ঠিকঠাক কাজ করছিল। স্টিয়ারিংও সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তদন্তে ম্যাকেঞ্জির শরীরে অ্যালকোহল, গাঁজা বা অন্য কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রসিকিউটর টিম ট্রুপ দাবি করেন, এটি কোনো দুর্ঘটনা ছিল না; বরং পরিকল্পিত কাজ।

ব্রিজের নিচে পড়ে ছিল রিনার মৃতদেহ, তোলপাড় করা সেই ঘটনা পর্দায়

সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভয়ংকর অভিযোগ
তদন্তে উঠে আসে ম্যাকেঞ্জি ও ডমিনিকের সম্পর্কের অস্থিরতার কথা। ডমিনিকের মা ক্রিস্টিন রুসো জানান, দুর্ঘটনার কয়েক মাস আগে থেকেই তাঁদের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি ম্যাকেঞ্জি নাকি শারীরিকভাবেও ডমিনিককে আঘাত করেছিলেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে। ডমিনিক তাঁর মাকে ফোন করে বলেন, তিনি ম্যাকেঞ্জির গাড়িতে আছেন এবং ভয় পাচ্ছেন। তিনি বন্ধুকে এসে তাঁকে নিয়ে যেতে বলেছিলেন। ফোনের ওপাশে সেই বন্ধু নাকি শুনেছিলেন, ম্যাকেঞ্জি চিৎকার করে বলছেন, ‘আমি এই গাড়ি ক্র্যাশ করব।’
এই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে আদালতে বড় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২০২৩ সালে বিচারক ম্যাকেঞ্জি শিরিলাকে একাধিক হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালতের ভাষায়, তাঁর কাজ ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত, পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক।’রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ‘এটি বেপরোয়া ড্রাইভিং নয়। এটি খুন।’ তখন ১৮ বছরে পা দিতে যাওয়া ম্যাকেঞ্জিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ১৫ বছর পর প্যারোলের সুযোগ থাকবে।

সামাজিক মাধ্যম, শোক আর বিতর্ক
মামলার আরেকটি বিতর্কিত দিক ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাকেঞ্জির আচরণ। প্রসিকিউশনের দাবি, দুর্ঘটনার পরও তিনি খুব বেশি অনুতপ্ত ছিলেন না। এমনকি বন্ধুদের শেষকৃত্যের সময়ের আশপাশে তিনি একটি পোশাক ব্র্যান্ডের চুক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন।

এই বিষয়গুলো আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তবে ম্যাকেঞ্জির পরিবার দাবি করে, অনেক তথ্য অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁদের মতে, ঘটনাটি ছিল দুর্ঘটনা। ম্যাকেঞ্জির আইনজীবীরা বলেন, তিনি ‘পটস’ নামের একধরনের রক্তচাপজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, যা সাময়িক অজ্ঞানতা তৈরি করতে পারে।

কিন্তু আদালত সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি।

‘দ্য ক্র্যাশ’–এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

আদালতের রায়: ‘এটি বেপরোয়া ড্রাইভিং নয়, খুন’
২০২৩ সালে বিচারক ম্যাকেঞ্জি শিরিলাকে একাধিক হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালতের ভাষায়, তাঁর কাজ ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত, পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলক।’
রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেন, ‘এটি বেপরোয়া ড্রাইভিং নয়। এটি খুন।’ তখন ১৮ বছরে পা দিতে যাওয়া ম্যাকেঞ্জিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ১৫ বছর পর প্যারোলের সুযোগ থাকবে।

রায়ের পর ম্যাকেঞ্জি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডম ও ডেভিয়নের পরিবারের কাছে আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি কখনো ইচ্ছা করে এটা ঘটতে দিতাম না। আমি চাই, যদি আমি মনে করতে পারতাম কী হয়েছিল।’

নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্রে প্রথমবার মুখ খুললেন ম্যাকেঞ্জি
‘দ্য ক্র্যাশ’-এ প্রথমবার ক্যামেরার সামনে কথা বলেছেন ম্যাকেঞ্জি শিরিলা। তবে তিনি নতুন কোনো তথ্য দেননি। বরং আগের মতোই দাবি করেন, সেই রাতের কিছুই তাঁর মনে নেই।

নির্মাতা গ্যারেথ জনসন বলেন, ‘আমরা কঠিন প্রশ্ন করেছি। কিন্তু সেই রাতের শেষ মুহূর্ত নিয়ে এখনো একটা অন্ধকার শূন্যতা রয়ে গেছে। আসলে কী হয়েছিল, আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না।’

নির্মাতার নিজের জীবনের সঙ্গে মিল
এই গল্প নির্মাতা গ্যারেথ জনসনের কাছে ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কৈশোরে তিনিও এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, যেখানে একজন মারা গিয়েছিলেন এবং তিনি গুরুতর আহত হন।

হাসপাতালে শুয়ে তিনি দেখেছিলেন, একটি দুর্ঘটনা কীভাবে অসংখ্য মানুষের জীবনে ঢেউ তোলে—পরিবার, বন্ধু, পুরো সমাজে। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে ‘দ্য ক্র্যাশ’ নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছে।

ডিজিটাল যুগের এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি
তথ্যচিত্রটি শুধু একটি মামলার গল্প নয়। এটি আধুনিক কিশোর জীবনের চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, সম্পর্কের বিষাক্ততা ও অনলাইন ইমেজের অন্ধকার দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

নির্মাতাদের মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে—সোশ্যাল মিডিয়ায় তৈরি ব্যক্তিত্ব আর বাস্তব জীবনের মানুষ অনেক সময় এক নয়। আর সেই ফারাক কখন ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা কেউ বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে।
স্ট্রংসভিলের মানুষ এখনো সেই রাত ভুলতে পারেননি। ডমিনিক ও ডেভিয়নের পরিবার আজও উত্তর খুঁজে ফিরছে। আর ম্যাকেঞ্জি শিরিলার গল্প যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

টাইম অবলম্বনে

Read full story at source