ব্রাজিলের জার্সি
· Prothom Alo

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ৭ জুলাই প্রথম আলোর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে। তখনো প্রথম আলো অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই এটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। লেখাটি প্রায় ২০ বছর পর আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
অঙ্কের শিক্ষক আবুল কালামকে মাঝেমধ্যে উঁচু ক্লাসে ভূগোল যে একেবারে পড়াতে হয় না তা নয়, রাজহাট উচ্চবিদ্যালয়ে এটি নিয়মের মধ্যেই পড়ে। ইংরেজির শিক্ষক না এলে আরবির মৌলভি সাহেব বেশ চালিয়ে নেন, পেটরোগা মতি মিয়ার হয়ে ইতিহাসটা পড়িয়ে দেন বাংলার ওয়াহিদুল গনি। কিন্তু ভূগোল পড়ালেই যে ব্রাজিল সম্পর্কে সব জানতে হবে, এমন কথা কোথায় লেখা আছে? অথচ ফুটবল নিয়ে ১০ গ্রামে হঠাৎ একটা মাতামাতি যখন থেকে শুরু হলো, এই এক মাসও তো হয়নি, ছেলে তার দিকে একটার পর একটা প্রশ্নের তীর ছুড়তে থাকল: ‘ব্রাজিলের ভাষা কী, বাবা?’ অথবা, ‘ব্রাজিলের প্রধান রপ্তানি পণ্য?’ ছেলেটি এমনিতে চুপচাপই থাকে, মা-মরা ছেলেরা যেমন হয়। তা ছাড়া একমাত্র বোনটাও স্বামীর হাত ধরে চলে গেল এক ভরা শ্রাবণের দিনে, এক বছরও হয়নি। কার সঙ্গে কথা বলবে ছেলেটি? আবুল কালাম শুনেছেন, বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে যাচ্ছে। তা যাক, কিন্তু এ নিয়ে এত পাগলামি কেন? রাত-দিন মানুষের মুখে আর কোনো কথা নেই। কে জিতবে, ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা? বাজারের চা-দোকানি অমল মিত্তির, যার বয়স সত্তরের এক দিনও কম নয়, সেও কিনা তাকে প্রশ্ন করেছে, মাস্টার সাহেব, আপনি কোন দলের? তিনি বিরক্ত হয়ে তার দোকানে বিকেলের চা খেতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু অমল মিত্তিরের দোকানে না হয় না-ই গেলেন, তার প্রশ্নও শুনতে হলো না, কিন্তু ছেলের বেলায় কী করেন? সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে ছেলেটার অভিমানী চোখ তিনি দেখে এসেছেন। প্রথম অভিমানটা মাকে নিয়েই। কখনো মুখে বলেনি, কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবুল কালাম অভিমানটা পড়েন। অনেকগুলো কেন দিয়ে সেটি সাজানো। খুবই সূক্ষ্ম, যেন একটু টোকা লাগলেই ১০০ ফোঁটা পানি হয়ে ঝরে পড়বে। আবুল কালাম ছেলের চোখকে অবহেলা করতে পারেন না। তিনি বললেন, বাবা, দুটো দিন সময় দে। সব উত্তর দেব।
Visit turconews.click for more information.
পরদিন তিনি ওয়াহিদুল গনিকে সঙ্গে করে নড়াইল গেলেন। অনেক খুঁজে পেতে জাহান ভূ-চিত্রাবলী আর কত দেশ, কত দিগন্ত কিনলেন। ওয়াহিদুল গনি অকৃতদার, তদুপরি বিশ্বপর্যটক। শীতের মৌসুমে সাইকেল নিয়ে নড়াইল নয়তো দৌলতপুর চলে যান। যখন ফিরে আসেন, বাবলুর জন্য কত কী যে নিয়ে আসেন—পেন্সিল শার্পনার, স্ট্যাপলার, কলম। ছেলেটির আবার এসব জিনিসে দারুণ শখ।
বাবলু—আবুল কালামের ছেলে—বাবাকে বলে, বাবা, তুমি যখন নড়াইল-টড়াইল যাও, গনি চাচার সঙ্গে যাবে, আর কারও সঙ্গে না। ব্যস। বুঝেছো?
বাবার জন্য ছেলেটার খুব টান। কিছুটা ভয়ও। কালাম সাহেবের রক্তে গ্লুকোজ কমে গেলে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওয়াহিদুল গনি আবার হাকিমি চিকিৎসা জানেন। তিনি সঙ্গে থাকলে বাবা দূরে গেলেও ছেলেটা ভরসা পায়।
লেখাটি ‘প্রথম আলো’র ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে এভাবেই প্রকাশিত হয়েছিলঅনেক রাতে ছেলের বিছানায় বসে আস্তে তার মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন আবুল কালাম। ছেলেটা যখন ঘুমায়, তখন এত নিঃসঙ্গ লাগে, যেন পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র জীবিত মানুষ, বাকিরা সব ছায়া। ছেলের চুলগুলো কী নরম, যেন পশমের লোম। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে তার বুক, চোখের কোণ চিকচিক করছে, যেন একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে সেখানে, এখন পানি সরে গেলেও ছায়াটুকু রয়ে গেছে। তিনি আস্তে ডাকলেন, ‘বাবা।’
২.
কিন্তু আজ দুই দিন আবুল কালাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন—প্রথমে নড়াইল, সেখান থেকে দৌলতপুর হয়ে খুলনা—একা, তার সঙ্গে ওয়াহিদুল গনি বা অন্য কেউ নেই। তিনি বেরিয়েছেন ব্রাজিলের একটা জার্সি কিনতে, কিন্তু নড়াইলে পাননি, দৌলতপুরেও না। এখন খুলনা এসেছেন। খুলনায় ঝিম ধরা দুপুর লেগেছে, তিনি রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানে বসে এক কাপ চা খাচ্ছেন, সঙ্গে একটা বিস্কুট। সারা দিনে এই তার খাদ্য ও পানীয়। কিন্তু তার খারাপ লাগছে না। কেননা তিনি জার্সির সন্ধান পেয়েছেন। রাস্তার উল্টো দিকে একটা শপিং সেন্টার, সেখানে এক দোকানে ঝকঝকে জার্সি বিক্রি হচ্ছে। তবে সবই বড় সাইজের। ছেলের গায়ের মাপের জার্সি এসে পৌঁছাবে একটু পরেই, দোকানি জানিয়েছে, কালাম সাহেব যদি একটু অপেক্ষা করেন। তিনি অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করতে করতে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলেন, চোখটা হয়তো বন্ধ হয়েছিল। তিনি দেখলেন, বাবলু উত্সাহ নিয়ে প্রচুর লাফাচ্ছে। গায়ে হলুদ জার্সি। কালাম সাহেবের আনন্দ হলো। যাক, জার্সিটা তাহলে মাপমতো হয়েছে। তক্ষুনি তার খেয়াল হলো, যাহ্, জার্সিটা এখনো হাতে পাননি। কিন্তু পেতে কতক্ষণ?
জাহান ভূ-চিত্রাবলী আর কত দেশ, কত দিগন্ত-র ওপর নির্ভর করে আবুল কালাম ছেলের ১০০টা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। একটা বড় ট্রেসার কাগজে ব্রাজিলের ম্যাপটা তুলে দিয়েছেন, তাতে ছেলে লাল-নীল রঙ লাগিয়ে টেবিলের ওপর দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে। ওয়াহিদুল গনি কালিয়া থেকে ঢাকার কিছু দৈনিক কিনে এনেছেন, দু-একটা ম্যাগাজিনও। সেগুলোয় পাতাজুড়ে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের ছবি। কোনোটা রঙিন, কোনোটা সাদা-কালো। বাবলু সেগুলো কেটে কেটে সারা ঘরের দেয়াল ঢেকে দিয়েছে। দেয়াল বলতে বাঁশের বেড়া। এখন তার ঘরটা দেখলে মনে হবে যেন কোনো খবরের কাগজের ক্রীড়া সাংবাদিকের অফিস।
এ কথাটা অবশ্য আমাদেরই মনে হলো, কালাম সাহেব যেহেতু কোনোদিন কোনো খবরের কাগজের অফিস দেখেননি।
বাবলুর পড়াশোনা নিয়ে আবুল কালাম খুব উদ্বিগ্ন। ক্লাস নাইনে পড়ে, ছাত্র হিসেবে ভালো, এইটে বৃত্তি পেয়েছে। কিন্তু এত খেলা-খেলা করলে পড়াশোনার কী হবে? এই উদ্বিগ্নতার কথাটি ছেলেকে বলতেই তার চোখ মেঘে ঢেকে গেল। বাবাকে রোনালদো আর কাফুর ছবি দেখিয়ে সে ব্রাজিলের কাপ জেতার সম্ভাবনাগুলো বোঝাচ্ছিল। হঠাৎ বাবার প্রশ্নে সে পুরোনো একটা অভিমানের টান অনুভব করল। ‘আমি তো আমার পড়াগুলো বিকেলেই শেষ করেছি, বাবা।’
‘সারা বিকেল তো মাঠেই থাকলি, পড়লি কখন?’
সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে ছেলেটা তার অভিমানকে কখনো তরল হয়ে ঝরে পড়তে দেয়নি। আজও দিল না, শুধু রোনালদো আর কাফুর ছবিটা দুমড়েমুচড়ে ফেলে দিয়ে পড়ার টেবিলে একটা বই খুলে বসল।
আবুল কালাম খুব বিপন্ন বোধ করলেন। তিনি জানেন, এ ছেলেকে এই টেবিল থেকে নড়ানোর সাধ্য তার নেই। রাতে খাবে কি না, সে নিশ্চয়তাও নেই। এখন তার কাছে বসে থাকলে যা, আড়ালে থাকলেও তা। এখন তার চোখ থাকবে সামনের খোলা বইটিতে, কিন্তু থাকবেও না আবার। সে চোখ ফিরে যাবে পাঁচ বছর বয়সের এক অঘ্রানের দিনের বোঝা-না বোঝার, জানা-না জানার মাঝখানের বিমূঢ় ওই সময়টিতে, যখন তার হাত গলিয়ে কিছু স্মৃতি কিছু গন্ধ চিরতরে বিদায় নিয়েছিল এবং সেই বিশাল বঞ্চনার উত্তর খুঁজতে গিয়ে তার চোখজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল অমোচনীয় এক শূন্যতা। এখন সেই শূন্যতার পথ বেয়ে বেয়ে সে ঘুরে বেড়াবে—একা এবং একা। এই যাত্রায় না বাবা, না বুবু, কেউ তার সঙ্গী হতে পারবে।
আবুল কালাম দাওয়ায় পেতে রাখা ভাঙা চেয়ারটিতে শরীর মেলে দিলেন। চেয়ারটা কেঁপে উঠল। হয়তো হড়কেও গেল সামান্য, কিন্তু তিনি বিচলিত হলেন না, শুধু দুই হাতে চোখ ঢেকে নিজের কিছু অভিমানের উত্তর খুঁজতে লাগলেন।
৩.
অনেক রাতে ছেলের বিছানায় বসে আস্তে তার মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন আবুল কালাম। ছেলেটা যখন ঘুমায়, তখন এত নিঃসঙ্গ লাগে, যেন পৃথিবীতে তিনিই একমাত্র জীবিত মানুষ, বাকিরা সব ছায়া। ছেলের চুলগুলো কী নরম, যেন পশমের লোম। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করছে তার বুক, চোখের কোণ চিকচিক করছে, যেন একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে সেখানে, এখন পানি সরে গেলেও ছায়াটুকু রয়ে গেছে। তিনি আস্তে ডাকলেন, ‘বাবা।’
বাবলুর চোখের পাতা একটু কাঁপল।
‘বাবা।’ আবার ডাকলেন আবুল কালাম।
খুব অনিশ্চিত হালকা চোখ খুলল বাবলু। একটুখানি সম্বিত্হীন সময়। তারপর জেগে উঠে বসল, ‘কী হয়েছে, বাবা?’
