টাইটানিক ডুবিয়ে দেওয়া সেই হিমবাহের বয়স কত ছিল

· Prothom Alo

১৯১২ সালের ১৫ এপ্রিল রাত ২টা ২০ মিনিট। আটলান্টিক মহাসাগরের হিমশীতল লোনাপানিতে চিরতরে হারিয়ে যায় তৎকালীন বিশ্বের বিস্ময় আরএমএস টাইটানিক জাহাজ। কয়েক হাজার টন ইস্পাত আর মানুষের অহংকারকে চূর্ণ করে দিয়েছিল যে হিমবাহ (আইসবার্গ), সেটি আসলে কোনো সাধারণ বরফের চাঁই ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক ড্যানিয়েল স্টোনের টাইটানিকের অভিযান নিয়ে ‘সিংকেবল’ নামের বইতে উঠে এসেছে সেই ঘাতক হিমবাহের এক অবিশ্বাস্য ও নাটকীয় জীবনকাহিনি।

টাইটানিক ডুবিয়ে দেওয়া সেই হিমবাহের গল্পের শুরু আজ থেকে প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে, গ্রিনল্যান্ডের বরফঢাকা চাদরে। তখন হয়তো পৃথিবীর বুকে আধুনিক সভ্যতার চিহ্নও ছিল না। বরফচাদরের ওপর যখন তুষারপাত শুরু হয়, প্রতিটি তুষারকণা ধূলিকণাকে কেন্দ্র করে তৈরি করেছিল একেকটি জটিল স্ফটিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই তুষারস্তর জমাট বেঁধে প্রায় দুই মাইল পুরু বরফের স্তরে পরিণত হয়। প্রবল চাপে এই তুষার স্ফটিকগুলো তাদের আদি আয়তনের এক-তৃতীয়াংশে সংকুচিত হয়ে পাথরের মতো শক্ত বরফে রূপান্তরিত হয়।

Visit biznow.biz for more information.

হাজার হাজার বছর ধরে এই বরফখণ্ড বছরে প্রায় চার মাইল বেগে গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯০৯ সালের গ্রীষ্মকালে গ্রিনল্যান্ডের একটি হিমবাহ থেকে এক বিশাল বরফখণ্ড ভেঙে সাগরে পড়ে। জন্ম হয় সেই অখ্যাত কিন্তু ভয়ানক হিমবাহের। জন্মের সময় সেটি ছিল প্রায় দুই মাইল চওড়া এবং ১০০ ফুট লম্বা। বরফখণ্ডটি রোমের কলোসিয়াম বা মিসরের সব পিরামিডকে একত্রে রাখলে তার চেয়ে বিশাল আকার ধারণ করত।

১৯০৯ সালের সেই একই গ্রীষ্মে যখন সাগরে ভাসছে সেই দানবীয় বরফখণ্ড, ঠিক তখনই উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে শুরু হয় টাইটানিকের নির্মাণকাজ। হোয়াইট স্টার লাইন তাদের তিনটি বিশাল জাহাজের একটি হিসেবে টাইটানিককে তৈরি করছিল আভিজাত্য আর শক্তির প্রতীক হিসেবে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই নির্মাণযজ্ঞে ব্যয় হয়েছিল তৎকালীন বিপুল অর্থ। টাইটানিকের সবচেয়ে দামি টিকিটের দাম বর্তমান মূল্যে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের বেশি ছিল। ১৯১২ সালের শুরুতে টাইটানিক যখন নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে, তখন তার ভেতরে ছিলেন ২ হাজার ২০০-এর বেশি যাত্রী ও ক্রু। অন্যদিকে সেই নামহীন হিমবাহটি তখন আর্কটিক সাগরে তিন বছর কাটিয়ে ‘ল্যাব্রাডর কারেন্ট’ বা শীতল স্রোতের কবলে পড়ে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে আসছে।

১৮৫৭ সালে বিজ্ঞানী জন থমাস টওসন লক্ষ করেছিলেন, বছরের পর বছর প্রবল চাপে তৈরি হওয়া হিমশৈল আসলে সাধারণ পাথরের চেয়ে কোনো অংশে কম শক্ত নয়। ১৯১২ সাল নাগাদ নিউফাউন্ডল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অনেক বেশি হিমশৈলী দেখা যেত। মার্কিন কোস্টগার্ড সেই এলাকার নাম দিয়েছিল আইসবার্গ অ্যালি। সাধারণত উত্তর গোলার্ধের হিমশৈলে মাত্র ১ শতাংশ গালফ স্ট্রিমের উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় টিকে থাকতে পারে। হাজার হাজার হিমশৈলীর মধ্যে মাত্র ১টি হয়তো ৪১ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা সরাসরি ট্রান্স-আটলান্টিক জাহাজ চলাচলের পথে পড়ে। টাইটানিকের ঘাতক সেই হিমশৈল ছিল সেই হাতে গোনা কয়েকটির একটি।

ড্যানিয়েল স্টোনের লেখা টাইটানিকের অভিযান নিয়ে ‘সিংকেবল’ বই

টাইটানিক যখন ডুবছিল, তখন এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই মাইল গভীরে তলিয়ে যায়। ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মাইল বেগে সমুদ্রের তলদেশে আছড়ে পড়ে। দীর্ঘ ৭৩ বছর পর ১৯৮৫ সালে উন্নত সাবমেরিনের সাহায্যে যখন এর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়, তখন সারা বিশ্ব আরেকবার শিহরিত হয়েছিল। তবে এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এটি না ঘটার সম্ভাবনা। তিন বছর ধরে সাগরে ভাসতে থাকা সেই হিমশৈল উষ্ণ জলে এসে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছিল। আঘাত হানার সময় সেটির আয়ু বড়জোর আর এক থেকে দুই সপ্তাহ বাকি ছিল। যদি টাইটানিক এক ঘণ্টা পরে পৌঁছাত বা হিমশৈলীটি কয়েক শ ফুট দূরে থাকত, তবে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। টাইটানিক তার প্রথম যাত্রা শেষ করে স্বাভাবিকভাবেই বন্দরে ভিড়ত।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

Read full story at source