বিচ্ছিন্নতার ভয়কে জয় করাই আল মাহমুদের গৌরব
· Prothom Alo
আল মাহমুদ বারবার অনুভব করেছেন, কবির একটা দেশ দরকার। এই দেশ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন নিজের কাল ও জাতিকে। সেই স্বপ্ন, ভাষা ও ইতিহাসের আলোকে কাব্যিক প্রকাশই মহান কবির কাজ। কিন্তু তিনি যখন কাজ করছিলেন, তখন কবি আর তাঁর কালকে শাসন করছে না; বরং কালই কবির নিয়তি ঠিক করে দেয়। এই রকম সময় একজন কবি কীভাবে লড়াই করেন, সেই নিশানা তাঁর কবিতায় উপস্থিত।
Visit sport-tr.bet for more information.
আজ শনিবার সকালে কবি আল মাহমুদ স্মরণে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধে কবি ও সম্পাদক রেজাউল করিম এই মন্তব্য করেছেন। ‘কবিতাহীন সময়ে কবির কাল’ শীর্ষক প্রবন্ধে রেজাউল করিম ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জ আগামবেনের ‘দ্য এন্ড অব দ্য পোয়েম’ ও ফরাসি দার্শনিক এলান বাদিওর ‘দ্য অ্যাজ অব দ্য পোয়েটস’–এর আলোকে কবির দার্শনিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা, কবিতার শব্দ ও ভাবগত নান্দনিকতার নিরিখে আল মাহমুদের কাব্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্যের কৃতী ব্যক্তিদের অবদান নিয়ে দিনব্যাপী সেমিনার আয়োজন করেছে। কবি আল মাহমুদ স্মরণে সেমিনার দিয়ে শুরু হয়েছিল এই কার্যক্রম। প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম।
প্রবন্ধকার রেজাউল করিম বলেন, একজন কবি তাঁর কালকে শাসন করতে চান। কিন্তু আধুনিক কালে এসে দেখা যাচ্ছে, কবি নয়, কালই প্রধান হয়ে উঠছে। কবি তাঁর কালকে প্রভাবিত করতে পারছেন না; বরং কাল বা সময়ই কবিকে প্রভাবিত করছে। এভাবে কবি যখন কালের খপ্পরে পড়েন, তখন সেটি তাঁর জন্য এক বিরাট হতাশার বিষয় পরিণত হয়। এটি সামগ্রিকভাবে আধুনিক কবিতাকে বিষাদের খনিতে পরিণত করে তুলেছে।
প্রবন্ধকার বলেন, আল মাহমুদেরও এই কালভীতি ছিল। তাঁর নান্দনিকবোধ ও কাব্যাদর্শের মধ্যে বৈপরীত্য ছিল। তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ থেকে শুরু করে পুরো কাব্যিক নান্দনিক অভিমুখ ও চেতনাগত অভিমুখ—এই দুইয়ের বৈপরীত্যই তাঁর বৈশিষ্ট্য হিসেবে পাঠ করা হয়। তবে তিনি যে কবিত্ব শক্তির প্রকাশ করে গেলেন, তাতে একজন রবি ঠাকুর বা গ্যেটে পাইনি, কিন্তু একজন আল মাহমুদকে পেয়েছি। যিনি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অনুগামী হয়েও আলাদা। এই বিচ্ছিন্নতার ভয়কে মোকাবিলার সাহসই আল মাহমুদের গৌরব।
কবি সাজ্জাদ শরিফ প্রবন্ধকারের আলোচনার সূত্রধরে আগামবেন ও বাদিওর কবিতাবিষয়ক বক্তব্যের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। এই দুই পশ্চিমা দার্শনিক কবিতার ধ্বনি অর্থময়তা নিয়ে ও কবিতার মধ্য দিয়ে সত্যের প্রকাশ ঘটানোর কথা বলেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল মাহমুদের কাব্য নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, ‘আল মাহমুদকে একটা সময় স্পষ্টতই উপেক্ষা—এমনকি তাচ্ছিল্য ও ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে। পরিচয়বাদী, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাবে কবি–সাহিত্যিকদের ফ্রেমবন্দী করার প্রবণতা আমাদের দেশে রয়েছে। এই ফ্রেমবন্দী অবস্থা থেকে আল মাহমুদকে মুক্ত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। আল মাহমুদের কাব্য থেকে অনেক দৃষ্টান্ত দিয়ে আলোচক দেখিয়েছেন, কবি পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির বহু বিচিত্র উপাদান তাঁর কবিতায় সমন্বিত করেছেন। তাঁর আধ্যাত্মিকতা ছিল, তিনি আধুনিক হতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতও তিনি গভীরভাবে অনুভব করেছেন।’ আলোচক বলেন, ‘তাঁকে আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ আজম বলেন, আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি। তিনি ঢাকা শহরের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক-নান্দনিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে বৃহৎ বাংলাকে হাজির করেছেন। তার আত্মা ও ভাষাকে আবিষ্কার করেছেন। কালকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা আল মাহমুদের রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
এর আগে বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘সেমিনার সিরিজ-২০২৫-২৬’ শীর্ষক এই দিনব্যাপী আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল সকাল ১০টায়। সংস্কৃতিসচিব কানিজ মওলা প্রধান অতিথি হিসেবে সেমিনার সিরিজের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেন, সরকারি উদ্যোগে অগ্রজ গুণীজনদের সম্মান জানানো এবং তাঁদের অবদান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধারার লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই সেমিনার সিরিজের আয়োজন করা হয়েছে। গুণীজনদের দীর্ঘ তালিকা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমিকভাবে তাঁদের নিয়ে আলোচনা, সেমিনার হবে। শুধু প্রবীণ নয়, নবীন গুণীজনের কাজ নিয়েও এমন আয়োজন করা হবে, যেন নতুন প্রজন্মের গুণীজনেরা অনুপ্রাণিত হতে পারেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ও ধন্যবাদ জানান একাডেমির সচিব মো. সেলিম রেজা।
দিনের অন্য আয়োজন
দিনব্যাপী সেমিনার সিরিজের দ্বিতীয় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফের স্মরণে। এতে ‘বাংলার ফেরদৌসী মনিরউদ্দীন ইউসুফ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পড়েন গবেষক হালিম দাদ খান। আলোচনা করেন লেখক-অনুবাদক জাভেদ হুসেন, সভাপতিত্ব করেন লেখক-আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন।
মধ্যাহ্নের রয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণে সেমিনার। কবি ও সমালোচক কুমার চক্রবর্তী পড়বেন ‘জীবনানন্দ ও অন্ধকার’ শীর্ষক প্রবন্ধ। আলোচনা করবেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক কুদরত-ই হুদা, সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।
শেষে কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম স্মরণে সেমিনার। অধ্যাপক মাসুদুল হক পড়বেন ‘রশীদ করীমের উপন্যাস: মনস্তাত্ত্বিক আধুনিকতা, নাগরিক চেতনা ও মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের শিল্পরূপ’ শীর্ষক প্রবন্ধ। আলোচনা করবেন অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক হোসনে আরা, সভাপতিত্ব করবেন, অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ আজিজুল হক।