প্রতিপক্ষ নয়, হাইতির কাছে ব্রাজিল এক ভালোবাসার নাম
· Prothom Alo

টানা দুটি দিন কোনো অস্ত্রের গর্জন শোনা যায়নি। বাতাসে ভাসেনি বারুদের গন্ধ। সংঘাত-জর্জর হাইতিতে ২০০৪ সালের সেই প্রদর্শনী ম্যাচটি যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল এক অলৌকিক জাদুকাঠি।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
তখনকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দলটাকে অতিথি হিসেবে পেয়ে হাইতির রাজধানী পর্তোপ্রিন্স হয়ে উঠেছিল যেন এক উৎসবের নগরী। হাইতির প্রবীণ সাংবাদিক পিয়ের রিচার্ড মিদি সেদিনের কথা মনে করে এখনো রোমাঞ্চ অনুভব করেন।
তাঁর বিদেশি বন্ধুরা নাকি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ানরা সত্যিই হাইতিতে খেলছে তো? দেখে তো মনে হচ্ছে তারা নিজেদের ঘরেই খেলছে!’
দৃশ্যটা আসলেই তেমন ছিল। রাস্তার দুই পাশে হলুদ-সবুজ জার্সি পরা, মুখে রং মাখা হাজারো মানুষের ভিড়। রোনালদো, রোনালদিনিও কিংবা রবার্তো কার্লোসদের একঝলক দেখতে মানুষ গাছে পর্যন্ত চড়ে বসেছিল।
১৯৭৪ সালের পর থেকে এবারের আগপর্যন্ত হাইতি আর কখনো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। তাই চার দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে সাম্বার দেশটাই হয়ে উঠেছিল তাদের নিজেদের দল।
১৯৭৪ সালের পর থেকে এবারের আগপর্যন্ত হাইতি আর কখনো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নিগত দুই-তিন দশকে শান্তিরক্ষা, মানবিক সাহায্য ও অভিবাসনে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই ভালোবাসাকে আরও প্রগাঢ় করেছে।
সেই ম্যাচটা হাইতি ৬-০ গোলে হেরেছিল, কিন্তু ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত সেই প্রীতি ম্যাচ তো শুধু স্কোরের ছিল না। গ্যাংওয়ারে ক্ষতবিক্ষত একটা দেশের জন্য ওটা ছিল শান্তির নিশ্বাস। মিদির ভাষায়, ‘সবাই দুই দিনের জন্য অস্ত্র নামিয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল।’
ব্রাজিল একাদশে আসছে পরিবর্তন, জানালেন আনচেলত্তিএবার হাইতিয়ানদের সামনে এসেছে নিজেদের দলকে বিশ্বকাপে সমর্থন করার এক বিরল সুযোগ এবং কাকতালীয়ভাবে, গ্রুপ ‘সি’-তে তাদের সঙ্গী সেই ব্রাজিল! গ্রুপের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হাইতি হেরেছে ১-০ গোলে।
কিন্তু বিদ্যুতের অভাব আর তীব্র আর্থিক সংকটে ভোগা দেশটির কাছে ফুটবল মানে শুধু স্কোরলাইন নয়, এক বুক আশা।
আগামীকাল বাংলাদেশ সময়ে সকাল সাড়ে ছয়টায় হাইতি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচটা খেলবে তাদেরই প্রিয় দল ব্রাজিলের বিপক্ষে। সেলেসাওরা এই ম্যাচটাকে ‘টিকে থাকার লড়াই’ মনে করলেও করতে পারে, কিন্তু হাইতির কাছে এটা ভালোবাসার এক ম্যাচ।
হাইতিয়ান এক ফুটবলপ্রেমী জোয়েল জঁ-ব্যাপটিস্ট যেমন বলেন, ‘ব্রাজিলকে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের মতো মনে হয়, সংস্কৃতির দিক থেকেও আমাদের দারুণ মিল।
মাঠের দিকে তাকালে আমরা এমন সব মানুষকে দেখতে পাই, যাদের দেখতে ঠিক আমাদের মতোই লাগে। তারা যখন বিশ্বমঞ্চে দুর্দান্ত সব কীর্তি গড়ে, তখন মনে মনে ভাবি, ইশ, আমরাও যদি এমনটা করতে পারতাম!’
প্রথম ম্যাচে হাইতির সমর্থকেরা এভাবেই নেচেগেয়ে উদযাপন করেছেআগামীকালের ম্যাচটি তাই শুধু দুই দলের ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, এটা জোয়েলের মতো লাখো হাইতিয়ানের জন্য এক টুকরা শৈশবকে ছোঁয়া, যেখানে এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের মাতৃভূমি, আর অন্য পাশে আজন্ম লালিত প্রথম ভালোবাসা।
গ্যালারিতে জোয়েল যখন বসবেন, তখন একটা চোখ হয়তো খুঁজবে হাইতির লাল-নীল পতাকা, আর মনটা গুনগুন করবে সাম্বার চিরচেনা সুরে। ফুটবল ছাড়া আর কিসে এমন হৃদয়ের দোলাচল সম্ভব!
সেই তালপাতার সেপাই দিয়াজই এখন কলম্বিয়ার প্রেরণা