টানা বৃষ্টির সঙ্গে চট্টগ্রামে বেড়েছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, প্রতিদিন ১২ জন ভর্তি হাসপাতালে

· Prothom Alo

চট্টগ্রামে চলতি জুলাই মাসে বাড়তে শুরু করেছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগ। গত জুনে স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালিত জরিপে ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। দুই সপ্তাহ ধরে ভারী বর্ষণের কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি জমায় এডিস মশার প্রজননের আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চলতি জুলাই মাসে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন গড়ে ১২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৪৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬৪ জন বা ৩৫ শতাংশই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন চলতি জুলাইয়ের প্রথম ১৩ দিনে। প্রতিদিন গড়ে ১২ জন করে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন, চিকিৎসাধীন ছিলেন ৫৮ জন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে দ্বিতীয় মৃতুটিও ঘটেছে গত শনিবার।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। পুরো বছরে আক্রান্তের ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ রোগী এই ৫ মাসে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে এই ৫ মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬৭ জন, যেখানে পুরো বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ৮৪৬। ২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই একই ধারা দেখা গেছে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে।

নগরের আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওয়ার্ডগুলো হলো উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। হাসপাতালেও এসব এলাকার রোগী বেশি।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এ বছরও সামনের দিনগুলোতে রোগী বাড়তে পারে। সাধারণত বৃষ্টি হওয়ার ২৮ দিন পর্যন্ত মশার প্রকোপ থাকে বলে ধারণা করা হয়। এ মাসে ইতিমধ্যে টানা বৃষ্টি হয়েছে, এর আগে টানা গরম পড়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। বৃষ্টি ও উচ্চ তাপমাত্রা ডেঙ্গুর বিস্তারে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদেরা। তবে সংক্রমণ কমাতে সিভিল সার্জন কার্যালয় ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, বর্তমান ডেঙ্গুর ধরন আগের চেয়ে বেশি ছদ্মবেশী। সামান্য জ্বর বা দুর্বলতার পরও হঠাৎ অবস্থার অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমার পরের তিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় প্লাটিলেট কমে যাওয়া, রক্তচাপ কমা এবং লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বমি, তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৯৫ ভাগ রোগীই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুই হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক রোগীর মধ্যে শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি শক সিনড্রোমের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। অনেকের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার উপসর্গও রয়েছে। শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হলে রোগীর রক্তচাপ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এ বছরও সামনের দিনগুলোতে রোগী বাড়তে পারে। সাধারণত বৃষ্টি হওয়ার ২৮ দিন পর্যন্ত মশার প্রকোপ থাকে বলে ধারণা করা হয়। এ মাসে ইতিমধ্যে টানা বৃষ্টি হয়েছে, এর আগে টানা গরম পড়েছে। থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। বৃষ্টি ও উচ্চ তাপমাত্রা ডেঙ্গুর বিস্তারে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদেরা।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালট্যান্ট এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, জেনারেল হাসপাতালে এখনো রোগীর চাপ বাড়েনি। এখন পর্যন্ত যাঁরা সেবা নিয়েছেন, তাঁদের সবারই জ্বর, বমি ও নিম্ন রক্তচাপ ছিল। একজন রোগী পেয়েছি, যাঁর মাড়ি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। এটিও ডেঙ্গুর উপসর্গ, তবে ডেঙ্গুর ধরন বুঝতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই নগরের। উপজেলা ও অন্যান্য জেলার রোগীরাও আসছেন। নগরের রোগীদের মধ্যে বাকলিয়া, বায়েজীদ, হালিশহর ও আন্দরকিল্লা এলাকার রোগী বেশি। এ বছর এখন পর্যন্ত জটিল রোগী পাওয়া যায়নি। যাঁরা আসছেন, তাঁদের উচ্চ জ্বর নেই। শরীরব্যথার পরিবর্তে অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, তীব্র পেটব্যথা ও ডায়রিয়া বেশি দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে ছয়জন ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজন নগরের বাসিন্দা। বাকিরা বাঁশখালী উপজেলা ও কক্সবাজার উপজেলার বাসিন্দা। জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. হৃদয় বলেন, দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি তিনি। নগরের বায়েজীদ এলাকা থেকে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তিনি। ওই এলাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে সম্প্রতি।

জুনে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শিরোনামে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে নগরের বিভিন্ন এলাকার ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশা বা ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে। মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

এ ছাড়া জরিপে নগরের আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ওয়ার্ডগুলো হলো উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। হাসপাতালেও এসব এলাকার রোগী বেশি। পাশাপাশি জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের তিনটি আন্তর্জাতিক সূচকেই চট্টগ্রামের ঝুঁকি উচ্চমাত্রায় রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০০ শয্যার নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ড করা হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালেও ২০ শয্যার ডেঙ্গু ব্লক আছে। অন্যান্য হাসপাতালেও অন্তত ১০ থেকে ১৫ বেড ডেঙ্গুর জন্য রাখতে বলা হয়েছে। আমাদের প্রস্তুতি আছে। আশা করা যায় এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু কম হবে, তবে এর জন্য জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে।’

Read full story at source