ঢাকায় জন্ম, বলিউড মাতানো ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’ গায়িকার মৃত্যু

· Prothom Alo

ঢাকায় জন্ম, উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কণ্ঠের মায়া । ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে প্যায়ার তুমহি সে’, ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’ কিংবা বাংলা গানের শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে থাকা ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গান দিয়ে কয়েক দশক ধরে মুগ্ধ করে রেখেছিলেন সুমন কল্যাণপুর। মিষ্টি, কোমল আর হৃদয়ছোঁয়া সেই কণ্ঠ থেমে গেল চিরতরে। রোববার মুম্বাইয়ের লোখান্ডওয়ালার নিজ বাসভবনে মারা গেছেন বরেণ্য এই শিল্পী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর, দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন সুমন কল্যাণপুর। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও লেখক মঙ্গলা খাদিকর জানিয়েছেন, রোববার রাত আটটার দিকে শান্তিপূর্ণভাবেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শেষ জীবনে নিজের গান শুনেই সময় কাটাতেন এই শিল্পী।

Visit bettingx.bond for more information.

সুমন কল্যাণপুরের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি, অবিভক্ত বাংলার ঢাকায়। তাঁর আসল পদবি ছিল হেমাডি। বাবা শঙ্কর রাও হেমাডি ব্যাংকের চাকরির সূত্রে দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন। ১৯৪৩ সালে পরিবার নিয়ে তৎকালীন বোম্বেতে চলে যান তিনি। সেখানেই বেড়ে ওঠেন সুমন। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
ছোটবেলায় গায়িকা হওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না তাঁর। ছবি আঁকা, সেলাই করা আর বাগানের যত্ন নেওয়াতেই বেশি আগ্রহ ছিল। পরবর্তী জীবনেও আঁকার শখ অটুট ছিল বলে স্যার জে জে স্কুল অব আর্টসে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তবে কৈশোরে নূরজাহানের গান শুনে সংগীতের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। স্কুল ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাইতেন নিয়মিত। এমনই এক অনুষ্ঠানে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হন খ্যাতিমান মারাঠি সংগীত পরিচালক কেশবরাও ভোলে। তিনিই সুমনের মা–বাবাকে মেয়ের প্রতিভা নষ্ট না করার পরামর্শ দেন এবং নিজেই তাঁকে তালিম দেওয়া শুরু করেন।

সুমন কল্যাণপুরের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি

কেশবরাও বুঝেছিলেন, সুমনের কণ্ঠ লাইট মিউজিকের জন্য আদর্শ। তাঁর পরামর্শেই সেই ধারায় মনোযোগ দেন সুমন। ১৯৫২ সালে প্রথম আকাশবাণীতে গান গেয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৫৩ সালে মারাঠি চলচ্চিত্র ‘শুকরচি চাঁদনি’তে গান করেন । ১৯৫৪ সালে ‘মঙ্গু’ ছবির মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর হিন্দি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক যাত্রা।

পাঁচ ও ছয়ের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় বলিউডে একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন সুমন কল্যাণপুর। ‘বাত এক রাত কি’, ‘দিল এক মন্দির’, ‘দিল হি তো হ্যায়’, ‘জাহান আরা’, ‘পাকিজা’সহ অসংখ্য ছবিতে তাঁর কণ্ঠ দর্শক-শ্রোতাকে মুগ্ধ করেছে। শঙ্কর-জয়কিষণ, মদন মোহন, শচীন দেববর্মন, নৌশাদ, রোশন, ওপি নায়ার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠস্বরের বিস্ময়কর মিল নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল সংগীতজগতে

মুহম্মদ রফির সঙ্গে সুমনের জুটি ছিল বিশেষ জনপ্রিয়। দুজন প্রায় ১৪০টি ডুয়েট গান গেয়েছেন। ‘আজকাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চর্চে’ কিংবা ‘না না করতে প্যায়ার’ আজও শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। মান্না দে ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও একাধিক স্মরণীয় গান রয়েছে তাঁর।
শুধু হিন্দি নয়, বাংলা গানেও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন সুমন কল্যাণপুর। ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’ ও ‘আমার স্বপ্ন দেখার দুটি নয়ন’—এমন গান বাংলা সংগীতপ্রেমীদের কাছে আজও অমলিন। সংগীতবোদ্ধাদের অনেকে মনে করেন, তাঁর কণ্ঠে একধরনের বিষণ্ন আবেগ ছিল, যা শ্রোতার হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যেত।

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠস্বরের বিস্ময়কর মিল নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল সংগীতজগতে। অনেক সময় তাঁর গান ভুল করে লতা মঙ্গেশকরের গান বলে মনে করতেন শ্রোতারা, এমনকি সংগীত পরিচালকেরাও। তবে সুমন বরাবরই বলেছেন, তিনি কখনোই লতাকে অনুকরণ করেননি। লতা তাঁর প্রিয় শিল্পী ছিলেন, কিন্তু দুই শিল্পীর কণ্ঠের মিল ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।

২০২৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত হন সুমন কল্যাণপুর

১৯৫৮ সালে মুম্বাইয়ের ব্যবসায়ী রামানন্দ কল্যাণপুরকে বিয়ে করেন সুমন। এর পর থেকেই ‘হেমাডি’ ছেড়ে ‘কল্যাণপুর’ পদবি ব্যবহার শুরু করেন। রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হলেও সংগীতজীবন থেমে যায়নি। রেকর্ডিংয়েও প্রায়ই তাঁর সঙ্গে যেতেন স্বামী। তাঁদের একমাত্র মেয়ে চারুলা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।

শাস্ত্রীয় সংগীতেও ছিল সুমনের অনায়াস বিচরণ। রাগাশ্রয়ী গানের জন্য তিনবার ‘সুর শ্রীনগর সংসদ’ সম্মানে ভূষিত হন তিনি। ২০০৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার তাঁকে ‘লতা মঙ্গেশকর পুরস্কার’ দেয় । আর ২০২৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত হন কিংবদন্তি এই শিল্পী।
সুমন কল্যাণপুরের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। এনসিপি (এসপি) নেতা শারদ পাওয়ার এক্সে লিখেছেন, ‘তাঁর মিষ্টি, সুমধুর ও হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠ ভারতীয় সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।’ তবে সংগীতপ্রেমীদের কাছে সুমন কল্যাণপুর হয়তো থেকে যাবেন তাঁর অমলিন গানগুলোর মধ্যেই।

Read full story at source