লোডশেডিংয়ে হামলা–ভাঙচুর: বাড়তি বিদ্যুৎ চাইলেন চার সংসদ সদস্য ও আরইবি

· Prothom Alo

গরমে বাড়তি লোডশেডিং নিয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন গ্রামের মানুষ। বিশ্বকাপ খেলা দেখতে না পারায় বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ কার্যালয় ও স্থাপনায় হামলা করেছেন ক্ষুব্ধ মানুষ। নিরাপত্তা শঙ্কায় সহায়তা চেয়ে থানাকে জানিয়েছে কয়েকটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্য। লোডশেডিং নিরসনে একই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও (আরইবি)।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিবি) তথ্য বলছে, গত জুন রাত আটটায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শুধু আরইবির অধীন লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট।

তার মানে ওই সময় বিদ্যুতের ঘাটতির ৯৬ শতাংশ ছিল গ্রামাঞ্চলে।

অস্বাভাবিক লোডশেডিং নিরসনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের কাছে গত রোববার চিঠি পাঠিয়েছে আরইবি। ৮০টি সমিতির মাধ্যমে সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়, আরইবির গ্রাহকেরা ১৭ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের আওতায় থাকছেন। কোনো কোনো এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্য। লোডশেডিং নিরসনে একই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও (আরইবি)।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে টাঙ্গাইলে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ। রোববার মির্জাপুরের জামুর্কীতে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রের সামনেদোহারে ভুতুড়ে বিল ও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে পল্লী বিদ্যুতের কার্যালয় ঘেরাও করে মানবন্ধন করেছেন গ্রাহকেরা। রোববার দুপুরে উপজেলার নুরুপুর মাঠের পাশে

আরইবির চিঠিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় লোকজন ও গ্রাহকেরা উপকেন্দ্রে এসে হামলা, দায়িত্বরত লাইন ক্রুদের মারধর, অফিস ঘেরাও, অফিস ভাঙচুর, অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা, বকেয়া বিল আদায়ে বাধা সৃষ্টি ও অফিসে এসে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি প্রদান করার মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। ১০ জেলার ১৪টি স্থানে এমন অপ্রীতিকর ঘটনার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। সারা দেশে এমন ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে।

লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ–হামলা, কর্মকর্তাদের ‘হুমকি’

আরইবির চিঠিতে বলা হয়, প্রচণ্ড গরম ও বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে চাহিদা বেড়েছে। সরবরাহের ঘাটতির কারণে কোনো কোনো এলাকায় ব্যাপক লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিশ্বকাপের অধিকাংশ খেলা রাতের বেলায়, তাই রাতেও চাহিদা বেড়েছে। আগামী ২ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে লোডশেডিং বাড়ছে ও কমছে। গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্র কমেছে, বিদ্যুতের চাহিদাও কমে গেছে। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমেছে। তবে গরম বাড়লে লোডশেডিং আবার বাড়তে পারে।

চার সংসদ সদস্যের চিঠি

জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ

বিশেষ বিদ্যুৎ বরাদ্দ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর কাছে ২৮ জুন চিঠি পাঠিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। এতে বলা হয়, লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুতের গ্রাহক ও জনসাধারণের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর এলাকায় দিনে ১২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮ থেকে ৭০ মেগাওয়াট এবং রাতে ১৩১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৭২ থেকে ৮৩ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। এ সমিতির চাহিদা অনুসারে ২০ মেগাওয়াট বিশেষ বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

লোডশেডিং নিরসন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির অনুরোধ করে ২৭ জুন বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নাগরপুরে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১০ মেগাওয়াট। আর দেলদুয়ারে ২২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে করা ১৫ মেগাওয়াট। ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার ঘাটতি, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো এবং কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুদুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় গতকাল (রোববার) লোডশেডিং দিতে হয়েছে। আজ (সোমবার) উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট, চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ৩৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হবে। এটিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে। যাতে না থাকে, সেই চেষ্টা আছে। গতকাল (রোববার) খারাপ ছিল, আজ (সোমবার) উত্তরণ করা গেছে।

২৮ জুন বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে পাঠানো রাজশাহী-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আবদুল বারী সরদারের চিঠিতে বলা হয়েছে, বাগমারা উপজেলায় ২৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১২–১৪ মেগাওয়াট। এলাকায় ভয়াবহ লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে, শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একই পরিস্থিতি জানিয়ে সহায়তা চেয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে ১৮ জুন চিঠি পাঠিয়েছেন ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমর। চিঠিতে বলা হয়, ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ৫–৬ মেগাওয়াট।

উৎপাদন বাড়েনি, চাহিদা কমেছে

গতকাল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়ায় গতকাল (রোববার) লোডশেডিং দিতে হয়েছে। আজ (সোমবার) উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট, চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ৩৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হবে। এটিও কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে। যাতে না থাকে, সেই চেষ্টা আছে। গতকাল (রোববার) খারাপ ছিল, আজ (সোমবার) উত্তরণ করা গেছে।’

পিডিবি এবং পিজিবি তথ্য বলছে, রোববার দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে বেলা তিনটায়—২ হাজার ৮৮৮ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৯৫ মেগাওয়াট। গতকাল একই সময়ে লোডশেডিং হয়েছে মাত্র ২০১ মেগাওয়াট। এ সময় চাহিদা ছিল ১৩ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট। তার মানে এক দিনের ব্যবধানে চাহিদা কমেছে ২ হাজার ৭০২ মেগাওয়াট। ফলে কমেছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা।

পিডিবি সূত্র বলছে, বিদ্যুতের উৎপাদন তেমন বাড়েনি। বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ থাকা ইউনিট গতকালও চালু হয়নি। আজ সরবরাহ শুরু হতে পারে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রেও সক্ষমতার কম উৎপাদন হচ্ছে।

আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে লোডশেডিং বাড়ছে ও কমছে। গতকাল দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হওয়ায় তাপমাত্র কমেছে, বিদ্যুতের চাহিদাও কমে গেছে। এতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমেছে। তবে গরম বাড়লে লোডশেডিং আবার বাড়তে পারে।

পিডিবি সূত্র বলছে, গতকাল দিনের বেলায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। আর রোববার দিনের বেলায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে ১৪ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট। আর ওই দিন রাতে উৎপাদন করা হয়েছিল সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৩৯ মেগাওয়াট। এরপরও ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছিল।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম ঢাকায় কম দিয়ে, গ্রামে লোডশেডিং বেশি করা হচ্ছে। এ কারণে খেলা দেখতে না পেরে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এখনই লোডশেডিংমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উৎপাদনসক্ষমতা এখন প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু অধিকাংশ সময় উৎপাদন হচ্ছে ১৩–১৪ হাজার মেগাওয়াট। বকেয়া বিল ও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। শুধু রাতের বেলায় ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হচ্ছে। এ সময় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানো হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় কম দিয়ে, গ্রামে লোডশেডিং বেশি করা হচ্ছে। এ কারণে খেলা দেখতে না পেরে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। এখনই লোডশেডিংমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এটি শহর–গ্রামাঞ্চলে সহনীয় করতে হবে। বৃষ্টি হলে পরিত্রাণ মিলতে পারে। এ ছাড়া বকেয়া বিল শোধ করে কয়লা ও জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

Read full story at source