৮০০ বছরের পুরোনো গাছকে ভালোবেসেই মেরে ফেলল মানুষ
· Prothom Alo
ইংল্যান্ডের শেরউড ফরেস্টে একটা গাছ ছিল। নাম তার মেজর ওক। বয়স কত জানো? কম করে ৮০০ বছর, বেশি হলে ১ হাজার ২০০। একটু ভাবো, এই গাছ যখন থেকে বাড়তে শুরু করেছিল, তখন ইউরোপে প্লেগ মহামারিতে মানুষ মরছে দলে দলে। ইংল্যান্ডে রাজার গদি নিয়ে যুদ্ধ চলছে এক বংশের সঙ্গে আরেক বংশের। এই গাছের জীবদ্দশায় ছয়জন হেনরি, ছয়জন জর্জ, দুজন এলিজাবেথ এসে আবার চলে গেছেন রাজত্ব করে। আর লোকে বলে, এই গাছের ছায়াতেই একদিন আশ্রয় নিতেন সেই বিখ্যাত বনদস্যু রবিন হুড।
গত জুনে গাছটা মারা গেছে। ব্রিটেনের পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আরএসপিবি খবরটা জানিয়েছে। প্রায় হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা প্রাণ। এক বসন্তে চুপ করে থেমে গেল।
Visit newsbetting.cv for more information.
যে গাছ নিয়ে গল্প বানিয়েছিল মানুষ
মেজর ওক নামটা এসেছে এক সৈনিকের কাছ থেকে। আঠারো শতকের শেষ দিকে মেজর হেইম্যান রুক নামের একজন সেনা কর্মকর্তা চাকরি শেষ করে শেরউড ফরেস্টের কাছে থাকতে আসেন। তিনিই প্রথম এই গাছের ছবি আঁকেন আর লিখে রাখেন এর গল্প। সেই থেকেই গাছটার নাম হয়ে যায় মেজর ওক।
গাছটা ছিল রীতিমতো দানবের মতো বিশাল। কাণ্ডের ঘের ৩৬ ফুট। কয়েকজন মানুষ হাত ধরাধরি করে দাঁড়ালেও পুরো কাণ্ডটা ঘিরে ফেলতে পারবে না। ভেতরে ছিল বিশাল একটা ফাঁপা জায়গা। সেখান থেকেই গল্পটা শুরু—রবিন হুড নাকি এই ফাঁপা কাণ্ডের ভেতর লুকিয়ে থাকতেন, কখনো রাখতেন লুটের সম্পদ।
গল্পটা সত্যি কি না, কেউ জানে না। রবিন হুড নিজেই তো অর্ধেক ইতিহাস, অর্ধেক রূপকথা। কিন্তু গল্পটা এমন জোরে ছড়িয়েছিল যে মেজর ওক হয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার পর্যটকের স্বপ্নের জায়গা। ভিক্টোরিয়ান আমলে রেললাইন বসার পর তো দলে দলে মানুষ আসা শুরু করল গাছ দেখতে।
এল নিনোর প্রভাবে যেভাবে বদলে যাচ্ছে বর্ষাকালযত্নই যখন কাল হলো
যারা গাছটাকে এত ভালোবাসত, তাদের সেই ভালোবাসাই একদিন গাছটাই বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল।
বছরের পর বছর লাখ লাখ মানুষ এসে গাছের গোড়ায় হেঁটেছে। এই হাঁটাহাঁটির চাপে মাটি এত শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে চার ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি পাথরের মতো জমে গেছে। শিকড় তখন মাটি থেকে আর পানি বা খাবার টানতে পারছিল না। আর্বরিস্ট রেগ হ্যারিস বলেছেন, এই মাটি গাছের জন্য একদম ‘শত্রু’ হয়ে উঠেছিল।
মানুষ গাছটাকে বাঁচাতে চেয়েছিল বহুবার। কিন্তু প্রতিবারই যেন উল্টো ফল হয়েছে। প্রায় ১২০ বছর আগে ঝড়ে গাছের গায়ে ক্ষত হলে মানুষ সিসার পাতলা পাত লাগিয়ে দিয়েছিল পানি ঢুকতে না দিতে। পরে সেই সিসা বদলে ফাইবার গ্লাস লাগানো হয়, যা এখনো দেখা যায়। ১৯০৪ সালের দিকে কামাররা লোহার রড আর ব্রেস বানিয়ে গাছের ডালপালা ধরে রাখার ব্যবস্থা করে। পরে যখন বোঝা গেল এই লোহাই গাছকে কষ্ট দিচ্ছে, তখন আর সেগুলো খুলে ফেলার উপায় ছিল না।
সত্তরের দশকে মাটি বাঁচাতে গাছের চারপাশে বেড়া দেওয়া হলো। বড় বড় কাঠের খুঁটি বসানো হলো ডালপালা ঠেকা দিতে। দেখতে যেন টেলিগ্রাফের পোল। আশির দশকে আরও খুঁটি যোগ হলো। ২০০০ সালের শুরুতে সেই কাঠের খুঁটি বদলে দেওয়া হলো সিমেন্টের পায়াযুক্ত লোহার খুঁটি দিয়ে। কিন্তু সেই সিমেন্টও আবার মাটির ক্ষতি করল।
আরও পরে মাটির হাল ফেরাতে গাছের গোড়ায় কাঠের গুঁড়া ছড়ানো হলো। অথচ এই কাঠের গুঁড়াতেই বেড়ে উঠল আর্মিলারিয়া নামের এক ছত্রাক, যা গাছ মেরে ফেলার জন্যই কুখ্যাত। হ্যারিস বলেন, এতগুলো ঘটনা একটার সঙ্গে আরেকটা এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে কোনো একটা কারণকে দায়ী করার উপায় নেই।
ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খিটখিটে হয় কেনমানুষ গাছটাকে বাঁচাতে চেয়েছিল বহুবারযখন কোনো কুঁড়ি এল না
গত কয়েক বছরে গাছটা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ২০২৫ সালে গাছের গায়ে একরকম যন্ত্র লাগানো হয়েছিল। ডেনড্রোমিটার, যেটা কাজ করে হার্ট মনিটরের মতো। সেই যন্ত্রে ধরা পড়েছিল গাছের শরীরে শুধু ‘ক্ষীণ কিছু স্পন্দন’।
এই বসন্তে কোনো শাখায় নতুন পাতা বা কুঁড়ি দেখা গেল না। তখনই গাছের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মানুষেরা বুঝে গেলেন, আর আশা নেই। শেরউড ফরেস্ট এস্টেটের তত্ত্বাবধায়ক ক্লোয়ি রাইডার বলেছেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন, যদি গাছের মুকুটে কোনো প্রাণের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু কিছুই এল না।
মরেও যে রয়ে যায়
মেজর ওক এখন রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। কাণ্ডের রং সাদা হয়ে আসছে আস্তে আস্তে। তবু মানুষ আসা বন্ধ করবে না। শেরউড আউটল’স দলের রব ব্র্যাকলি নিজে রবিন হুডের পোশাক পরে পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখান। তিনি বলেন, তিনি এখনো মানুষকে নিয়ে আসবেন এই জায়গায়, যাকে তিনি ডাকেন রবিন হুডের ‘আত্মিক বাড়ি’। গাছের পাতাভরা ডালপালা আর কখনো দেখা যাবে না—এ কথা ভাবলে তাঁর খারাপ লাগে। তবু গাছটা বনের মেঝেতে ছায়া ফেলে যাবে, বলেন তিনি।
হ্যারিসের মতে, মরে গেলেও মেজর ওক শেরউড ফরেস্টের জীবনের অংশ হয়ে থেকে যাবে। এই গাছ থেকে ঝরে পড়া হাজার হাজার একর্ন বা বীজ ছড়িয়ে গেছে পুরো ব্রিটেনে। তার মানে, এখন কোথাও না কোথাও মাটি ফুঁড়ে একটা ছোট চারা বেরোচ্ছে, যার ভেতরে বেঁচে আছে সেই পুরোনো গাছটাই।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসবিশ্বকাপের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁস