‘বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি’

· Prothom Alo

সন্ধ্যা তখন কেবল নেমে এসেছে। হঠাৎই হোয়াটসঅ্যাপে একটি অডিও বার্তা আসে। বার্তা প্রেরণকারীর কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক। অডিও বাটনে ক্লিক করতেই শোনা গেল—‘বাড়িটা ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠল, এখনো কাঁপছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভ্যালেন্তিনা ওরোপেজাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন তাঁর বোন ভেরোনিকা। ভেরোনিকা তখন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে, মায়ের সঙ্গে। ভ্যালেন্তিনা যুক্তরাষ্ট্রে বিবিসির সাংবাদিক।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

বোনের পাঠানো অডিও বার্তা পেয়ে ভ্যালেন্তিনা বলেন, ‘তখনো জানতাম না, কারাকাসের মানুষ কয়েক মুহূর্ত আগে শক্তিশালী এক ভূমিকম্পের ধাক্কা অনুভব করেছে।’

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টার পর শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হানে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলেছে, পরপর শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

এ পর্যন্ত ৩২ জন নিহত ও প্রায় ৭০০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ হতাহতের এই সংখ্যা জানিয়েছেন।

দূরদেশে থেকে বোনের এমন ভীতিকর বার্তা পেয়ে নিজের মনের অবস্থা প্রকাশ করতে গিয়ে ভ্যালেন্তিনা বলেন, ‘অডিও বার্তাটি শোনার পরপরই ভেরোনিকাকে ফোন করি। কোনো সাড়া নেই। আবার ফোন করি। এবারও না। মায়ের ফোনেও একই অবস্থা। পরবর্তী দুই ঘণ্টা ভেরোনিকা ও মা আমার ফোনকলের কোনো জবাব দেয়নি। একসময় উদ্বেগ ধীরে ধীরে আতঙ্কে রূপ নিতে শুরু করে।’

এর মধ্যেই কারাকাসের সাংবাদিকদের একটি চ্যাট গ্রুপে ভূমিকম্পের খবর দেখতে পান ভ্যালেন্তিনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্ষয়ক্ষতির ছবি ও ভিডিও। এরপর এক বন্ধু তাঁকে একটি ভিডিও পাঠান। সেখানে দেখা গেছে, লস পালোস গ্রান্দেস এলাকার একটি ভবন মুহূর্তেই ধসে পড়েছে। যেন বিস্কুটের মতো ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে।

ভিডিওটি দেখেই যেন বুক ধক করে ওঠে ভ্যালেন্তিনার। তিনি বলেন, ‘ভবনটি দেখেই আমি চিনতে পেরেছি। মা ও বোন ভেরোনিকা যেখানে থাকে, সেখান থেকে ভবনটি মাত্র কয়েক মিটার দূরে।’

এরপর শুরু হয় ভ্যালেন্তিনার অপেক্ষা। মুঠোফোনের পর্দায় আসতে থাকে একের পর এক নোটিফিকেশন। কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, কোথাও উদ্ধারকর্মীরা ছুটছেন ধ্বংসস্তূপের দিকে। এসব দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তিনি। দুই ঘণ্টা ধরে মা ও বোন ভেরোনিকার কোনো খবর নেই। তাঁদের খবর জানার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠেন তিনি।

বিদেশে থাকা অসংখ্য মানুষের মতো ভ্যালেন্তিনা তখন শত শত কিলোমিটার দূর থেকে অসহায়ভাবে ফোনকলের অপেক্ষা করছিলেন। অবশেষে প্রায় দুই ঘণ্টা পর ভেরোনিকার কাছ থেকে ফোন আসে। ইন্টারনেট সংযোগ ফিরে পাওয়ার পরই তিনি যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন।

ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবন থেকে বের করে আনা হচ্ছে আহত এক নারীকে। কারাকাস, ভেনেজুয়েলা, ২৪ জুন

‘বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি’—ফোন কেটে দেওয়ার আগে কেবল এতটুকু কথাই ভ্যালেন্তিনাকে বলতে পেরেছিলেন ভেরোনিকা। এরপরই ফোন রেখে দেন তিনি।

ভূমিকম্প হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু আতঙ্ক এখনো কাটেনি। ভ্যালেন্তিনা এখনো জানেন না, তাঁর পরিচিত সেই ঘর, সেই আশ্রয় এখনো দাঁড়িয়ে আছে কি না। তবে অনিশ্চয়তার মধ্যে আপাতত এটুকুই স্বস্তি—দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে অন্তত জানা গেছে, মা ও বোন দুজনই বেঁচে আছেন।

‘মনে হচ্ছিল, পুরো ভবনটি মাথার ওপর ভেঙে পড়বে’, ভেনেজুয়েলায় নিহত ৩২, আহত ৭০০

ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় কারাকাস থেকে পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে।

জোড়া ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়। তবে অল্প সময় পরই তা তুলে নেয় কর্তৃপক্ষ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিরা ভিড় করছেন। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ও রেলসেবা।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় ২০টি পরাঘাত, কেপেঁছে ব্রাজিল-কলম্বিয়াও

Read full story at source