ফিফাকে ধন্যবাদ দিতেই পারেন নরওয়ের ‘দেয়াল’ নিলান্ড
· Prothom Alo
ছয় দিন ধরে তিনি বেকার। নিয়মিত আয়ের চাকরি নেই।
ফুটবলারদের জীবনে চাকরি মানে একটা ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিতে থাকা। যতক্ষণ চুক্তি, ততক্ষণই চাকরি। ৩০ জুন ওরইয়ান নিলান্ডের চাকরি চলে গেছে। স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ায় ছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী এই গোলকিপারের সঙ্গে ক্লাবটি চুক্তি নবায়ন করেনি। নিলান্ড তাই দলছুট, বেকার।
Visit librea.one for more information.
কিন্তু আজকের পর তাঁর পরিচয়টা হয়তো বদলে যাবে। ছয় দিন আগে যিনি ছিলেন ক্লাবহীন এক গোলরক্ষক, তিনি এখন বিশ্বকাপের নকআউটে ব্রাজিলকে থামানোর নায়ক। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের শেষ ষোলো থেকে বিদায়ে বড় ভূমিকা আর্লিং হলান্ডের জোড়া গোলের। কিন্তু ম্যাচটা যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের অনেকেই বলবেন—জয়ের শুরুটা নিলান্ডের গ্লাভস থেকেই।
নিউ জার্সির ম্যাচটিতে বড় এক বাঁকবদল ঘটেছে ১৪ মিনিটে। ভিএআরের সাহায্যে পাওয়া পেনাল্টি থেকে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। স্পটকিকে দাঁড়িয়েছিলেন ব্রুনো গিমারাইস। রানআপে গতি কমিয়ে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিলেন ব্রাজিল মিডফিল্ডার, কিন্তু নিলান্ড ছিলেন এককাঠি এগিয়ে। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে রুখে দেন ব্রুনোর শট। ম্যাচের শুরুতেই সেই সেভ নরওয়েকে শুধু গোল হজমের হাত থেকেই বাঁচায়নি, পুরো দলকেই দিয়েছে ব্রাজিলকে রুখে দিতে পারার আত্মবিশ্বাস।
গিমারাইসের নেওয়া পেনাল্টি শটটি প্রতিহত করেন নিলান্ডম্যাচ শেষে সেই সেভের গুরুত্ব নিয়ে নিলান্ডই বলেছেন, ‘এত তাড়াতাড়ি একটি পেনাল্টি বাঁচাতে পারলে এরপর প্রতিপক্ষের জন্য আপনাকে হারানো অনেক কঠিন হয়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে মুহূর্তটি দারুণ ছিল, তবে দলের জন্যও এটি ছিল বড় স্বস্তির। আমরা নিজেদের একটু নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে নিতে পেরেছিলাম।’
শুধু পেনাল্টি বাঁচানোই নয়, হলান্ড দৃশ্যপটে আসার আগপর্যন্ত নিলান্ডই আসলে নরওয়েকে ম্যাচে রেখেছেন। যেমন ৩১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি বাঁ দিক দিয়ে দুর্দান্ত গতিতে ঢুকে যে শটটি নিয়েছিলেন, সেটি দ্রুতই নিচে নেমে ঠেকিয়ে দেন নিলান্ড।
এরপর ৪১ মিনিটে বঞ্চিত করেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকেও। মার্তিনেল্লির পাস থেকে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা বক্সের ভেতর নিচু শট নিয়েছিলেন দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে। আবারও লম্বা পা বাড়িয়ে বল ফিরিয়ে দেন নিলান্ড।
এনদ্রিক মাঠে নামার পর যে সুযোগটি মিস করেন, তাতেও ছিল নিলান্ডের গোলকিপিং দক্ষতার ছাপদ্বিতীয়ার্ধে নিলান্ডের একটি দুর্দান্ত সেভ অবশ্য শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানে জায়গা পায়নি। কাছ থেকে ব্রুনো গিমারাইসের শট ঠেকিয়েছিলেন এক হাতে। পরে অফসাইডের বাঁশি বাজায় সেটি হিসাবের খাতায় ওঠেনি। কিন্তু নিলান্ডের প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, গোলপোস্টের নিচে অন্য এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
