বিশ্বকাপ ও অক্সফোর্ডে অনুষ্ঠান: বাংলাদেশি প্রবাসীদের রাজনৈতিক উগ্রতা
· Prothom Alo

১৬ জুন রাতে আর্জেন্টিনা বনাম আলজেরিয়ার বিশ্বকাপ খেলায় ফুটবলপ্রেমীরা যখন টিভির পর্দায় খেলা দেখতে মগ্ন, তখন নিউইয়র্ক শহরের জ্যামাইকা এলাকায় কিছু স্থানীয় বাংলাদেশি নিজেদের মধ্যে মারামারিতে ব্যস্ত। তাঁরা কিছু ব্যক্তি আর্জেন্টিনার ভক্ত আর কিছু ব্যক্তি অন্য দলের পক্ষে। খেলায় দলাদলি থাকা স্বাভাবিক কিন্তু তাই বলে মারামারি? তা–ও কিনা একটি রেস্টুরেন্টে, যেখানে খেলা দেখতে সবাই উপস্থিত?
এ পর্যন্ত অনেকগুলো বিশ্বকাপ খেলা হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার বিভিন্ন শহরে। আরও হবে। কোথাও কোনো জায়গায় এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের খবর পাওয়া যায়নি। একটি জায়গায় হলো, এবং তা–ও কিনা বাংলাদেশিদের মধ্যে। যদি এ মারামারি প্রকৃত আর্জেন্টিনার আর আলজেরিয়ার নাগরিকদের মধ্যে হতো, তা–ও কিছুটা বুঝতাম। বুঝলাম না এতে বাংলাদেশিদের কেন এত মারমুখী আচরণ! তা–ও কিনা বিদেশের মাটিতে!
Visit moryak.biz for more information.
বিদেশে বাংলাদেশিদের দলাদলির কারণে আক্রমণাত্মক ব্যবহার নতুন কিছু নয়। কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম বেশ কিছু অপেক্ষাকৃত তরুণ বাংলাদেশি লন্ডন শহরে জড়ো হয়ে হেনস্তা করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে আসা কয়েকজন তরুণ নেতাকে, যাঁরা অক্সফোর্ড ডিবেটিং সোসাইটি দ্বারা আমন্ত্রিত।
তাঁরা যাবেন অক্সফোর্ডে একটি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা সভায় যোগ দিতে। তাঁদের নেতা, বর্তমানে সংসদ সদস্য, যিনি চব্বিশের জুলাই ছাত্র আন্দোলনের একজন শীর্ষ আহ্বায়ক। তাঁকে হেনস্তা করতে এসেছেন ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকারের লালিত কিছু ব্যক্তি, যাঁরা জুলাই আন্দোলনবিরোধী এবং তাই তাঁরা সে আন্দোলনের ব্যক্তিদের বিদেশের মাটিতে শায়েস্তা করবেন।
এ নিয়ে ভিডিওতে দেখলাম তাঁদের ঠেকাতে সংসদ সদস্যের দলের সমর্থকেরা মাঠে নেমেছেন। সে এক তুমুল কাণ্ড, যেটা থামাতে পুলিশকে আসতে হলো। নিউইয়র্কের মারামারি থামাতেও পুলিশ এসেছিল।
এ ঘটনাগুলোর আগে গত বছরের এই নিউইয়র্কে সংঘটিত হয়েছিল কয়েকটি হাঙ্গামা আমাদের বাংলাদেশিদের নিয়ে। উপলক্ষ ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাতিসংঘে সাধারণ সম্মেলনে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল নিয়ে আসা। প্রতিনিধিদলের বাইরে যাওয়ার পথ রোধ করার জন্য বেশ কিছুসংখ্যক লোক জমা হয়, যারা প্রকাশতই বিগত সরকারি দলের সমর্থক। কিন্তু একই সঙ্গে এদের রোখার জন্য আসে প্রতিনিধিদলের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির দলের লোক আর অধ্যাপক ইউনূসের কিছু সমর্থক। ব্যস, আর যায় কোথায়।
অক্সফোর্ডে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের সমর্থনে কর্মসূচিঅধ্যাপক ইউনূস আর সেই রাজনৈতিক ব্যক্তি কোন ফাঁকে বেরিয়ে গেলে বাকি থাকা একজন ছাত্রনেতা এই হেনস্তা থেকে বেরোতে পারেননি। পরে পুলিশ পাহারায় তিনি বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যান। এরপরও বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয় সে রাস্তায়, যেখানের হোটেলে প্রতিনিধিরা অবস্থান করেন।
সেদিন রাতেও জ্যামাইকা এলাকায় বিবদমান দুই দল মারামারিতে লিপ্ত হয়, যার জন্য পুলিশ কিছু লোককে গ্রেপ্তার করে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানি যে এই হাঙ্গামায় যোগ দিতে কয়েকজন ব্যক্তি যুক্তরাজ্য থেকে এসেছিলেন।
এ ঘটনাগুলোর আগেও আমেরিকার বাংলাদেশি–প্রসূত ব্যক্তিরা তাঁদের নিজ নিজ দলের পক্ষে রাজনীতি চালিয়ে আসছেন। তবে তাঁরা এই রাজনীতি মোটামুটি অহিংস রেখেছিলেন, যদিও তাঁরা নিজ দলের প্রধান যুক্তরাষ্ট্রে এলে তার জন্য সভা–সমিতি করতেন বা দলের পক্ষে শোভাযাত্রা করতেন, যেখানে নেত্রীরা যেতেন।
এসবের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নেতা–নেত্রীদের সুনজরে থাকা আর সে সুবাদে দেশে গেলে কিছু সুবিধা আদায় করা। এটা যে সব বৃথা, তা বলব না। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে থাকা কিছু সুবিধাবাদী লোক বাংলাদেশে ভালো ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ পায় এমনকি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও করেন। এ ধরনের বিদেশের মাটিতে দেশের রাজনীতি আর তার বিদেশি অঙ্গ গড়ে তোলা আমার জানামতে শুধু বাংলাদেশিদের।
নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের সহিংস আচরণ, সরকারের ব্যর্থতা ও নতুন সংঘাতের লক্ষণএ প্রসঙ্গে আমি বেশ কয়েক বছর আগে একটি ইংরেজি প্রবন্ধে বিদেশে বাংলাদেশি রাজনীতি নিয়ে লিখেছিলাম, যদিও তখন পর্যন্ত এ রকম মারমুখী পরিস্থিতি ছিল না। সে প্রবন্ধের বেশ কিছু আমি নিচে উদ্ধৃত করছি। কারণ, অনেক আগে হলেও কথাগুলো এখনো প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব এখন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দলীয় মতপার্থক্য ও পারস্পরিক কোন্দল আর শুধু দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন যুক্তরাষ্ট্রেও দৃশ্যমান—নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো বড় শহরের জনসমাগমস্থলে সভা, মিছিল ও বিক্ষোভের মাধ্যমে। সপ্তাহে একবার না একবার, দুই দলের মার্কিনভিত্তিক সমর্থকেরা সরকারের পদক্ষেপের নিন্দা বা সমর্থনে সমাবেশ করছেন।
বাংলাদেশে যা ঘটে, তারই প্রতিচ্ছবি আমরা এখানে দেখি—যদিও সৌভাগ্যবশত তা সহিংস রূপ নেয় না। আমার ধারণা, এই অহিংসতা তাঁদের স্বভাবজাত সংযমের ফল নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আইনকানুনের প্রতি তাঁদের অনিচ্ছাকৃত শ্রদ্ধার ফল।
সম্প্রতি বিরোধী দলের মার্কিনভিত্তিক সমর্থকেরা হোয়াইট হাউসের সামনে ব্যানার হাতে বিক্ষোভ করেছেন—দাবি করেছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে। আয়োজকেরা হয়তো আশা করেছিলেন হোয়াইট হাউস থেকে সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ফোন যাবে; কিন্তু পথচারীদের কাছে এটি ছিল হোয়াইট হাউসের সামনে আরেকটি বিচিত্র বিক্ষোভ মাত্র।
এর কয়েক দিন আগে নিউইয়র্কে সরকারদলীয় এক এমপিকে সংবর্ধনা জানাতে আরেকটি সমাবেশ হয়, যেখানে বক্তারা বিরোধী দলের কর্মকাণ্ডকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন। সৌভাগ্যক্রমে কাছাকাছি কোথাও বিরোধী দলের সমাবেশ ছিল না—না হলে সংঘর্ষ বাধতে পারত। এর ঠিক আগে একই শহরে বিরোধী দলের সমর্থকেরা এক নেতাকে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন, যেখানে সরকারকে দমনমূলক আচরণের অভিযোগ করা হয়।
এ মাসের শুরুতে সরকারদলীয় সমর্থকদের একটি প্রতিনিধিদল কংগ্রেসের বাংলাদেশ ককাসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু ব্যক্তির সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই সাক্ষাৎ শেষ হতেই বিরোধী দলের আরেকটি দল একই কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে দেখা করে তাদের উদ্বেগ জানায়। এই দুই সাক্ষাৎ কংগ্রেসম্যানকে বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে আলোকিত করেছে, নাকি আরও বিভ্রান্ত করেছে, তা বলা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রে দুই দলের সমর্থকদের প্রতিবাদ ও পাল্টা প্রতিবাদ বোঝা যায়—কারণ দেশে যে তীব্র বৈরিতা আছে, তারই প্রতিফলন এটি। কিন্তু বিষয়টি আরও অদ্ভুত হয়ে ওঠে যখন দুই দলের কোনো নেতা যুক্তরাষ্ট্রে এলে সমর্থকেরা ব্যানার-স্লোগানসহ বিক্ষোভে নামেন। তখন দুই পক্ষের দুই পক্ষের সংঘর্ষ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
