স্বস্তিতে নেই কানাডায় রিফিউজি আশ্রয়প্রার্থীরা
· Prothom Alo

কানাডায় রিফিউজি আবেদনকারীদের এখন যে কাউকে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে প্রায় একই উত্তর আসে, ‘কেমন আর থাকব, ইমিগ্রেশনের দুশ্চিন্তায় আছি। দুই বছরের বেশি হয়ে গেল, শুনানির খবর নেই। শুনছি দিন দিন কঠিন হচ্ছে আইন। এ দেশে থাকতে পারব কি?’
তাঁদের এই দীর্ঘশ্বাস অমূলকও নয়। রিফিউজির স্রোত মোকাবিলা করতে ইমিগ্রেশনের নতুন আইনকানুনে কড়াকড়ি আনায় আর মামলার দীর্ঘসূত্রতা রিফিউজি (অ্যাসাইলাম) আবেদনকারীদের স্বস্তিতে রাখছে না। ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার এক বুক আশা নিয়ে আসা এই লোকজন হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুর্ভাবনা নিয়েই এই প্রবাসজীবন অতিবাহিত করছেন। তবে ধীরগতিতে হলেও কানাডায় রিফিউজি গ্রহণের ঘটনা এখনো নাজুক পর্যায়ে নেই। কেউ কেউ শুনানির দিনই সুখবরটা পেয়ে যাচ্ছেন। আবার এমন খবরও আছে, কেস নেগেটিভ হওয়ার পর আপিলও দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে ডিপোর্ট করে দেওয়া হয়েছে। কানাডা সরকার প্লেনের টিকিট কেটে দ্রুতই রিজেক্ট হওয়া আবেদনকারীকে পরিবারসহ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে বা দিচ্ছে। তবে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য কাজ করা ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট ও আইনজীবীরা বলছেন, যতই কড়াকড়ি হোক, বাংলাদেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আশাহত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।
Visit freshyourfeel.org for more information.
কানাডার অভিবাসন নীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতা এখন দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্যও এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে স্টুডেন্ট ও ভিজিটর ভিসার মাধ্যমে রেকর্ডসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছিল। যার পেছনে ছিল কোভিড–পরবর্তী শ্রমবাজারের চাহিদা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্য। কিন্তু অভাবনীয় সংখ্যক রিফিউজি আবেদন পড়ায় সেই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আবাসনসংকট, স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ইমিগ্রেশন ও রিফিউজি বোর্ডের (আইআরবি) ওপর পড়া একসঙ্গে আকস্মিক মামলার জট একটা অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে বিপুলসংখ্যক নতুন অভিবাসীকে ওয়েলফেয়ারের আওতাভুক্ত করা, ফ্রি চিকিৎসা, ওষুধ, ছেলেমেয়েদের শিক্ষা আর বাসস্থানের ব্যবস্থায় হিমশিম খেতে হয়েছে বা হচ্ছে কানাডা সরকারকে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ভিজিটর ভিসায় এসে রিফিউজি আবেদনকারীদের ঢেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আবাসন–সংকটে অনেককে পার্কে, বাসস্টপেজে, সাবওয়ে স্টেশনে রাত কাটাতে হয়েছে। কানাডার বড় দুটি শহর টরন্টো ও মন্ট্রিয়লকে সবচেয়ে বেশি এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে বা হচ্ছে। এ জন্য এখানকার মানবাধিকার সংগঠনগুলো ও জননিরাপত্তা বিষয়ে দৃষ্টি রাখা বিশেষজ্ঞরা ‘অবাধে’ প্রবেশের এই ঢেউকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন সরকারের বাস্তবতাবর্জিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগকে দায়ী করেছেন। এটিকে অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ বলেও সমালোচনা করেছেন তাঁরা। বিশ্ব পরিস্থিতির নানা টানাপোড়েনে কানাডার অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়। দেশটির আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় না এনে এবং নবাগতদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত না করে যাচাই-বাছাই ছাড়া ভিসা ইস্যু এই সংকটের মূল কারণ বলে কানাডার বিরোধী দল, এমনকি সরকারদলীয় অনেকেই অভিযোগ করে যাচ্ছেন।
এদিকে কোনো রকম কানাডায় পৌঁছাতে পারলেই আর কোনো সমস্যা নেই—এ আশায় অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক লোক প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ভিজিটর ভিসায় এখানে প্রবেশ করে রিফিউজি স্ট্যাটাসের আবেদন করেছেন। টরন্টোর ডানফোর্থ আর মন্ট্রিয়লের পার্ক এক্সটেনশন ও প্লামন্ডন এলাকা জমজমাট বাংলাদেশিদের পদচারণে। তাঁদের প্রায় সবাই টরন্টো ও মন্ট্রিয়লে এসে বিমানবন্দরে অথবা শহরের ভেতরে এসে রিফিউজি আবেদন করেছেন। কুইবেকে বর্তমানে প্রায় ৩৭ শতাংশ রিফিউজি আবেদনকারী অবস্থান করছেন। এ সুযোগে কানাডার ভেতরে ও বাংলাদেশে অনেকেই লোক পাঠানো বা আনা বাবদ প্রচুর অর্থ কামাই করেছেন।
সরকারি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে দৈনন্দিন ব্যয় চালানো সম্ভব নয়। ফলে দেশ থেকে অর্থ এনেও অনেককে সংসার চালাতে হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে আবার অনেকেই কাজ জুটিয়ে নিয়েছেন। অনেকে আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকতেন। তাঁদের কারও কারও প্লাম্বিং,কনস্ট্রাকশন, হেয়ার কাটিং কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁরা খণ্ডকালীন অথবা অস্থায়ী টুকটাক কাজ ভালোই পাচ্ছেন। যদিও এ দেশে এগুলোর জন্য স্কুলে যেতে হয়। কিন্তু কেসের পজিটিভ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেসব ডিপ্লোমা নেওয়াও সহজ নয়। এর মধ্যে যাঁরা মন্ট্রিয়লে এসেছেন, ভাষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কুইবেক প্রদেশে ফ্রেঞ্চ বাধ্যতামূলক থাকায় অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় মন্ট্রিয়লে নবাগতদের কাজ পাওয়া কঠিন। অনেকেই দেশে স্ত্রী, সন্তান রেখে এসেছেন। এখানে কেস হলেও এখন স্পাউস বা সন্তান স্পনসর করে আনতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মন্ট্রিয়লে এমন অনেক উদাহরণ আছে, প্রায় ছয় বছর ধরে তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের স্পনসর আটকে আছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, রিফিউজি কেসের পজিটিভ রায়ের হার ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসেও অনুমোদনের হার ছিল প্রায় একই, ৬২ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে অনুমোদনের হার একটু বেড়ে হয়েছিল প্রায় ৬৪। বর্তমানে বাংলাদেশ কানাডার রিফিউজি ক্লেইমের শীর্ষ উৎস দেশগুলোর একটি। ২০২৫ সালের শেষ ভাগে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি আবেদন মুলতবি ছিল। ফলে বাংলাদেশি কেসগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে টরন্টোর একজন ইমিগ্রেশন আইনজীবী জানান।
মূলধারার অনেকেই এই রিফিউজি স্রোত ভালোভাবে নিচ্ছে না। রিফিউজি ঢেউ সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে একদিকে অভিবাসনপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে মূলধারার নাগরিকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে পাস হওয়া বিল সি–১২ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কঠোর পদক্ষেপ সেই প্রচেষ্টারই অংশ। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই সংস্কারগুলো কি বর্তমানে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট, নাকি কানাডাকে তার অভিবাসন নীতির ভিত্তিগত দর্শন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে? আর এদিকে এসব ‘হযবরল’ অবস্থায় নবাগতদের প্রতিটি দিন কাটছে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায়।
ফেডারেল সরকার ২০২৫-২৭ ইমিগ্রেশন লেভেলস প্ল্যানে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় ধরনের অভিবাসনের সংখ্যা কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর) গ্রহণের লক্ষ্য ৩৯৫,০০০। ২০২৬ সালে ৩৮০,০০০। ২০২৭ সালে ৩৬৫,০০০।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যাতে ২০২৬ সালের মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দাদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়।
টরন্টো ও মন্ট্রিয়লের কয়েকজন ইমিগ্রেশন আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলাদেশি আবেদনকারীদের গ্রহণের হার ২০২২-২৩ সালে ৭১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে ৭৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ সালে ৫৬ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ (প্রথম ছয় মাস) ৫০ শতাংশ।
অভিবাসীরা দেশটির শ্রমবাজার ও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। ফলে বাস্তবতা হলো কানাডা এখনো রিফিউজি সিস্টেম পুরোপুরি বন্ধ করছে না। কিন্তু সময়মতো দাখিল করা শক্ত প্রমাণভিত্তিক মামলাগুলোকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কানাডা হচ্ছে উদার ইমিগ্রেশন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় বিশ্বস্বীকৃত প্রথম সারির দেশ। কানাডায় যাঁরা ঢুকে পড়েছেন এবং নিয়মিত কাজ করছেন, কোনো অপরাধে জড়িত নন, ইতিমধ্যেই সমাজের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরেছেন এবং সর্বোপরি আবেদনের কাগজপত্র ও নিজ দেশে প্রাণবিপন্নের বিশ্বাসযোগ্য বিবরণ দাখিল করতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদের রিফিউজি মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা সব সময়ই বেশি। তবে নতুন আইন অনুযায়ী কানাডায় প্রবেশের এক বছরের পর করা আবেদনগুলো সরাসরি অগ্রাহ্য করা হবে।
বলা যেতে পারে, একসময় যে দেশটি বিশ্বের কাছে সুযোগ ও আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই কানাডা আজ উদারতা ও সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।