পেপারব্যাক, হার্ডব্যাক, না ই-বুক?

· Prothom Alo

রাজধানীর একটি পরিচিত বুকশপের এক কোণে দাঁড়িয়ে নতুন বই দেখছিলেন কলেজপড়ুয়া রাকিব। তাঁর হাতে কয়েকটি পেপারব্যাক বই। দাম তুলনামূলক কম, ব্যাগে রাখাও সহজ। হঠাৎ পাশের একটি টেবিলে চোখ আটকে গেল। সেখানে সাজানো রয়েছে কয়েকটি হার্ডব্যাক বই। মোটা মলাট, ঝকঝকে কভার, দেখতে ভালোই লাগছে।

সেখান থেকে রাকিব একটি বই হাতে নিলেন। দাম প্রায় দ্বিগুণ। কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখে আবার নামিয়ে রাখলেন। তিনি বলেন, একটি বইয়ের জন্য এত টাকা খরচ করতে চাই না। এই দামে তিনটা পেপারব্যাক নিতে পারব।

Visit milkshakeslot.online for more information.

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নাবিলাও পেপারব্যাক বই কেনেন। তাঁর যুক্তি সহজ। একটি হার্ডব্যাক বইয়ের দামে অনেক সময় দুটি বা তিনটি পেপারব্যাক বই কেনা যায়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বই পড়তে চাই। মলাট শক্ত না নরম, সেটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো বইয়ের ভেতরের গল্প।’

অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ হাসানের চিন্তা একেবারেই ভিন্ন। তিনি হার্ডব্যাক বই কিনে নিজের লাইব্রেরিতে রাখেন। গ্রামের বাড়িতে তাঁর একটি লাইব্রেরি আছে। অনেকে সেখানে পড়তে আসেন। মাহমুদ হাসান বলেন, ‘হার্ডব্যাক বই সহজে নষ্ট হয় না। আবার বুকশেলফে সাজিয়ে রাখলে ভালো লাগে। মনে হয়, এগুলো আমার জীবনের স্মৃতির অংশ।’

দুই ধরনের পাঠকই বই ভালোবাসেন। কিন্তু বইয়ের ধরন নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।

ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটের এক পুরোনো বই বিক্রেতা বলছিলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি পরিবর্তন লক্ষ করছেন। তরুণেরা মূলত সস্তা বই খোঁজেন। এ জন্য তাঁদের পেপারব্যাক বেশি পছন্দ।

ওই বিক্রেতা বলেন, মাঝবয়সী বা তার চেয়ে বেশি বয়সীরা হার্ডব্যাক বই বেশি পছন্দ করেন। বিশেষ করে ইতিহাস, সাহিত্য কিংবা বিরল সংস্করণের বই। তাঁর ভাষ্য, ‘অনেকে বই পড়ার জন্য কেনেন না, সংগ্রহের জন্য কেনেন। কেউ কেউ আবার বুকশেলফ সাজানোর জন্যও কেনেন।’

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজের একটি ছোট লাইব্রেরি গড়ে তুলছেন। তাঁর সংগ্রহে শতাধিক বই রয়েছে। বেশির ভাগই হার্ডব্যাক। কেন? তাঁর উত্তর, ‘একটি ভালো হার্ডব্যাক বই ২০ থেকে ৩০ বছরও টিকে যেতে পারে। আমি চাই আমার ছেলেমেয়েরাও এই বইগুলো পড়ুক।’

তাহলে প্রযুক্তির দাপটে হার্ডব্যাক হারিয়ে যাবে! সত্যি কি তা–ই? সম্ভবত না। যেভাবে সিনেমা আসার পর নাটক বন্ধ হয়নি, টেলিভিশন আসার পর রেডিও হারিয়ে যায়নি, ঠিক তেমনি ই-বুক আসার পরও হার্ডব্যাক বই থাকবে। হয়তো আগের মতো সবার হাতে থাকবে না। হয়তো প্রতিদিনের পড়ার জন্য মানুষ মোবাইল, ট্যাবলেট বা পেপারব্যাক বেছে নেবে। কিন্তু প্রিয় বইয়ের বিশেষ সংস্করণ, উপহার, সংগ্রহ কিংবা পারিবারিক লাইব্রেরির জন্য হার্ডব্যাকের আবেদন সহজে ফুরিয়ে যাবে না।

শফিকুল ইসলাম একটি পুরোনো বই দেখালেন। বইটি তিনি কিনেছিলেন প্রায় ১০ বছর আগে। পাতাগুলো কিছুটা হলদে হয়ে গেছে, কিন্তু মলাট এখনো শক্ত। ‘পেপারব্যাক হলে এত দিনে হয়তো ছিঁড়ে যেত,’ বলেন তিনি।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম প্রতিদিন মোবাইলে বই পড়েন। তাঁর ফোনে শতাধিক ই-বুক রয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তাঁর ঘরের বুকশেলফে সাজানো রয়েছে কয়েকটি বিশেষ হার্ডব্যাক বই। তাসনিম বলেন, ‘আমি বেশির ভাগ বই মোবাইলে পড়ি। কিন্তু যে বইগুলো আমাকে খুব নাড়া দেয়, সেগুলোর হার্ডব্যাক সংস্করণ কিনে রাখি।’

একসময় বই পড়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল ছাপা বই। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তরুণদের বড় একটি অংশ অনলাইনে পড়েন। তাঁরা পিডিএফ পড়েন, ই-বুক পড়েন।

তবু কাগজের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলায় লাখো পাঠকের মেলা বসে। নতুন বইয়ের গন্ধ, লেখকের অটোগ্রাফ, প্রিয় বই হাতে নেওয়ার আনন্দ—এসব অনুভূতি কোনো স্ক্রিন দিতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রকাশকেরাও হার্ডব্যাককে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। বিশেষ করে গবেষণাধর্মী বই, স্মৃতিকথা, সংগ্রহযোগ্য সংস্করণের ক্ষেত্রে হার্ডব্যাকের চাহিদা এখনো যথেষ্ট। কারণ, পাঠকের একটি অংশ বইকে কেবল পড়ার বস্তু হিসেবে নয়, সংরক্ষণ করার কথাটিও বিবেচনা করেন।

৪৫ বছর বয়সী আমিনুর রহমান বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, আমার কেনা বইগুলো একসময় সন্তান পড়বে। এ জন্য হার্ডব্যাক কিনতাম। এখন ওরা সেই বই পড়ে। বিশেষ করে শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের কথা বলতেই হয়।’

তাহলে প্রযুক্তির দাপটে হার্ডব্যাক হারিয়ে যাবে! সত্যি কি তা–ই? সম্ভবত না। যেভাবে সিনেমা আসার পর নাটক বন্ধ হয়নি, টেলিভিশন আসার পর রেডিও হারিয়ে যায়নি, ঠিক তেমনি ই-বুক আসার পরও হার্ডব্যাক বই থাকবে। হয়তো আগের মতো সবার হাতে থাকবে না। হয়তো প্রতিদিনের পড়ার জন্য মানুষ মোবাইল, ট্যাবলেট বা পেপারব্যাক বেছে নেবে। কিন্তু প্রিয় বইয়ের বিশেষ সংস্করণ, উপহার, সংগ্রহ কিংবা পারিবারিক লাইব্রেরির জন্য হার্ডব্যাকের আবেদন সহজে ফুরিয়ে যাবে না।

Read full story at source