আবুল কালামের শেকল বাঁধা পা এবার মাটিতে সেঁধে গেল। তিনি তড়িতাহতের মতো ছুড়ে ফেললেন কাপড়টিকে। তারপর দুই হাতে বুক চাপড়াতে থাকলেন প্রবলভাবে, যেন এ রকম আঘাত করলে তার এই কদিনের জমে থাকা কষ্ট আর শূন্যতার বরফগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে জল হয়ে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জীবনের ভাটির দিকে। তার গলা থেকে একটা অমানুষের মতো গোঙানি উঠল। সেটি শুনে আমরা দৌড়ে তার কাছে গেলাম।
‘তোমাকে ব্রাজিলের একটা জার্সি কিনে দেব। এই এক সপ্তা পরের শনিবার।’
হাত দিয়ে চোখ কচলে এবার বাবার চোখাচোখি তাকাল বাবলু। ‘কী কিনে দিবে বলছ বাবা?’
‘ব্রাজিলের জার্সি।’
কিছুক্ষণ অবাক তাকিয়ে থাকল বাবলু। সন্ধ্যার অভিমানের কথাটি মনে পড়ল। কিন্তু বাবার দিকে তাকিয়ে সব অভিমান তার হাওয়া হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে বাবার কাঁধটা ধরল। তার চোখে বিকেলের ওই আলোটা ফিরে এল, যে আলোয় বসে সে বাবাকে রোনালদো আর কাফুর ছবিটা দেখাচ্ছিল। একটুখানি হাসল সে, সলাজ একটা হাসি। কিন্তু বিব্রতও হলো খানিক। কী বলবে বাবাকে?
‘এবার চল, একমুঠো ভাত খাবি। আমিও খাইনি যে।’
দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন আবুল কালাম, যেন কোলে নেবেন ছেলেকে। নিলেনও। ছেলেটি কী হালকা, যেন একটা গাংচিল। বাবলুর কেন জানি খুব কাতুকুতু লাগল। সে হঠাৎ খুব হাসতে থাকল।
আবুল কালামকেও হাসতে হলো, কিন্তু তার হাসিটা ছেলের কাঁধ আর পিঠ ভিজিয়ে দিল।
৪.
জার্সিটা একটা প্যাকেটে ভরে সারা পথ বুকের সঙ্গে ধরে বাড়ি ফিরলেন আবুল কালাম।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারা বাড়ি অন্ধকার। তিনি আস্তে তালা খুলে ঢুকলেন।
সুনসান নীরবতা। কোথাও কেউ নেই। কিছু নেই।
একটা হারিকেন জ্বালালেন আবুল কালাম। একটা চামচিকা ছিল কোনো আঁধার কোনায়। সেটি পতপত করে দু-এক চক্কর দিল। তারপর খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
ছেলের ঘরে ঢুকতে গিয়ে তার পা আটকে গেল। কী হয়েছে পায়ে, এত ভারী, যেন শেকল পরানো? দুই দিন কি খুব হাঁটতে হয়েছে, পরিশ্রম গেছে?
টেবিলের ওপর হারিকেনের আলো পড়ল। বিবর্ণ, হলুদ, মরা আলো, যেন দুই দিন কবরে ছিল হারিকেনটি। কিন্তু সেই আলোয় কী সুন্দর ভেসে উঠল ছেলের বই-খাতা, স্ট্যাপলার আর জ্যামিতি বক্স, যত্ন করে রাখা তার কলম আর পেন্সিলগুলো। যেন এইমাত্র টেবিলটি সাজিয়ে-গুছিয়ে খেলা দেখতে গেছে সে।
হঠাৎ নিচু হয়ে ব্যগ্র হাতে বাবলুর বই-খাতাগুলো ছুঁয়ে দেখতে থাকলেন আবুল কালাম। খুব হালকা স্পর্শে, যেন একটা কাগজও এদিক-সেদিক ছিটকে না পড়ে। সেই ছোটবেলা থেকে কী ছিমছাম ছেলেটি। পান থেকে চুন খসতে দেবে না। জায়গার জিনিস জায়গায়, কোনো ব্যত্যয় হওয়া চলবে না। ছেলের এই পরিপাটি স্বভাব পছন্দ ছিল না আবুল কালামের, নিজে যেহেতু অগোছালো মানুষ তিনি। কিন্তু সহ্য করতে হতো এবং আরও কঠিন যা, নিজের ঘরটিও ঠিকঠাক রাখতে হতো।
হারিকেনের আলো পড়েছে এই কদিনের জমানো ধুলোর ওপর। চোখ পড়তেই আবুল কালামের রাগ হলো। কোত্থেকে এল এত ধুলো? কেন এল?
তিনি একটি ন্যাকড়া খুঁজতে লাগলেন। ধুলোটা মুছতে হবে। ছেলেটা ধুলো একদম পছন্দ করে না।
বাবলুর বিছানায় ভাঁজ করে রাখা একটা কাপড়। গামছা-টামছা হবে হয়তো। কে রেখেছে এ কাপড়টি? হাত বাড়িয়ে কাপড়টি নিলেন আবুল কালাম। ঠিক আছে, আপাতত এটি দিয়েই মোছা যাক। কাল সকালে দেখা যাবে।
কিন্তু কাপড়টা মসৃণ, ভাঁজটা হঠাৎ খুলে গেল। আবুল কালামের চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল গাঢ় কিছু সবুজ। তার মাঝখানে একটুখানি চারকোনা হলুদ এবং হলুদের মাঝখানে নীলের মতো একটি বৃত্ত।
আবুল কালামের শেকল বাঁধা পা এবার মাটিতে সেঁধে গেল। তিনি তড়িতাহতের মতো ছুড়ে ফেললেন কাপড়টিকে। তারপর দুই হাতে বুক চাপড়াতে থাকলেন প্রবলভাবে, যেন এ রকম আঘাত করলে তার এই কদিনের জমে থাকা কষ্ট আর শূন্যতার বরফগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে জল হয়ে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জীবনের ভাটির দিকে।
তার গলা থেকে একটা অমানুষের মতো গোঙানি উঠল। সেটি শুনে আমরা দৌড়ে তার কাছে গেলাম।
৫.
আমরাই বরং আপনাদের জানাই। অথবা আমাদের নড়াইল প্রতিনিধি, একই কথা। আমাদের কাগজেই প্রথম খবরটা ছাপা হয়েছিল যেহেতু। ওই ‘তড়িতাহতের’ প্রসঙ্গ থেকেই শুরু করি। ‘তড়িতাহত হয়ে ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু’—এই ছিল শিরোনাম। নিচে ছিল, ‘রাজহাট, ১৩ জুন। এলাকার বারুইপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল কালামের একমাত্র পুত্র আবুল কাশেম, বয়স ১৪, এদিন বিকেলে পড়শি সুলতান হোসেনের বাড়ির ছাদে টেলিভিশনের এন্টেনার সঙ্গে ব্রাজিলের পতাকা ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে তড়িতাহত হয়ে মারা যায়। সে ছিল ব্রাজিলের একনিষ্ঠ সমর্থক। তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সে সুলতান হোসেনের বাড়িতে বিশ্বকাপ খেলা দেখত। সেদিন ব্রাজিলের প্রথম খেলা থাকায় সারা দিন সে উত্ফুল্ল ছিল।’
‘আবুল কাশেমের করুণ মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’ ইত্যাদি।
ঝুঁটি চুলের ছেলেটি বলল, ‘বাবলুকে ওর জার্সিটা দিন। ওটা পরে সে আমাদের সঙ্গে খেলতে যাবে। ওর ঘুম ভাঙা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব।’ ভোরের আলো ফুটছে। ব্রাজিলের জার্সি হাতে বাইরে বেরোলেন আবুল কালাম। নিজেকে একটু হালকা লাগছে। ছেলেটার জন্য এতগুলো মানুষ এসেছে। এতক্ষণ ধরে বসে আছে। আহা।
৬.
আবুল কালাম অমল মিত্তিরের চা-দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। ছেলের উত্ফুল্লতার জন্য আজ তিনি অমলের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতেও রাজি। তা ছাড়া তিনি কোন দলের সেটি তো ছেলেই নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সাইকেল চেপে ওয়াহিদুল গনি তাকে গিয়ে খবরটা দিয়েছিলেন।
৭.
ঘরের দাওয়ায় একটা চাটাইয়ে বাবুলকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। আবুল কালামের প্রথম চোখে পড়েছে, বাড়ির সামনে অসংখ্য মানুষের জটলা। অথবা পড়েওনি হয়তো। কেননা তিনি দৌড়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বাবুলের সামনে। বাবলু ঘুমাচ্ছে, তার চোখ বন্ধ। মুখে একটা লুকানো হাসি, যেন বিকেলের উত্ফুল্লতা এখনো যায়নি।
তার বুকের ওপর ভাঁজ করে রাখা সবুজ-হলুদ এক টুকরো কাপড়।
বাবলুর চোখ বন্ধ বলে আবুল কালাম বুঝতে পারলেন না, ছেলেটির কোনো অভিমান হয়েছিল কি না কারও ওপর। তিনি হঠাৎ রেগে গেলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত নিয়েই নিলে? আমাকে বিশ্বাস হলো না?’
‘আমি তো তোমার থেকেও একা,’ কেউ একজন বলল, ‘তোমার তো আমিনা আছে। আমার কে আছে?’
হাত বাড়িয়ে বাবলুকে কোলে তুলে নিলেন আবুল কালাম। কিন্তু এত ভারী ! এত ভারী কেন? যেন পুরো বাড়িটার ওজনের সমান?
৮.
হারিকেনের আলোটা কাঁপছে। হয়তো তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, কতক্ষণ ছেলের বিছানায় বসে আছেন আবুল কালাম, নিজেও জানেন না। কিন্তু উঠবেন যে, কেন? উঠে কী করবেন?
একটু শব্দ হচ্ছে, যেন কারা খোলা দরজা দিয়ে ঢুকছে। কথা বলছে।
বিপন্ন চোখে সামনে তাকালেন আবুল কালাম। হলুদ জার্সি পরা কিছু মানুষ ঢুকছে ঘরে। এরা কারা? কোত্থেকে এল?
একজন যে সামনে এল, তাকে তিনি চিনলেন, যদিও নামটা মনে করতে পারলেন না। বাবলু বলেছিল, দ্যাখো বাবা, এর সামনের দাঁতে কেমন ফাঁক। আর গোল করলে ডান হাতের তর্জনী উঁচিয়ে মাঠে ছুটে বেড়ায়। আর এই দ্যাখো, এর চুলটা কেমন ঝুঁটি বাঁধা। হ্যাঁ, সেও তো আছে, কী নাম যেন তোমার?
লোকগুলো তাদের নাম বলল।
‘কী চাই তোমাদের?’ আবুল কালাম ক্লান্ত প্রশ্ন করলেন। ঝুঁটি চুলের ছেলেটি, যে সবচেয়ে প্রিয় ছিল বাবলুর, এবার এগিয়ে এল। ‘আঙ্কেল’, সে বলল, ‘সামনে আমাদের খুব বড় খেলা। এ খেলায় জিততে হলে বাবলুকে আমাদের দরকার।’
‘ভীষণ দরকার’, একজন বলল, যাকে বাবলু কাকা বলত।
‘বাবলু ঘুমাচ্ছে।’
ঝুঁটি চুলের ছেলেটি বলল, ‘বাবলুকে ওর জার্সিটা দিন। ওটা পরে সে আমাদের সঙ্গে খেলতে যাবে। ওর ঘুম ভাঙা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব।’
ভোরের আলো ফুটছে। ব্রাজিলের জার্সি হাতে বাইরে বেরোলেন আবুল কালাম। নিজেকে একটু হালকা লাগছে। ছেলেটার জন্য এতগুলো মানুষ এসেছে। এতক্ষণ ধরে বসে আছে। আহা।
বাবলুর কবরটা তার মায়ের কবরের গা ঘেঁষে। একটাই বেড়া। তিনি বেড়া টপকে ভেতরে ঢুকলেন। জার্সিটা মেলে ধরলেন। কী ঝকমকে; হলুদ, যেন কাঁচা সোনা।
আস্তে সেটি উঁচু হয়ে থাকা কিছু নরম মাটির ওপর পেতে দিলেন। স্ত্রীকে বললেন, দেখেছ, কারা এসেছে ওকে নিতে? তোমার ছেলে এখন বিশ্বজয়ে বেরোবে।
এবার যেতে দাও