দুধ খেলে কি আসলেই হাড় মজবুত হয়
· Prothom Alo

হাড় শক্ত আর সুস্থ রাখতে প্রতিদিন দুধ খেতে হবে। ছোটবেলাই সবাই এই কথা শুনে বড় হয়েছি। বড় বড় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো হয়েছে সুস্থ থাকার জন্য দুধ খেতেই হবে। এই ধারণার পেছনের মূল কারণটি ছিল ক্যালসিয়াম। আমাদের শরীরের হাড় মূলত ক্যালসিয়াম দিয়েই তৈরি হয়। আর এক কাপ খাঁটি দুধে প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। তাই সবাই ধরে নিয়েছিল প্রতিদিন নিয়ম করে দুধ খেলে হাড়ের পুষ্টি নিয়ে আর কোনো চিন্তা থাকবে না।
কিন্তু আসলেই কি বিষয়টি এত সহজ? হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও পুষ্টিবিজ্ঞানী ওয়াল্টার উইলেট এই প্রচলিত ধারণা নিয়ে একটু ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন এত দুধ খাওয়ার এই কথাটি আসলে খুব অল্প সময়ের কিছু গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। আর এই প্রচারণাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থের।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
পুষ্টির জন্য সবার যে গরুর দুধ পান করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেইস্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানী ও মেডিসিনের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার গার্ডনার এই বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ তাদের শরীর গরুর দুধ সহ্য করতে পারে না। তাই পুষ্টির জন্য সবার যে গরুর দুধ পান করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে হাড় ও শরীরের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাদের শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের দুধ নিয়মিত খাওয়া প্রয়োজন। তবে ক্যালসিয়ামের জন্য কেবল গরুর দুধের ওপর নির্ভর না করে এর চেয়েও অনেক পুষ্টিকর ও চমৎকার কিছু বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে।
দুধ সাদা, কিন্তু মাখন হলুদ কেনঅধ্যাপক ক্রিস্টোফার গার্ডনার জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা রয়েছে। অর্থাৎ তাদের শরীর গরুর দুধ সহ্য করতে পারে না।
হাড়ের সুরক্ষায় দুধের আসল ভূমিকা কতটুকু?
আমাদের শরীর, হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখতে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত জরুরি। তবে দৈনিক ঠিক কতটুকু ক্যালসিয়াম প্রয়োজন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশিকায় যেখানে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়ামের কথা বলা হয়। সেখানে যুক্তরাজ্যে পরামর্শ দেওয়া হয় মাত্র ৭০০ মিলিগ্রামের।
আমাদের শরীরে প্রচুর ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। এই ধারণাটি মূলত স্বল্পমেয়াদী কিছু গবেষণার ফল। দেখা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে দুধের ওপর হওয়া গবেষণাগুলোর এক তৃতীয়াংশেরই অর্থায়ন করেছিল দুগ্ধ শিল্পের কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ, ব্যবসায়ের প্রসারের জন্য দুধের এই অতিরিক্ত প্রচার চালানো হয়েছিল তখন।
বেশি দুধ পানের সঙ্গে হাড় ভালো থাকার সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনিগবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা দুধ খেলে হাড়ের ঘনত্ব মাত্র ৩ শতাংশ বাড়ে, যা হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে তেমন ভূমিকা রাখে না। এমনকি ২০২০ সালের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব দেশে মানুষ সবচেয়ে কম দুধ খায়, সেখানে হাড় ভাঙার হারও সবচেয়ে কম। বেশি দুধ পানের সঙ্গে হাড় ভালো থাকার সরাসরি কোনো প্রমাণ মেলেনি।
দুধ হাড়ের জন্য কতটা উপকারী তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, হাড় শক্ত রাখতে শুধু দুধ পানের চেয়ে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যতালিকা অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে দুধ কি খেতেই হবেদুধের বাইরেও টোফু, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার রস ও বাদামের দুধ থেকে ভালো পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
কারও কি অন্যদের চেয়ে বেশি দুধ বা ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হতে পারে?
৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী বাড়ন্ত শিশু কিশোর এবং ৫০ ঊর্ধ্ব প্রবীণদের হাড়ের সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হলে তরুণ বয়সে শরীর খাবার থেকে বেশি পুষ্টি নেয়। তবে বয়স বাড়লে এই ক্ষমতা কমে যায়। তখন শরীর হাড় থেকে ক্যালসিয়াম টানা শুরু করে, ফলে হাড় দুর্বল ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
অস্ট্রেলিয়ায় ৭ হাজার বয়স্ক মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন তিন বেলা দুগ্ধজাত খাবার খেয়েছেন, তাদের হাড় ভাঙার ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ১১ শতাংশ কমে গেছে। এদের হাড় ও পেশীর গঠনও অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।
টোফু, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার রস ও বাদামে দুধ থেকে ভালো পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়দুধে প্রোটিন ও পটাশিয়াম সহজে পাওয়া গেলেও এটিই একমাত্র উৎস নয়। দুধের বাইরেও টোফু, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সবুজ শাকসবজি, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলার রস ও বাদামে দুধ থেকে ভালো পরিমাণে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
দুধ গরম হলে উপচে পড়ে, কিন্তু পানি পড়ে না কেনঅস্ট্রেলিয়ায় ৭ হাজার বয়স্ক মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন তিন বেলা দুগ্ধজাত খাবার খেয়েছেন, তাদের হাড় ভাঙার ঝুঁকি ৩৩ শতাংশ কমে গেছে।
দুধের চেয়েও সেরা বিকল্প হলো দই বা পনিরের মতো খাবার। এগুলো পেটের জন্য উপকারী, ল্যাকটোজের সমস্যা থাকলেও সহজে হজম হয়। আর হাড় ভাঙার ঝুঁকি কমাতে দুধের চেয়ে বেশি কার্যকর। এমনকি মাত্র দেড় আউন্স চেডার চিজ থেকেই এক কাপ দুধের সমান ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দুধ ভালো লাগলে অবশ্যই খাবেন। আর পছন্দ না হলে বা শরীরে না সইলে নির্দ্বিধায় অন্য বিকল্প খাবার বেছে নেবেন।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসআনারস ও দুধ একসঙ্গে খেলে কি মৃত্যু হতে পারে