রফিকুন নবীর বিশেষ লেখা: ডিমোশন

· Prothom Alo

যে দুর্ঘটনার কথা লিখছি, তা ‘ডিমোশনের’—ইমোশন থেকে একজনের বদলে যাওয়ার ঘটনা।

সালেহ সাহেবের কথা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আর কোনো দিন গরু কিনতে হাটমুখী হবেন না। অর্থাৎ হাট বর্জন। ৭০ বছর বয়সে অন্তত ৫০ বার পশুর হাটে গেছেন ঈদ উপলক্ষে। কিন্তু আর নয়। ওই রুটিন থেকে বিদায় নিচ্ছেন। একধরনের নৈরাশ্য থেকে এই প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন। সেটিও এই মুহূর্তের ডিসিশন নয়। সেই প্রতিজ্ঞার বয়স বছরখানেক আগের। গত কোরবানির ঈদে নেওয়া।

Visit grenadier.co.za for more information.

তাঁর ভাষ্যমতে, প্রতিজ্ঞার ঘটনাটির কারণ আহত হওয়া। গত ঈদ উপলক্ষে গরু কিনতে হাটে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। সালেহ সাহেব আহত হওয়ার কথাটিতেই জোর দেন বেশি। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল না। রক্তাক্ত হওয়ার মতোও কোনো কিছু চোখে পড়েনি। তবে কী কারণে সেই আহতের ঘটনাটি ঘটেছিল বা কেমন সেই ঘটনা, তা জানার পর আমার ধারণা হয়েছিল যে আহত শব্দটির প্রয়োগে গোলমাল রয়েছে। যে ঘটনার কথা জেনেছিলাম, তাতে শব্দটি হওয়া উচিত মর্মাহত। কিন্তু তিনি নিজের কথায় অটল। আহত কথাটাই ব্যবহারের পক্ষপাতী।

তাঁকে ভুলটি শুধরে নেওয়ার চেষ্টায় বলেছিলামও সে কথা। তা শুনে তিনি একটি ব্যাখ্যা উপস্থিত করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘মর্মাহত মানে হইল মন ভাইঙ্গা গিয়া মরমে আহত হওয়া। হাটে গিয়া আমার সেই আহত হওনের ঘটনা ঘটছিল। আসলে আহত হওয়াটাই বড় কথা। সেইটা মনে না শরীরের বহিরাঙ্গের আনাচে–কানাচে, চিপাচাপায়, সেইটা আসল না। আহত হওন মানেই আহত। মোট কথা আমি আর হাটে যাইতাছি না। চিরকালের তরে বিদায় নিছি। হাট আর আগের হাট নাই। আমিও আর আগের মতো থাকতাছি না।’

সালেহ সাহেবের কথা। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আর কোনো দিন গরু কিনতে হাটমুখী হবেন না। অর্থাৎ হাট বর্জন। ৭০ বছর বয়সে অন্তত ৫০ বার পশুর হাটে গেছেন ঈদ উপলক্ষে। কিন্তু আর নয়। ওই রুটিন থেকে বিদায় নিচ্ছেন।
রফিকুন নবী

আহত বা মর্মাহত যেটাই বলা হোক, কোনো কারণে যে তিনি খুবই শক্‌ড, সেটা বুঝেছি। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তে তাঁকে অনুরোধ করতে যাওয়া আমরা শক্‌ড হয়েছি বেশি। প্রতি ঈদে এমন উত্সাহ-উদ্দীপনায় হাটে যেতেন যে মানুষটি, তাঁর হঠাৎ এই প্রতিজ্ঞাপ্রসূত অনীহায় আমাদেরও মর্মাহত অবস্থা।

তিনি প্রতি ঈদে ফজরের নামাজ শেষে একমাত্র পুত্রকে নিয়ে হুলুস্থুল করে হাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন। হাটে পৌঁছে পুরো হাট ঘুরে গরুগুলোকে দেখতেন। গরুর দাঁত গজিয়েছে কি না, কী খাওয়ানো হয়েছে, কোন জায়গার গরু, ভারতীয় নাকি ভৈরব-আশুগঞ্জের, আনার আগে ভেটেরিনারি ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে কি না, কত ওজন হবে ইত্যাদি বিক্রেতাদের জিজ্ঞেস করা শেষে ছোটমোট হোক বা মাঝারি সাইজের কোনো গরু কিনে বাড়ি ফিরতেন; এবং যখন যে রকম সাধ্য, তেমনটায় যেতেন। বলতেন, ‘পকেটের ওপর নির্ভর কইরা হাটে যাই। খুঁইজা-পাইতা তেমন একটা পাই যদি, তো ওইটাতেই ঝুইলা থাকি। কাছছাড়া হই না। অন্যগো দামাদামি দেখি। তারপর নিজে রফা কইরা কিনি।’

তো, হাটে না যাওয়ার নিজের প্রতিজ্ঞার পক্ষ অবলম্বন করে বলেছিলেন, ‘পশুর হাটের চেহারা পাল্টাইয়া গেছে। অহন ফোলা ফালা মোটকা ধরনের গরুর আমদানি বেশি। ওইগুলারে স্বাস্থ্যবান বইলা চালানিটা অহন দস্তুর হইয়া গেছে। একই লগে মোটা পকেটধারী ক্রেতাতে ভর্তি। তারা হাটে ঢুইকাই সব গরুর গতর টিপ্পা দেখে। এইসব গরু টিপনের মানুষগুলারও চেহারা ইয়া দশাসই। তাগো পাইয়া গরু, গরুর মালিকও খুশি হয়।’

বলতেন, ‘পকেটের ওপর নির্ভর কইরা হাটে যাই। খুঁইজা-পাইতা তেমন একটা পাই যদি, তো ওইটাতেই ঝুইলা থাকি। কাছছাড়া হই না। অন্যগো দামাদামি দেখি। তারপর নিজে রফা কইরা কিনি।’

এসব কথা বলে কৌটা থেকে পান বের করে মুখে পুরে পরবর্তী কথায় যান। বলেন, ‘আগে কী সুন্দর হাট ছিল। সব ধরনের মানুষগো উপযোগী গরু রাখত। কম পয়সাওয়ালাগো লাইগা ছোট গরু, তা না হইলে রোগা হাড়-জিরজিরা ঢ্যাঙা-ঢ্যাঙা পাওয়ালা হাইলা বলদও রাখা হইত। এ ছাড়া বড় শিংওয়ালা মুলতানি গরুও থাকত কয়েকটা কইরা। মাঝে মাঝে আরবি পশুও দেখা যাইত। মানে উট, দুম্বা, পাহাড়ি ছাগল—এই সব। সেগুলোর দিকে তাকাইবার মানুষও ছিল ভিন্ন চেহারার। যাই হোক, যে যার থলে অনুযায়ী, সাধ্য মোতাবেক হাত বাড়াইত, মনের আনন্দে কিনত। বড়-ছোটর ধার ধারত না। আসলে ভাবা হইত কোরবানি দেওনটাই বড় কথা। একটা হইলেই হয়। এই রকম আছিল কোরবানির ব্যাপার। অহন দিনকাল বদলাইয়া গেছে।’

একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, ‘আসলে অহন খরচের কম্পিটিশানে পইড়া গেছে দিনকাল। কম্পিটিশানে কেনাকাটায় যে পছন্দের জিনিসটা কিনতে পারে, সে সাফল্যের হাসি মারে। যে তেমনটা পারে না, তার ভাগ্যে যেমন–তেমনটা জোটে। এই রকমের কম্পিটিশানে আমাগো মতনরা হারু পাট্টি হিসাবে গণ্য হয়। অহন আবার অন্য রকম বাজারও হইছে। সেইটা অনলাইনে কিননের। তয় আমার মনে হয় হাটে কিননের মজাই আলাদা। সেইটা থাইকা দূরে সইরা যাইতাছে সবকিছু।’

লক্ষ করছিলাম যে বিক্রেতা লোকটির চাহিদার ভাবনাটা একটু নড়বড়ে হইয়া উঠতাছে। মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলতাছিল যে আমার কওয়া দামটা আর একটু বাড়াইতে।

সালেহ সাহেব একনাগাড়ে এসব কথা শেষ করলেন। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে যে গত বছর এমন কী ঘটেছিল তাঁর সাথে যে হাঁটে আর যাবেন না—এমন প্রতিজ্ঞা নিলেন। জিজ্ঞেস করতে যাব এমন সময় দেখলাম যে তিনি বিড়বিড় করে স্বগতোক্তিমতো কী সব আওড়াচ্ছেন। আমি তা দেখে ঠাওর করার চেষ্টা করলাম। আধো আধো আবিষ্কার করলাম যে তিনি কাউকে নিয়ে বাপান্ত করছেন। ‘জোর দেখাইলা? এমন দিনকাল থাকব না। একদিন না একদিন সময় বদলাইব। ব্যাটারা গরু কোরবানি দিবা না কি টাকাপয়সা, তেমন দিন আসলে বুঝবা।’

আমি এইবার ধৈর্যহারা হলাম। সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাকে উত্তেজিত হতে দেখছি। কী ঘটনা, একটু খুলে বলবেন?’

উনি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, ‘আরে রমিজ সাহেব, কী কমু, যত ঈদ কাছাইয়া আসতাছে, ততই গতবারের কথা মনে পড়তাছে। তাতে রাগও বাড়তাছে। ঘটনাটা কী হইছিল শোনেন।’

‘গত বছর ঈদের দুই দিন আগে হাটে গেছিলাম নিয়মমাফিক গরু কিনতে। ছোটখাটো হাট বসছিল পাড়ার কাছেই। প্রতিবছরই ঈদ উপলক্ষে সেই হাটের ব্যবস্থা করে লোকাল নেতারা। তো হাটে পাঁচমিশালি গরু আছিল। মধ্যবিত্তের পছন্দসই হইতে পারে এমন সব গরু।

‘আমি যথারীতি পুরো হাট ঘুইরা ঘুইরা গরু দেখতাছিলাম। সে সময় চোখে পড়ছিল যে একজন নাদুসনুদুস লোক হাঁইটা হাঁইটা গরু দেখতাছিল, আর ওইগুলারে টিপা টিপা যাইতাছিল। কোনো দামটাম জিগাইতাছিল না। পরনে সাদা শার্ট, সাদা প্যান্ট, চোখে কালো সানগ্লাস। পায়েও পয়েন্টেড সাদা জুতা। বয়স ষাইটের কাছাকাছি হইব। মাথায় চুল কম।

‘আমি ততক্ষণে আমার পছন্দের গরুর দাম ঠিক করতাছি। এমন সময় কাছে আইসা দাঁড়াইল। বিক্রেতা যে দাম চাইছিল, আমি তা নিয়া দর–কষাকষি করতাছিলাম। বলতাছিলাম যে দেখো ভাই, হাট থাইকা লইয়া যাওনের লাইগ্যা লোক ঠিক করন লাগব, তাতে খরচ আছে। আবার কসাইগো হিসাব থাকব হাজারের গুনতিতে। তার ওপর দুই দিন গরুটার দেখাশোনা করার লোক ভাড়া করতে হইব। অতএব ওই খরচগুলা কনসিডার কইরা দামটা যদি একটু নামাইতে পারে। লক্ষ করছিলাম যে বিক্রেতা লোকটির চাহিদার ভাবনাটা একটু নড়বড়ে হইয়া উঠতাছে। মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলতাছিল যে আমার কওয়া দামটা আর একটু বাড়াইতে।

‘বিক্রেতা লোকটি তখন কইছিল, উনাগো মতন গাহকই লক্ষ্মী; তাগো অপেক্ষাই তো করি আমরা। এই কথা বইলা পরামর্শ দিছিল যে ওই ধরনের পয়সাওয়ালাগো রকম-সকম হইলে আপনিও গরুর হাটে একবারে গরু কিনতে পারবেন।’

‘আমি তারে পটাইতে ছিলাম, সে–ও আমারে। এখন দুজনই মাঝপথে আছি অবস্থা। ঠিক সেই সময় সেই সাদা পোশাকধারী, গরুর গাও টিপনে এক্সপার্ট লোকটি আইসা আমার পছন্দের গরুর গায়ে হাত দিল টিপনের লাইগা। আর দামটা কান পাইতা শুনল। তারপর যা করল, সেইটাতে আমি তো অবাক। টাসকি লাইগা গেল। লোকটা আঁত্কা বিক্রেতার চাওয়া দামের লগে আরও হাজার টাকা ধরাইয়া দিয়া গরুটা কিইনা ফালাইল।

‘আমি বিক্রেতারে কইছিলাম, এইটা কী করলা। আমারে না দিয়া ওই লোকটারে দিয়া দিলা? এইটা মাইনষের কাম করলা? আমার চোখের সামনে দিয়া শিস বাজাইতে বাজাইতে গরুটা লইয়া গেল গা!

‘বিক্রেতা লোকটি তখন কইছিল, উনাগো মতন গাহকই লক্ষ্মী; তাগো অপেক্ষাই তো করি আমরা। এই কথা বইলা পরামর্শ দিছিল যে ওই ধরনের পয়সাওয়ালাগো রকম-সকম হইলে আপনিও গরুর হাটে একবারে গরু কিনতে পারবেন।’

তো সালেহ সাহেব সে কথা শুনে ঠিক করলেন যে আর হাটমুখো হবেন না। বাড়ির রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাসিতেই থাকবেন। হাটের গরু হাটেই থাকুক।

সবটা দেখেশুনে আমার মনে হলো, এটা ডিমোশনের কেস। গরু থেকে ছাগলে নামার কেস।

Read full story at source