বাংলাদেশে বজ্রপাতে এত মৃত্যু কেন

· Prothom Alo

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। দিন দিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। শুধু গত এক সপ্তাহে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন ৭১ জন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই মারা গেছেন ৭২ জন। জাতিসংঘ বলছে, প্রতি বছর গড়ে তিন শ বাংলাদেশি শুধু বজ্রপাতেই মারা যান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বাংলাদেশে বজ্রপাত এতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠল? উত্তরটা একটু জটিল। আগে এর পেছনের বিজ্ঞানটা বুঝি। মেঘের ভেতরে বরফের কণা ও পানির কণা যখন প্রচণ্ড বেগে একে অপরের গায়ে ধাক্কা খায়, তখন স্থির বিদ্যুৎ তৈরি হয়। মেঘের ওপরে জমে ধনাত্মক আধান, নিচে জমে ঋণাত্মক। এই টানাটানি একসময় আর সামলানো যায় না— বিদ্যুৎ ছুটে আসে মাটির দিকে, খোঁজে সবচেয়ে কাছের পথ। একটা বজ্রপাতে বিদ্যুতের পরিমাণ থাকে ত্রিশ হাজার আম্পিয়ার পর্যন্ত, তাপমাত্রা ওঠে ত্রিশ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। পুরো ঘটনাটা ঘটে শূন্য দশমিক দুই সেকেন্ডে। মানুষ পুড়ে মরে না, মরে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে।

Visit extonnews.click for more information.

তাহলে বাংলাদেশে কেন বেশি? বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটিতে পড়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম আর্দ্র বাতাস ও হিমালয় থেকে নামা ঠান্ডা বাতাস এই দেশের আকাশে এসে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষ থেকে তৈরি হয় বিশাল কিউমুলোনিম্বাস মেঘ। মার্চ থেকে জুন, কালবৈশাখীর মৌসুমে এই প্রক্রিয়া থাকে সবচেয়ে তীব্র। সিলেট অঞ্চল এবং উত্তরের জেলাগুলোতে ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি।

বজ্রপাতে বেঁচে গেলে কী হয়
বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোর একটিতে পড়েছে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা গরম আর্দ্র বাতাস ও হিমালয় থেকে নামা ঠান্ডা বাতাস এই দেশের আকাশে এসে ধাক্কা খায়।

কিন্তু মেঘ তো সব দেশেই আছে। ফ্লোরিডায় বজ্রপাত হয়, সিঙ্গাপুরেও হয়। তবু সেখানে এত মানুষ মরে না। এক্ষেত্রে পার্থক্যটা আসলে হয় মাঠে। বাংলাদেশের কৃষক ভোরবেলা মাঠে যান, ফেরেন সন্ধ্যায়। মাঝখানে আকাশ কালো হলেও কাজ ছাড়া সহজ নয়। হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন—আশেপাশে কোনো গাছ নেই, ঘর নেই, আশ্রয় নেই। সেই মাঠে তিনিই সবচেয়ে উঁচু বস্তু। বজ্রপাত সেদিকেই আসে। চলতি বছর যারা মারা গেছেন, তাদের বেশিরভাগ এভাবেই মারা গেছেন।

জেলেদের বেলায় আরেক বিপদ। পানি বিদ্যুৎ টেনে নেয়। কাছাকাছি বজ্রপাত পড়লে সেই বিদ্যুৎ পানির ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পৌঁছে যায় নৌকা পর্যন্ত। আর গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টা হয়তো সবচেয়ে কষ্টের। মানুষ ভয় পেয়ে গাছের নিচে দাঁড়ান, ভাবেন নিরাপদ। কিন্তু বজ্রপাত গাছে আঘাত করার পর সেই বিদ্যুৎ গাছ থেকে লাফ দিয়ে আসতে পারে কাছের মানুষের দিকে। না জেনে আশ্রয় নিতে গিয়ে এমন অনেক মানুষ মরছেন।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের ঘটনা ১২ শতাংশ বেড়ে যায়। উষ্ণ বায়ু বেশি আর্দ্রতা ধরে, ঝড় হয় তীব্র। প্রতি বছর সংখ্যাটা বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের লাশ।

৭ বার বজ্রাহত হয়েও বেঁচে গেছেন তিনি!
বজ্রপাত গাছে আঘাত করার পর সেই বিদ্যুৎ গাছ থেকে লাফ দিয়ে আসতে পারে কাছের মানুষের দিকে। না জেনে আশ্রয় নিতে গিয়ে এমন অনেক মানুষ মরছেন।

২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করেছে। মাঠে বজ্র-নিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে। অনেকগুলো এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনার হাওরে যে কৃষক ভোর থেকে মাঠে থাকেন, তাঁর কাছে এখনও পৌঁছায়নি এটুকু তথ্য—বজ্রধ্বনি শোনার ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে আশ্রয় নিতে হয়, শেষ বজ্রপাতের ত্রিশ মিনিট পর বের হতে হয়।

যারা মারা যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগ না জেনে অসতর্কতায় মরছেন। এটুকু জানলে হয়তো বাঁচতেও পারতেন।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: স্ক্রিপ ওপেন এক্সেসবজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির শরীর কি দামি ম্যাগনেটে পরিণত হয়

Read full story at source