বন্যায় গহন ক্ষতি, কী ব্যবস্থা, কী করণীয়
· Prothom Alo
বৃষ্টি যেন থামতে ভুলে গেছে। সবাই এখন ভাসমান।
Visit tr-sport.bond for more information.
দক্ষিণ চট্টগ্রাম আর সাগরের মধ্যে তফাত ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ঘরবাড়ির উঠান (জমিন), খেতখামার, পুকুর, খেলার মাঠ আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই। আমরা লাশের সংখ্যা দিয়ে দুর্যোগ মাপি, সেখানেও এখন লাশের সারি।
টানা ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে এখন পর্যন্ত (১২ জুলাই)
মোট ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজার ও অন্যান্য পাহাড়ঘেরা এলাকায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাম্প্রতিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ পর্যন্ত মোট ১৩ জন শিশু মারা গেছে, যার মধ্যে ৮ জন নিশ্চিতভাবে মেয়েশিশু এবং কমপক্ষে একজন নিশ্চিতভাবে ছেলেশিশু। বাকি চার শিশুর লিঙ্গভিত্তিক বিবরণ এখনো জানা যায়নি। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলায় পানিবন্দী হয়েছেন প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ।
ক্ষয়ক্ষতি
গওহার নঈম ওয়ারাক. সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে
উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ আছে। কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন করে লোকালয়ে পানি ঢুকছে।
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু লেমশীখালী শাহজির পাড়া সেতু ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে লেমশীখালী-কৈয়ারবিল ইউনিয়ন সংযোগ সেতুটি মারাত্মক ঝুঁকিতে ছিল। এর ওপর দিয়ে কোনো যানবাহন চলাচল করত না, মানুষ পায়ে হেঁটেই চলাচল করত।
খ. কৃষির ক্ষতি
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট, হাওরাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় বোরো ও আমন ধান, আউশ বীজতলা, শাকসবজিসহ প্রায় ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ার ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আমনের বীজতলা ও সবজিখেত পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসের প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর এবং ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুরের আয়তন ৩ হাজার ২১১ দশমিক ৯২ হেক্টর এবং ঘেরের আয়তন ৯০০ হেক্টর। এতে প্রাথমিকভাবে ৯১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে।
গ. গহন ক্ষতি
ভেঙে পড়া একটি টিনের ঘরের দৃশ্য। বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নেলাশ দাফনের জায়গা নেই সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায়। শুকনা জায়গার অভাবে অনেক গ্রামে মানুষ লাশ নিয়ে ছুটছে দূর গ্রামে কোনো আত্মীয়ের শুকনা ভিটায়। এ বড় কঠিন সময়। এসব ক্ষতি মাপা যায় না। আহমদ ছফা বলতেন—‘গহন ক্ষতি’। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলায় টানা ভারী বর্ষণের বন্যায় কবরস্থানে যাওয়ার রাস্তা পানিতে ডুবে গেলে সন্তানেরা খাটিয়ায় করে মায়ের মরদেহ কাঁধে নিয়ে গলাপানি সাঁতরে কবরস্থানে পৌঁছান। এটাই ছাব্বিশের বন্যার ছবি।
পদক্ষেপ আর আক্ষেপ
পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে নিজ দায়িত্বে কথিত নিরাপদ স্থান খুঁজে নেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত উপদেশ? সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে জনপ্রতিনিধিদের। কিন্তু কারা সেই প্রতিনিধি? এক এমপি ছাড়া সবাই হয় তামাদি, না হয় অন্তরিন বা নিখোঁজ। তারপরও ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে কক্সবাজার জেলায় আমলাদের ভরসায়।
মানুষ থেমে নেই
বন্যার পানি থেকে বাঁচতে বাঁশের তৈরি ভেলায় চড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি। চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলেএই প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মানুষ কুতুবদিয়ায় ভাঙা ঘাট, রাস্তা-ব্রিজ কাজ চালানোর মতো করে মেরামতের কাজে নেমে গেছে। সন্তানসম্ভবা নারীদের উদ্ধার করা আর হাসপাতালে পাঠাতে গ্রামের মানুষ সহযোগিতা করছে। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বুকসমান বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানি মাড়িয়ে এক মুমূর্ষু সন্তানসম্ভবা নারীকে উদ্ধার করে গ্রামের মানুষের সহায়তায় হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ৯ জুলাই ভোর ছয়টার দিকে ঘটনাটি ঘটে উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ ইউনিয়নের খৈয়ারকুল গ্রামে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ওই নারী একটি সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন।
পানি নামছে না কেন?
পানি নামা না-নামার সঙ্গের জোয়ার-ভাটার সম্পর্ক আছে। কুতুবদিয়ার ছিদাম জলদাস তেমনটাই জানালেন মুঠোফোনে। ১৩ জুলাই পূর্ণ অমাবস্যা, সাগর উত্তাল থাকবে। জোয়ার স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ থাকবে কমপক্ষে ১৭ জুলাই পর্যন্ত। তবে চকরিয়া উপজেলায় বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক এবং সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো দিলেন অন্য খবর। তিনি জানালেন, অমাবস্যা, পূর্ণিমা, বৃষ্টিপাত ছাড়াও পানি নামার প্রধান প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী মানুষের লোভ। সম্প্রতি তিনি বদরখালীর ডেমশিয়া এলাকায় পাঁচটি কপাটের একটি স্লুইসগেট পরিদর্শন করেন। সেখানে দেখতে পান, স্থানীয় লোকজন কাঠের তক্তা দিয়ে মাত্র ৪ ফুট অংশ খোলা রেখে পুরো গেটটি আটকে রেখেছে।
বিষয়টি নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানানো হলে তিনি জানান, বিষয়গুলো সম্পর্কে তাঁরা অবগত আছেন। স্লুইসগেট আটকে দেওয়ায় বন্যার পানি নামতে পারছে না। মাছ চাষের জন্য খালের ওপর নির্মিত অবৈধ বাঁধের কারণে বন্যার পানি অনেক ক্ষেত্রে স্লুইসগেট পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছে না। সরেজমিন দেখে এসে আলাউদ্দিন জানিয়েছিলেন, সেখানে আগে থেকেই মাছ ধরার জাল পাতা হয়েছিল। পানির স্রোতের গতি কমাতে দখলদারেরা সরু পথ রেখেছে। প্রাথমিকভাবে মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়াকেই দায়ী করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। এ ছাড়া অবৈধভাবে নির্মিত কিছু বাঁধের কারণে বন্যার পানি নিষ্কাশনে ধীরগতির কথাও বলছেন তাঁরা।
বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টার চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পুরো অঞ্চলের স্লুইসগেটগুলো খুলে দেওয়া হলেও পরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা কিছু গেট আবার বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ, কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দোষ নন্দ ঘোষ জলবায়ু পরিবর্তনের!
করণীয়
যেকোনো মূল্যে সব স্লুইসগেট খুলে দিতে হবে। কুতুবদিয়াসহ যেসব উপকূলীয় অঞ্চলে সেতু কালভার্ট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, সেগুলোকে নিরাপদ ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ত্রাণের তালিকায় কাঁঠাল, লটকন, পাকা তাল, পেয়ারা ইত্যাদি যুক্ত করতে হবে (এটাকে বলে কাপাসিয়া মডেল। সাবেক সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি নোয়াখালীর বন্যার সময় এ রকম ত্রাণের নজির সৃষ্টি করেছিলেন।) এগুলো শিশু আর বড়দের সঙ্গে সঙ্গে গবাদিপ্রাণীর খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা মেটাতে পারে। দাম পাবে কাঁঠাল, পেয়ারার আবাদিরা।
বন্যার কারণে গর্ভবতী নারী ও শিশুর মৃত্যু এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এক চরম মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। ঝুঁকি আর সংকট এড়াতে জরুরি করণীয়:
১. আগে থেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া: গর্ভাবস্থার শেষ মাসগুলোয় বন্যা শুরু হলে পরিবারকে অবশ্যই নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা উঁচু কোনো নিরাপদ স্থানে বা আত্মীয়ের বাড়িতে রোগীকে সরিয়ে নিতে হবে।
২. জরুরি হেল্পলাইনের সাহায্য: ফায়ার সার্ভিস, সরকারি জরুরি সেবা (যেমন ৯৯৯) বা স্থানীয় দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্ধারকারী নৌকা বা অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিতে হবে।
৩. নিরাপদ পানি ও খাবার: মা ও শিশুর জন্য পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিপিএইচ) মতো সংস্থার কাছে থাকা পানি নিরাপদকরণ মেশিনগুলো ব্যবহার করতে হবে। কোনোভাবেই বন্যার দূষিত পানি ব্যবহার করা যাবে না।
৪. জরুরি প্রসব কিট (Delivery Kit) প্রস্তুত রাখা: স্কাউটস, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্ট সিপিপি স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে প্রসব কিট বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব না হলেও নিরাপদ প্রসব করানো যায়।
৫. শিশুদের কড়া নজরদারিতে রাখা: বন্যা চলাকালে শিশুদের এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করা যাবে না। কারণ, জমে থাকা অল্প পানিতেও অসাবধানতাবশত শিশুরা ডুবে যেতে পারে।
* লেখক: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী এবং বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পঞ্চাশ বছর গ্রন্থের লেখক।