ম্যাচে নিলান্ডকে চেনানো সবচেয়ে মোক্ষম মুহূর্তটি আসে ৮৬ মিনিটে। নরওয়ে তখন ১-০ গোলে এগিয়ে। ব্রাজিলের আক্রমণে বল যাচ্ছিল এনদ্রিকের দিকে। কিন্তু নরওয়ের ডিফেন্ডার ক্রিস্টোফার আয়েরের গায়ে লেগে বল দিক বদলে আকাশে উঠে যায়। সবাই ভেবেছিল সেটি ডান পোস্ট ঘেঁষে জালে ঢুকবেই। পিছিয়ে যেতে যেতে ভারসাম্য হারানো অবস্থায় নিলান্ড এক হাতে বল ছুঁয়ে সেটিকে পোস্টে লাগিয়ে বাইরে পাঠান। আত্মঘাতী গোল থেকে দলকে বাঁচানোর এই সেভটি হয়তো এবারের বিশ্বকাপের সেরা সেভগুলোর একটি।
ম্যাচ শেষে নরওয়ের ফরোয়ার্ড অস্কার বব তো জয়ের সিংহভাগ কৃতিত্ব নিলান্ডকেই দিয়েছেন, ‘আমাদের দলে একজন হলান্ড আছে। কিন্তু গোলকিপারই আজ আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
ব্রাজিলের বিপক্ষে মোট ৪টি সেভ করেন নিলান্ডনিলান্ডের এই নায়ক হয়ে ওঠার গল্পটা কিন্তু নাটকীয়। কয়েক সপ্তাহ আগেও নরওয়ের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হওয়ার কথা ছিল না তাঁর। গত কয়েক মৌসুম ধরে নরওয়েজীয় ক্লাব বোদো/গ্লিমটের হয়ে দুর্দান্ত খেলছিলেন নিকিতা হাইকিন। চলতি বছর নরওয়ে তাঁকে নাগরিকত্ব দিলে ধারণা করা হচ্ছিল, জাতীয় দলের ১ নম্বর জার্সিটাও তিনিই পেয়ে যাবেন।
বয়স ৩৫ ছুঁই ছুঁই নিলান্ড সেভিয়াতেই সুযোগ পান না। পুরো মৌসুমে লা লিগায় খেলেছেন মাত্র পাঁচ ম্যাচ। নিকিতা আসা মানে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেরই কার্যত ইতি ঘটবে বলে ধরে নিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সব হিসাব বদলে দেয় ফিফার একটি সিদ্ধান্ত।
গোল করতে পারাটা ‘সৃষ্টিকর্তার উপহার’—বললেন হলান্ডইসরায়েলে জন্ম নেওয়া হাইকিন বেড়ে উঠেছেন রাশিয়ায়। দেশটির অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে দুটি ম্যাচও খেলেছেন। পরে নরওয়ের পাসপোর্ট পেলেও নর্ডিক দেশটির হয়ে খেলতে ফিফার অনুমোদন দরকার ছিল। কিন্তু মে মাসে ফিফা তাঁর আবেদন নাকচ করে দেয়।
আর হাইকিনের দরজা বন্ধ হওয়াতেই আবার খুলে যায় নিলান্ডের দরজা। অভিজ্ঞতার কারণে বিশ্বকাপে হয়ে ওঠেন দলের প্রথম পছন্দের গোলকিপার। আর সেই সুযোগই তিনি এমনভাবে কাজে লাগালেন, যাতে হয়তো তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের পরিচয়টাই বদলে যেতে শুরু করেছে।
‘নরওয়ের অনেক ছোট ছেলে-মেয়ে এই মুহূর্তটা মনে রাখবে। তারা ফুটবল খেলতে গিয়ে বিশ্বাস করবে, একদিন তারাও এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে’—ম্যাচ শেষে বলছিলেন নিলান্ড নিজেই।
নিলান্ড এখন জগতের সুখী মানুষঅবশ্য তাৎক্ষণিকভাবেই একটা প্রাপ্তি হয়ে যেতে পারে। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নতুন ক্লাবের প্রস্তাব আসতেই পারে। ম্যাচ শেষে অবশ্য এ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে হাসতে হাসতেই নিলান্ড বলেন, ‘না, এখনো ফোন দেখিনি। ডোপ টেস্টে ডেকেছে, আগে বিরক্তিকর কাজটা সেরে আসি। তবে অবশ্যই এই বিশেষ মুহূর্তটা আমাকে উদ্যাপন করতে হবে। আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ।’
ছয় দিন ধরে তিনি ঠিকানাবিহীন। এখন থেকে বিশ্বকাপের নকআউটে ব্রাজিলকে থামানোর নায়ক। এই গল্পটা লেখা হতো না, যদি নিকিতা হাইকিনকে নরওয়ের হয়ে খেলার অনুমতি দিত ফিফা।
তাই ওরইয়ান নিলান্ড চাইলে ফিফাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই পারেন।
নেইমারদের কাঁদিয়ে ইতিহাস গড়লেন হলান্ডরা