অর্থাৎ, আমরা যুক্তরাষ্ট্রে বসেই দেশের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও বিবাদের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করেছি। বিদেশে আমাদের সম্পর্কে যে চিত্র তৈরি হচ্ছে, তা মোটেই সুখকর নয়।
বিদেশে বাংলাদেশি জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শাখা-প্রশাখাও; বিশেষত দুই প্রধান দলের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বড় শহরেই এই দুই দলের নামে স্থানীয় শাখা থাকে। কখনো কখনো এখানেই শেষ নয়—দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে নতুন নতুন উপদল গঠিত হয়, প্রত্যেকেই দাবি করে যে তাদেরই দলীয় প্রধানের আশীর্বাদ রয়েছে। স্থানীয় বাংলা ট্যাবলয়েডে পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন ছাপা হয়—সভা, সমাবেশ ও পাল্টা সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো জাতীয় পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে এই শাখাগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং তাঁদের সম্মানে আয়োজিত সভায় যোগ দেন। মনে হয় তাঁরা ভাবেন, যুক্তরাষ্ট্রও তাঁদের সম্প্রসারিত নির্বাচনী এলাকা, আর এখানকার সমর্থকেরা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভোট জোগাড় করবে।
দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এত বিপুল বিদেশি শাখা নেই—শুধু বাংলাদেশেরই আছে। ভারতের কংগ্রেস ও বিজেপির যুক্তরাষ্ট্রে ওভারসিজ অ্যাসোসিয়েশন আছে, কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ভারতীয় জাতীয় স্বার্থে লবিং করা। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একই।
কিন্তু বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে আমরা দেখি—দলে দলে সংগঠন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য দেশের রাজনীতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়াই করা।
অনেক বছর আগে, বঙ্গবন্ধুর সময়ে উচ্চ পদে থাকা এক রাজনৈতিক নেতা (মরহুম তোফায়েল আহমদ) ব্যক্তিগত সফরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে স্থানীয় শাখার সদস্যদের একটি সভায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন—তাঁরা বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অংশ নিয়ে, স্থানীয় জনজীবনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশকে ভালোভাবে উপকার করতে পারেন।
আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশিরা যদি নিজেদের দেশেরই এক নেতার এই প্রজ্ঞাময় পরামর্শটি মেনে চলতেন এবং যদি তাঁরা দেশের নোংরা, প্রতারণাপূর্ণ রাজনীতির অনুকরণ বন্ধ করতেন এবং বিদেশে বসে তার ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি না করতেন, তাহলে কি রাজনৈতিক এমন উগ্রতা দেখতে হতো আমাদের?
রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চাইলে আরও ভালো পথ আছে—যা শুরু হতে পারে আমাদের বসবাসের স্থানীয় সমাজকে সাহায্য করার মাধ্যমে। আর আমরা যদি জন্মভূমিকে সেবা করতে চাই, তারও ভালো পথ আছে—যা শুরু হতে পারে বিদেশে আমাদের নিজেদের একটি সম্মানজনক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী লেখক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব