মুসলিম সভ্যতায় প্রকাশনা শিল্প: একটি অজানা অধ্যায়

· Prothom Alo

পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাসে ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান উদ্ভাবক জোহানেস গুটেনবার্গ কর্তৃক মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারকে মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু এই আবিষ্কারের কয়েক শতক আগেই যখন ইউরোপে কাগজের ব্যবহার পর্যন্ত সীমিত ছিল, তখন ইসলামি সভ্যতায় গড়ে উঠেছিল এক সুবিশাল ও সুশৃঙ্খল কিতাব-প্রকাশনাশিল্প। আরবি সাহিত্যে এই পেশাকে বলা হয় ‘ওয়াররাকা’ এবং এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের বলা হতো ‘ওয়াররাক’।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

হিজরি দ্বিতীয় শতকে আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে কাগজ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রকাশনাশিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আজকের প্রকাশকদের অনেকটা পূর্বসূরি ছিল এই ওয়াররাক সম্প্রদায়, যারা পাণ্ডুলিপি অনুলিপি, বাঁধাই ও বিক্রির কাজে যুক্ত ছিল।

আব্বাসীয় আমলে বাগদাদে কাগজ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রকাশনাশিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করে। আজকের প্রকাশকদের পূর্বসূরি ছিল এই ওয়াররাক সম্প্রদায়।

ইমামদের পরিশ্রমী ‘ওয়াররাক’

বড় বড় ইমামদের অনেকের নিজস্ব ওয়াররাক বা ব্যক্তিগত অনুলিপিকার ছিলেন। ইমাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল আল-বুখারির (মৃ. ২৫৬ হি.) সঙ্গী ওয়াররাক মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম আর-রাজি সর্বদা তাঁর সঙ্গে থাকতেন এবং রাতে কোনো হাদিসের বিন্যাস মনে এলে ইমাম বুখারি তাঁকে ডেকে তা লিখিয়ে নিতেন। (আসকালানি, তাগলিকুত তালিক আলা সহিহিল বুখারি, বৈরুত: আল-মাকতাবুল ইসলামি, ১৯৮৫)

মিসরের বিশ্বকোষ-লেখক শিহাবুদ্দিন আন-নুওয়াইরি (মৃ. ৭৩৩ হি.), যিনি ৩০ খণ্ডের নিহায়াতুল আরব-এর রচয়িতা, প্রতিদিন ৩ কুররাস (নোটখাতা) পরিমাণ লেখার নিয়ম মেনে চলতেন।

জীবদ্দশায় তিনি সহিহ বুখারি সম্পূর্ণ আটবার নিজের হাতে অনুলিপি করেছিলেন এবং তাঁর হাতের লেখার এত কদর ছিল যে প্রতিটি সেট হাজার দিরহামে (রৌপ্যমুদ্রা) বিক্রি হতো।

মুসলিম সভ্যতায় গ্রন্থাগার ও আরকাইভাল সংস্কৃতি

অমুসলিমদের অংশগ্রহণ

ওয়াররাকা শিল্পের একটি লক্ষণীয় দিক ছিল এতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ। হিজরি চতুর্থ শতকের গ্রন্থ সমালোচক ইবনুন নাদিম বাগদাদের প্রখ্যাত খ্রিষ্টান যুক্তিবিদ ও দার্শনিক ইয়াহইয়া ইবনে আদি আল-মানতিকির (মৃ. ৩৬৪ হি.) একটি উক্তি লিপিবদ্ধ করেছেন।

ইবনে আদি, যিনি নিজের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে নিয়মিত পাণ্ডুলিপি অনুলিপি করতেন, বলেছিলেন যে তিনি নিজের হাতে ইমাম তাবারির তাফসির  দুই সেট অনুলিপি করে দূরবর্তী অঞ্চলের শাসকদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের বহু গ্রন্থ তিনি নিজ হাতে লিখে বাজারজাত করেছিলেন। (ইবনুন নাদিম, আল-ফিহরিস্ত, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)

পবিত্র কোরআনের তাফসিরের মতো স্পর্শকাতর ধর্মীয় গ্রন্থ একজন খ্রিষ্টান পণ্ডিতের হাতে অনুলিপি হচ্ছে আর মুসলিম রাজন্যবর্গ সেই কিতাব নিজেদের গ্রন্থাগারে সংগ্রহ করছেন, এ ঘটনা ওয়াররাকা শিল্পের ধর্মীয় সীমারেখা-অতিক্রমী চরিত্রের একটি প্রামাণ্য উদাহরণ।

কিতাবের শেষ পাতায় তিনি লিখে গিয়েছিলেন—পাঠক যদি কোথাও ভুল পান তবে তাঁকে ক্ষমা করে দেন, কারণ, ডান হাতে কিতাবের জটিল শব্দ লেখার সময় তিনি বাঁ হাতে সন্তানের দোলনা দোলাচ্ছিলেন।

কর্দোবার নারী ক্যালিগ্রাফার 

ওয়াররাকা শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন মুসলিম নারীরা। কর্দোবা শহরের একটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই প্রায় ১৭০ জন নারী বসবাস করতেন, যাঁদের পেশা ছিল কোরআনের মুসহাফ অনুলিপি করা। (আবদুল ওয়াহিদ আল-মাররাকুশি, আল-মুজিব ফি তালখিসি আখবারিল মাগরিব, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৮)

এই নারী ওয়াররাকদের একটি বিশেষ স্মৃতি ইতিহাসে সংরক্ষিত আছে। ১৯২৮ সালে ইরাকি লেখক আবদুল লতিফ জালবি বাগদাদের হায়দারখানা মসজিদের গ্রন্থাগারে আবু নাসর আল-জাওহারির অভিধান আস-সিহাহ-র একটি পাণ্ডুলিপি দেখেছিলেন, যা হিজরি ষষ্ঠ শতকে মরিয়ম বিনতে আবদুল কাদের নামের এক নারী অনুলিপি করেছিলেন।

কিতাবের শেষ পাতায় তিনি লিখে গিয়েছিলেন—পাঠক যদি কোথাও ভুল পান তবে তাঁকে ক্ষমা করে দেন, কারণ, ডান হাতে কিতাবের জটিল শব্দ লেখার সময় তিনি বাঁ হাতে সন্তানের দোলনা দোলাচ্ছিলেন। (আবদুল লতিফ জালবি, ১৯২৮ সালের বিবরণ, বিভিন্ন আধুনিক ওয়াররাকা-ইতিহাস রচনায় উদ্ধৃত)

মুসলিম নারী ক্যালিগ্রাফারদের গল্প

রাতে পড়া যায় এমন কালি

ওয়াররাকা শিল্পের প্রসারের সঙ্গে কালি তৈরির রসায়নেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছিল। ওয়াররাকেরা কালো কালির পাশাপাশি সোনা-রূপার গুঁড়ো মিশিয়ে বিশেষ স্বর্ণাক্ষরের কালিও তৈরি করতেন, যা মূল্যবান পাণ্ডুলিপি বা উপহারের কিতাবে ব্যবহৃত হতো।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উদ্ভাবনের বিবরণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক আল-সাফাদির বর্ণনায়। তিনি লিখেছেন, মরক্কোর এক ব্যক্তি আইয়ুবি সুলতান আল-কামিলের (মৃ. ৬৩৫ হি.) দরবারে একটি সাদা কাগজ পাঠিয়েছিলেন, যার লেখা প্রদীপের আলোয় রূপালি, সূর্যের আলোয় সোনালি এবং ছায়ায় সাধারণ কালো রঙে দেখা যেত। (আল-সাফাদি, আয়ানুল আসর ওয়া আওয়ানুন নাসর, দামেস্ক: দারুল ফিকর)

বাগদাদের ওয়াররাক–বাজারটি শুধু বইয়ের কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং ছিল কবি-দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের নিয়মিত মিলনস্থল, যেখানে নতুন বইয়ের সমালোচনা ও বিতর্ক হতো।

লিপিকারদের মিলনমেলা

বাগদাদের ওয়াররাক–বাজারটি শুধু বইয়ের কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং ছিল কবি-দার্শনিক-বিজ্ঞানীদের নিয়মিত মিলনস্থল, যেখানে নতুন বইয়ের সমালোচনা ও বিতর্ক হতো।

ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাভি এ ধরনের ওয়াররাক-বাজারের উল্লেখ করেছেন, যা তখনকার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। (হামাভি, মুজামুল বুলদান, বৈরুত: দার সাদির, ১৯৯৫)

প্রকাশনাশিল্পের ওপর নৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণও ছিল। ইমাম তাজুদ্দিন আস-সুবকি ওয়াররাকদের জন্য একটি নৈতিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন—যা ছিল নিছক অর্থের লোভে সমাজে ক্ষতিকর বা অনৈতিক বিষয়বস্তুর বই প্রকাশ না করার আহ্বান। (সুবকি, মুঈদুন নিয়াম ওয়া মুবিদুন নিকাম, কায়রো)

ইসলামি সভ্যতার এই ওয়াররাকা বা প্রকাশনাশিল্প নিছক বই তৈরির কারখানা ছিল না, এটি ছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চা, কর্মসংস্থান এবং আন্তধর্মীয় সহযোগিতার একটি জীবন্ত ক্ষেত্র।

মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের বহু আগেই মুসলিম বিশ্বে যে পাঠ-সংস্কৃতি ও অনুলিপিশিল্প গড়ে উঠেছিল, তা মধ্যযুগীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মুসলিম সভ্যতায় কৃতী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা দেওয়া

Read full story at source