বিদেশে পড়তে ১১ হাজার কোটি টাকা, পাঁচ বছরে ব্যয় দ্বিগুণ

· Prothom Alo

বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন। শিক্ষা খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

Visit newsbetting.bond for more information.

একসময় শুধু বৃত্তি পেয়ে বিদেশে পড়তে যেতেন মেধাবী শিক্ষার্থীরা, যার খরচ বহন করত সেই দেশগুলো বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর পাশাপাশি এখন নিজেরা খরচ করে সন্তানদের বিদেশে পড়াতে পাঠাচ্ছেন অনেক অভিভাবক।

বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন। কেউ কেউ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও বিদেশে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে বিদেশে শিক্ষা খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিদেশে শিক্ষার পুরো খরচই মেটাতে হচ্ছে বিদেশি বিভিন্ন মুদ্রায়। এখন আগের চেয়ে সহজে বিদেশে শিক্ষা খরচ পাঠানো যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বিদেশে শিক্ষা বাবদ বাংলাদেশ থেকে ব্যয় হওয়া অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে খরচ হয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ১০ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে)।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানআমাদের দেশে শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, তবে মানের বিস্তার হয়নি। আমাদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ সেভাবে ঘটেনি, ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। এ জন্য অভিভাবকেরা মানসম্পন্ন শিক্ষার উদ্দেশে সন্তানদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন।

আগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার জন্য ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশি যেতেন। এখন সেই তালিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, তবে মানের বিস্তার হয়নি। আমাদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ সেভাবে ঘটেনি, ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে। এ জন্য অভিভাবকেরা মানসম্পন্ন শিক্ষার উদ্দেশে সন্তানদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন।’

হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ‘এটা একধরনের আন্তর্জাতিক অঙ্গনমুখিতা, অন্যদিকে দেশীয় মানের দুর্বলতা। এটা সহজেই কমবে না। আমাদের নিজেদের জন্য শিক্ষার মানের উন্নতি ঘটিয়ে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে হবে, যাতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমে আসে।’

মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খরচ প্রায় ১০৫ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মূলত টিউশন ফি, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।

খরচ বেড়ে দ্বিগুণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতের খরচ পাঠানো দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ২ লাখ ডলার, যা পরবর্তী বছরগুলোতে নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

তবে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায় পরবর্তী দুই অর্থবছরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষার পেছনে শিক্ষার্থীদের খরচ হিসেবে পাঠানো ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ডলার এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে খরচ পাঠানো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খরচ প্রায় ১০৫ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মূলত টিউশন ফি, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবার শুধু এক সেমিস্টারের খরচ পাঠানো যায়। সেমিস্টারের ফলাফল ও পরের সেমিস্টারে উন্নীত হলেই শুধু পরবর্তী সেমিস্টারের খরচ পাঠানোর অনুমতি মেলে। এ ছাড়া জীবনযাত্রার খরচ চালানোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিত পাঠানো সম্ভব।

যেভাবে খরচ পাঠানো হয়

বিদেশে যেতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রথমে সেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এমন যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য দেশেও এখন অনেক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একজন শিক্ষার্থী বৈধভাবে কোনো বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির অফার লেটার পেলে ব্যাংকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ খুলতে পারেন। এই ফাইলের মাধ্যমে টিউশন ফি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সেই দেশে শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো যায়।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবার শুধু এক সেমিস্টারের খরচ পাঠানো যায়। সেমিস্টারের ফলাফল ও পরের সেমিস্টারে উন্নীত হলেই শুধু পরবর্তী সেমিস্টারের খরচ পাঠানোর অনুমতি মেলে। এ ছাড়া জীবনযাত্রার খরচ চালানোর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিয়মিত পাঠানো সম্ভব।

এ ধরনের সেবা দেওয়ার তালিকায় শীর্ষে আছে ব্র্যাক ব্যাংক। বিদেশে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের সেবা দিতে ব্যাংকটির রয়েছে আগামী নামে বিশেষ সেবা। ব্যাংকটির এই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহরুবা রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ৩৭টি শাখায় এই সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকায় তিনটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি মাসে আমরা ২০০০-২৫০০ হিসাব খুলছি। ঢাকার পরই সিলেট ও চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা বেশি যাচ্ছেন। এখন নিউজিল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে বেশি যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।’

কী এই স্টুডেন্ট ফাইল

স্টুডেন্ট ফাইল হলো বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের জন্য একধরনের বিশেষ ব্যাংক হিসাব। এই হিসাব ব্যবহার করে সহজেই টিউশন ফি ও থাকা-খাওয়ার খরচ বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীর কাছে পাঠানো যায়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে অনেক ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড দেওয়া হয়, যা ব্যবহার করে তিনি বিদেশে নিজের খরচ মেটাতে পারেন। এ ছাড়া কিছু ব্যাংক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য ঋণও দিয়ে থাকে। ভিসা হওয়ার পরই এই স্টুডেন্ট ফাইল খোলার আবেদন করতে হয়।

ব্যাংকভেদে শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের স্টুডেন্ট ফাইল খোলার খরচ ভিন্ন হয়। তবে মোটাদাগে, এই খরচ ১০ হাজার টাকার মধ্যেই থাকে। কিছু ব্যাংকে এই সেবা দেওয়ার জন্য পৃথক বুথ বা বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক দিনে দিনেই এই হিসাব খোলার সুযোগ দিচ্ছে। এই সেবায় এগিয়ে আছে প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এ ছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোও এই সেবা দিচ্ছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের বিশেষ সেবা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহরুবা রেজা আমাদের ৩৭টি শাখায় এই সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকায় তিনটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। প্রতি মাসে আমরা ২০০০-২৫০০ হিসাব খুলছি। ঢাকার পরই সিলেট ও চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা বেশি যাচ্ছেন। এখন নিউজিল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে বেশি যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

ফাইল খুলতে যা যা প্রয়োজন

স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে শিক্ষার্থীর নাম ও ছবির পাশাপাশি কোর্সের সময় উল্লেখ করে বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইস্যুকৃত অফার লেটার জমা দিতে হয়। এ ছাড়া টিউশন ফি ও থাকা-খাওয়ার খরচের বিবরণ এবং বাংলাদেশে শেষ করা শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ দিতে হয়। অভিভাবকের বিবরণ ও পাসপোর্টের অনুলিপির পাশাপাশি আরও জমা দিতে হয় আবেদনকারী শিক্ষার্থীর ভিসার কপি। আবেদনের জন্য আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ফরম। এই স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে হলে নির্দিষ্ট ব্যাংকে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের একটি ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। হিসাব না থাকলে নতুন করে তাঁদের নামে হিসাব খুলতে হয়। কারণ, অভিভাবকদের মূল হিসাব থেকেই স্টুডেন্ট ফাইলে অর্থ স্থানান্তর করা হয়।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দারপ্রতি মাসে ৮০০ থেকে এক হাজার স্টুডেন্ট ফাইল আমরা খুলছি। সহজে এই সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। একসময় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বেশি ফাইল খোলা হতো। এখন দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের জন্য বেশি ফাইল খোলা হচ্ছে।

এদিকে বিদেশে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স ফি পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিক্ষার্থীদের ফি পাঠানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগাম অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অরূপ হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতি মাসে ৮০০ থেকে এক হাজার স্টুডেন্ট ফাইল আমরা খুলছি। সহজে এই সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে। একসময় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য বেশি ফাইল খোলা হতো। এখন দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের জন্য বেশি ফাইল খোলা হচ্ছে।’

Read full story at source