ঈদের ছুটিতেও ঢাকার রাস্তায় সচল এআই ক্যামেরা, বেপরোয়া চললে গুনতে হবে জরিমানা

· Prothom Alo

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হতে শুরু করেছে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো। বছরের এই সময়গুলোতে ফাঁকা সড়ক পেয়ে অনেকেই বেশি গতিতে গাড়ি চালান। তবে এবার সেখানে সাবধান হতে হবে। না হলে গুনতে হবে বড় অঙ্কের জরিমানা। সেই সঙ্গে চালকের লাইসেন্সে যোগ হবে ‘ডিমেরিট’ পয়েন্ট। কারণ, ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে বসানো এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা এই ছুটিতেও সচল থাকছে। বাড়তি হিসেবে এত দিন যেসব অপরাধকে ছাড় দেওয়া হচ্ছিল, এখন সেগুলোকেও আমলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে হেলমেট পরা থেকে শুরু করে নিয়ম মেনে রাস্তায় চলতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ শুরুতে ঢাকার ৩০টি মোড়ে এআই ক্যামেরা স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে আরও ক্যামেরা বসানো হয়। সব মিলিয়ে এখন ২০০টি ক্যামেরা থেকে ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করে এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ট্রাফিক আইনে থাকা নিয়মের ব্যত্যয় হলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া, স্টপ লাইন না মানা বাঁ লেন বন্ধ করে রাখা, হুটহাট লেন পরিবর্তন করা এবং অবৈধ পার্কিংকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

Visit xsportfeed.quest for more information.

ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে ট্রাফিক বিভাগ। এআইভিত্তিক ক্যামেরায় সড়ক পরিবহন আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার সফটওয়্যার সংযোজন করা হয়েছে। সফটওয়্যারের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে সেই গাড়ি শনাক্ত করছে ক্যামেরা। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে মামলা দেওয়া হচ্ছে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি শুরু হয়েছে। সোমবার ছুটির প্রথম দিনে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা ফাঁকা ছিল। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও শাহবাগ এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

এসব সড়কে যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও এআই ক্যামেরার ভয়ে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে দেখা গেছে। লাল রঙের ট্রাফিক বাতি জ্বলে উঠলেই গাড়ি থেমে যেতে দেখা যায়।

রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে চালকেরা এখন জেব্রাক্রসিংয়ের আগেই থামছেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা এলাকায়

‘পিটিজেড’ ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রণ

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা গাড়ির নম্বর শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক ‘পিটিজেড ক্যামেরা’ ব্যবহার করছে পুলিশ। এটি ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ প্রযুক্তির উন্নত নিরাপত্তা ক্যামেরা। জনসমাগমে পর্যবেক্ষণের জন্য এ ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এটি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ঘুরে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে পারে। চলন্ত বস্তু বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে।

এ ক্যামেরা সহজেই কম্পিউটার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ‘অপটিক্যাল জুমের’ মাধ্যমে অনেক দূর থেকে স্পষ্ট ছবি বা গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একেকটি ক্যামেরার দাম ৬০ হাজার টাকার বেশি।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে সফটওয়্যারে ছয় ধরনের আইন অমান্যের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে আরও কিছু নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী এসব আইন অমান্য করা যানবাহন শনাক্ত করে নম্বরপ্লেটসহ ছবি তুলে রাখছে এ ক্যামেরা। সেসব ছবি-ভিডিও ডিএমপি সদর দপ্তরের ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে জমা হচ্ছে। সফটওয়্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে। ফলে সহজেই আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের নম্বর দিয়েই মালিকের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সার্ভারে জমা হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মালিকের নামে মামলা দেওয়া হচ্ছে।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, আইন ভাঙলেই চালকের লাইসেন্সে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ যুক্ত হবে। ড্রাইভিং লাইসেন্সে ১২টি পয়েন্ট থাকে। পয়েন্ট কাটতে কাটতে একপর্যায়ে চালকের লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে।

রাজধানীর সড়কে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে পর্যায়ক্রমে সব সিগন্যাল বাতির খুঁটিতে এ ধরনের ক্যামেরা বসানো হবে বলে ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে। এর ফলে ঢাকাজুড়ে ৫০০ ক্যামেরায় সড়কে যান চলাচলের ওপর নজরদারি করা হবে।

রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে চালকেরা এখন জেব্রাক্রসিংয়ের আগেই থামছেন। রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকায়

ফুটপাতে উঠলেও মামলা

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ শনাক্তে ক্যামেরার সফটওয়্যারে নতুন করে আরও কিছু নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। এত দিন যেসব অপরাধে মামলা দেওয়া হচ্ছিল, সেগুলোর সঙ্গে এখন হেলমেট না পরা, যত্রতত্র যাত্রী উঠানো এবং ফুটপাতের ওপর গাড়ি চালানোর মতো অপরাধকে গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে।

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন হলেই ক্যামেরা সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করে ডিএমপির সার্ভারে পাঠায়। ক্যামেরার চিত্র বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আইন লঙ্ঘনের মাত্রা অনুযায়ী মামলা দেন। এআই ক্যামেরার ব্যবহার শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৬৫০ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলার তথ্য ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে।

ডিএমপি ট্রাফিকের এআই প্রযুক্তির বিষয়টি দেখভাল করছেন জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ। গতকাল সোমবার দুপুরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঈদের ছুটিতেও এআই ক্যামেরা সচল থাকছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য মামলা দেওয়া হচ্ছে। আগে কিছু অপরাধে ছাড় দেওয়া হলেও এখন সেগুলো কঠোরভাবে দেখা হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে ক্যামেরার পাশাপাশি ট্রাফিক সদস্যরাও সড়কে থাকবেন।

রাজধানীর কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। রাজধানীর ফার্মগেট মোড় এলাকায়

জরিমানার তথ্য জানিয়ে আসছে ভুয়া বার্তাও

এআই ক্যামেরায় মামলা শুরুর পর নতুন এক প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। এআই ক্যামেরায় মামলা হয়েছে উল্লেখ করে জরিমানা পরিশোধ করতে মোবাইলে ভুয়া খুদে বার্তা পাঠাচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন এ ধরনের ভুয়া বার্তা পেয়েছেন।

‘জরিমানা পরিশোধ–সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি’ শিরোনামে ওই ভুয়া বার্তায় জরিমানা নম্বর, তারিখ, অপরাধের ধরন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জরিমানা পরিশোধের সময়সীমা জানিয়ে একটি লিংকও পাঠানো হচ্ছে। লিংকে প্রবেশ করলে জরিমানার পরিমাণ দেখা যাচ্ছে।

তবে এমন কোনো বার্তা ডিএমপির পক্ষ থেকে পাঠানো হচ্ছে না জানিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা। সোমবার এ–সংক্রান্ত একটি সতর্কবার্তাও জারি করেছে তারা।

প্রতীকী ছবি

পুলিশের ওই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ইদানীং ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে জরিমানা করা হয়েছে নগরবাসী এমন খুদে বার্তা (এসএমএস) পাচ্ছেন। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে এই খুদে বার্তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অসত্য।

সতর্কবার্তায় ডিএমপি আরও বলছে, ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহনে মামলা দেওয়া হলে মালিক বা চালকের ঠিকানায় শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা একটি পত্র পাঠানো হচ্ছে। আর শুধু ০১৩২০-০৪২২০৭ ও ০১৩২০-০৪২২২৭ মোবাইল নম্বর থেকে খুদেবার্তা পাঠানো হবে। তবে এখনো মোবাইলের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো শুরুই হয়নি। মামলাসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে উল্লিখিত দুটি নম্বরের পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’–এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এই বার্তার মাধ্যমে ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হতে পারে। প্রতারক চক্রের পাঠানো লিংকে প্রবেশ না করতে সবাইকে অনুরোধ করেছেন তাঁরা।

Read full story at source