সুন্দরবনে লোনাপানির বুনো কুমিরের সংখ্যা আসলে কত

· Prothom Alo

প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়ম হলো নিজের ঘরে ফিরে আসার তাগিদ, যা পশুপাখির বেঁচে থাকা ও বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জরুরি। অনেক প্রাণী খাবারের খোঁজে প্রতিদিন ছোটখাটো ভ্রমণ শেষে নীড়ে ফেরে, আবার কোনো কোনো প্রাণী মাসের পর মাস দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিজের চেনা ঠিকানায় ফিরে আসে। তবে ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের জলাশয়ের সবচেয়ে বড় শিকারি কুমিরদের ক্ষেত্রে এই স্বভাব এক অনন্য ও জটিল রূপ নেয়।

সাধারণত বুনো কুমিরকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিলে তারা অলৌকিক উপায়ে পুনরায় তাদের আগের পুরোনো জায়গায় ফিরে আসে। কিন্তু খাঁচায় বা কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রে বছরের পর বছর বড় হওয়া কুমিরদের বন্য পরিবেশে ছেড়ে দিলে তাদের আচরণ কেমন হয়, তা এত দিন বিজ্ঞানীদের কাছে এক অচেনা রহস্য ছিল। সম্প্রতি বাংলাদেশের সুন্দরবনে পরিচালিত এক গবেষণায় এই বিষয়ে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও যুগান্তকারী তথ্য পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার মারডক ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই নতুন বৈজ্ঞানিক সাফল্যের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। লন্ডনের বিখ্যাত প্রজনন ও বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জার্নাল ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

মারডক ইউনিভার্সিটির আচরণগত পরিবেশবিদ এবং সহযোগী অধ্যাপক রু সোমাভিরা এবং তাঁর দল বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন এলাকায় এই বিশেষ গবেষণা পরিচালনা করেন। সুন্দরবনকে দেশের লোনাপানির কুমিরদের শেষ আশ্রয়স্থল বলা হয়।

১৯৭০ দশক পর্যন্ত চামড়ার জন্য অতিরিক্ত বাণিজ্যিক শিকারের কারণে বাংলাদেশে লোনাপানির কুমির প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। ১৯৭৩ সাল থেকে এদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও বুনো কুমিরের সংখ্যায় কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বর্তমানে এ দেশের বেশির ভাগ লোনাপানির কুমির সুন্দরবনেই বাস করে, তবে সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। মাত্র ১৪০টি পূর্ণবয়স্ক কুমির অবশিষ্ট রয়েছে।

সুন্দরবনে গবেষণার একটি কুমির

সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কৃত্রিমভাবে প্রজননকেন্দ্রে বড় করা কুমিরদের যখন বনে ছাড়া হয়, তখন তারা যদি আবার তাদের আগের খাঁচা বা প্রজননকেন্দ্রের দিকে ফিরে আসার চেষ্টা করে, তবে পুরো প্রজেক্টটি ব্যর্থ হয়ে যায়। এত দিন ছোট বা সদ্যোজাত ছানা দিয়ে এই সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো, কিন্তু বন্য পরিবেশে তাদের বেঁচে থাকার হার থাকে অত্যন্ত কম এবং পূর্ণবয়স্ক হতে অনেক দীর্ঘ সময় লাগে। তাই পূর্ণবয়স্ক কুমিরদের বন্য পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পরিমাপ করা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা সুন্দরবনের মোট ৫টি পূর্ণবয়স্ক লোনাপানির কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ডিভাইস বা জিপিএস ট্যাগ যুক্ত করেছিলেন। এই ৫টি কুমিরের মধ্যে ছিল ৩টি খাঁচায় বড় হওয়া নারী কুমির, যারা দীর্ঘ ৮ থেকে ২২ বছর কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রে কাটিয়েছে। আর ১টি স্থানীয় বুনো কুমির, যাকে সুন্দরবনের নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ধরে আবার সেখানেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ১টি বুনো পুরুষ কুমির ছিল, যার নাম জংড়া। এই কুমিরকে তার মূল আবাসস্থল থেকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা কয়েক মাস ধরে এই কুমিরগুলোর প্রতিটি মুভমেন্ট বা চলাফেরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

গবেষণার সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি নিয়ে সহযোগী অধ্যাপক রু সোমাভিরা বলেন, সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, খাঁচায় বড় হওয়া ৩টি নারী কুমির বন্য পরিবেশে মুক্ত হওয়ার পর তাদের পুরোনো প্রজননকেন্দ্রে ফিরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র কোনো চেষ্টা করেনি। তারা সুন্দরবনের ছোট ও সুনির্দিষ্ট এলাকায় নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে এবং সেখানকার স্থানীয় বুনো কুমিরের মতোই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে। এটি স্পষ্ট সংকেত দেয় যে তারা কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই সম্পূর্ণ নতুন বন্য পরিবেশের সঙ্গে অনায়াসে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। তবে কৃত্রিম পরিবেশে বড় হওয়া কুমিরদের ক্ষেত্রে ফলাফল চমৎকার হলেও, সুন্দরবনের আসল বুনো কুমির জংড়ার ক্ষেত্রে ফলাফল বিজ্ঞানীদের একটু ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। জংড়াকে তার চেনা ঘর থেকে প্রায় ১৩২ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে সুন্দরবনের অন্য অংশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

জংড়ার আচরণ নিয়ে অধ্যাপক সোমাভিরা বলেন, দুর্ভাগ্যবশত স্থানান্তরিত বুনো কুমির জংড়ার ফলাফল খাঁচায় বড় হওয়া কুমিরদের মতো অতটা সহজ ছিল না। গবেষণার নির্দিষ্ট সময়ে সে হয়তো তার সাইটে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু তার চলাচলের দিকটি ছিল সম্পূর্ণভাবে তার নিজের পুরোনো বাড়ির দিকে। ট্র্যাকিংয়ে দেখা গেছে, সে অন্য সব কুমিরের চেয়ে প্রতিদিন অনেক বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে এবং বিশাল এলাকাজুড়ে ঘুরেছে। এমনকি সে এক দিনেই ৩০ কিলোমিটারের বেশি পথ সাঁতরে পার করেছে, যা মূলত কুমিরদের নিজের ঘরে ফেরার তীব্র আকুলতার একটি চিরায়ত লক্ষণ।

নতুন এই আবিষ্কার বন্য প্রাণী সংরক্ষণবাদীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বিজ্ঞানীরা এখন নিশ্চিত হয়েছেন যে প্রজননকেন্দ্রে বড় হওয়া পূর্ণবয়স্ক বা আধা পূর্ণবয়স্ক কুমিরদের সরাসরি বন্য পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে বুনো কুমিরের সংখ্যা বাড়ানো একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সফল কৌশল হতে পারে। তবে বুনো কুমিরদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ঘরে ফিরে যাওয়ার এই তীব্র প্রবণতাকে মাথায় রেখে আরও সতর্ক ও পরিকল্পিত উপায়ে ছাড়ার পরিকল্পনা করতে হবে।

কুমিরের অস্তিত্ব সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। খাঁচায় বড় হওয়া দীর্ঘ ২২ বছরের পুরোনো কুমিরও যে সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বনে গিয়ে নিজেকে খাপ খাইয়ে বন্য প্রাণীতে রূপান্তর করতে পারে, এই প্রমাণ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক।

সূত্র: ফিজিস ডটঅর্গ

Read full story at source