বন্যা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও বিশ্বকাপ ঘিরেই যত গুজব
· Prothom Alo

বন্যার মতো দুর্যোগ, তার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন—গত সপ্তাহে আলোচিত এই দুই ঘটনা ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে বেশি। তার সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়েও ছড়ায় নানা অপতথ্য।
গত সপ্তাহে (১১-১৭ জুলাই) বাংলাদেশের পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান মোট ১৩৮টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৪টি ছিল বন্যা নিয়ে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে ছিল ২৫টি। তার বাইরে ২০টি প্রতিবেদন ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে।
Visit newsbetting.bond for more information.
এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মোট ৮৯টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা মোট প্রতিবেদনের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফ্যাক্ট চেকই ছিল এই তিনটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রিউমর স্ক্যানার প্রকাশ করেছে ৮৮টি। এ ছাড়া ফ্যাক্ট ওয়াচ ১৬টি, দ্য ডিসেন্ট ১৫টি, ডিসমিসল্যাব ১৩টি এবং বাংলা ফ্যাক্ট ৬টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
বন্যা
টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা বন্যাকবলিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি, ভিডিও, ভিন্ন দেশের দৃশ্য, এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভুয়া তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বন্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো অপতথ্যের একটি হলো—গর্ভের সন্তানকে বাঁচাতে এক গর্ভবতী নারী গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি চট্টগ্রামের বন্যার নয়; বরং ২০২৪ সালে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ভ্রমণের সময় ধারণ করা একটি ব্যক্তিগত ভিডিও।
এ ছাড়া একটি শিশুকে বন্যার পানিতে বাঁশে ঝুলে থাকতে দেখা যাচ্ছে—এমন দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটিও পুরোনো। একইভাবে বন্যায় লাশ দাফন করা সম্ভব না হওয়ায় পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে—দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি ২০২৪ সালের ফেনীর বন্যার সময় ধারণ করা।
এ ছাড়া চট্টগ্রামের বন্যাকে কেন্দ্র করে পুরোনো বন্যার ভিডিও, বিদেশের বন্যার দৃশ্য, এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভুয়া মন্তব্য ও সাজানো ভিডিও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন
বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১৩, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্যান্য বোর্ডে পরীক্ষা চলতে থাকে। এর মধ্যে ১৩ জুলাই প্রবল বর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়েন। একই দিন পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নে ভুলের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি অডিও, যেখানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে পরীক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করতে শোনা যায়।
ওই অডিওকে কেন্দ্র করে ১৪ জুলাই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামেন। এটাকে ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ২৫টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও একই অপতথ্য নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের পৃথক ফটোকার্ড প্রকাশের কারণে শুধু ফেসবুকেই আন্দোলনসংক্রান্ত ৬৭টি ফ্যাক্ট চেক ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়।
আন্দোলনের প্রথম দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ও স্থিরচিত্র ছড়িয়ে দাবি করা হয়, একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর গলা চেপে ধরেছেন ছাত্রদলের নেতা। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওতে থাকা দুজনই ছাত্রদলের নেতা। পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে একজন তর্কে জড়িয়ে পড়লে আরেকজন তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
এ ছাড়া বিক্ষোভ চলাকালে বিএনপি, ছাত্রদল বা পুলিশের হামলায় রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন—এমন ভুয়া তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ দাবিতে পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ছবি-ভিডিও নতুন করে প্রচার করা হয়।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, শিক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নামে একাধিক ভুয়া মন্তব্যও ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপতথ্যের সূত্রপাত হয় ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে, যা পরে সত্য দাবি হিসেবে বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশনের আদলে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড এবং সম্পাদিত সংবাদচিত্রও ছড়ানো হয়েছিল।
বিশ্বকাপ ফুটবল
বিশ্বকাপ ফুটবল–কেন্দ্রিক গুজবের মধ্যে বেশি ছড়িয়েছিল ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি বক্তব্য। সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছি। আমি আশা করি, লিওনেল মেসি যেন তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিততে পারে। আমি তার বড় একজন ভক্ত।’
যাচাইয়ে দেখা যায়, এমবাপ্পে এমন কোনো মন্তব্য করেননি। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভুয়া উদ্ধৃতি, পুরোনো ভিডিও, মিথ্যা তথ্য এবং এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও। এসব কনটেন্টের অনেকগুলোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মূলধারার কিছু গণমাধ্যমেও পৌঁছে যায়, ফলে সাধারণ পাঠক ও দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়ে যায়।