বিশ্বকাপ ট্রফি কি আসলেই সোনার? ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কেন এক ইতালীয় প্রতিষ্ঠানই বানাচ্ছে এই ট্রফি

· Prothom Alo

আজ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ৯০ মিনিট কিংবা তার বেশি সময়ের লড়াই শেষে যে মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে থাকে কোটি কোটি মানুষ, সেটি হলো বিজয়ী অধিনায়কের হাতে সোনালি ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্য। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ছবিগুলোর একটি যেন এই মুহূর্তই। কিন্তু এই ট্রফি কি সত্যিই খাঁটি সোনার? আর কেন অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে এক ইতালীয় প্রতিষ্ঠানই এটি তৈরি করে আসছে?

বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কারের পেছনের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়।
বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই যেন সময় থমকে যায়। গ্যালারিতে উচ্ছ্বাস, মাঠে আনন্দাশ্রু, আর কোটি কোটি দর্শকের চোখ তখন একটিমাত্র দৃশ্যের দিকে—বিজয়ী অধিনায়কের দুই হাতে উঠে আসা সোনালি ট্রফি। ফুটবলের ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা দেশ আলাদা হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপ ট্রফির মাহাত্ম্য সবার কাছেই এক। তবে এই ট্রফি নিয়ে কৌতূহলেরও শেষ নেই। এটি কি সত্যিই খাঁটি সোনার? বিজয়ী দল কি আসল ট্রফিটিই নিজেদের কাছে নিয়ে যায়? আর কেন গত অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে এক ইতালীয় প্রতিষ্ঠানই তৈরি করে আসছে ফুটবল–বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কার?

Visit bettingx.club for more information.

সত্যিই কি সোনার তৈরি?

টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপ ট্রফিটিকে যতটা ছোট মনে হয়, বাস্তবে সেটি ততটাই ভারী। আর সেই ওজনের বড় একটি কারণ এর নির্মাণসামগ্রী। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি। এর উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার, ব্যাস ১৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬.১৭৫ কেজি। নিচের অংশে বসানো আছে দুটি সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের রিং, যা ট্রফিটির নকশায় যোগ করেছে আলাদা সৌন্দর্য।

অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপ ট্রফিটি শুধু সোনার প্রলেপ দেওয়া, বাস্তবে তা নয়। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি। তবে পুরোপুরি নিরেট সোনার নয়। কারণ, একই আকৃতির একটি ট্রফি যদি সম্পূর্ণ নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি করা হতো, তাহলে তার ওজন এতটাই বেড়ে যেত যে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের পক্ষে সেটি মাথার ওপরে তুলে ধরা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ত।

তবে এই ট্রফির প্রকৃত মূল্য সোনায় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় মুহূর্ত, অসংখ্য কিংবদন্তির স্বপ্নপূরণ আর কোটি মানুষের আবেগ। তাই বিশ্বকাপ ট্রফির মূল্য ধাতুর বাজারদর দিয়ে নয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মর্যাদার মাপকাঠিতেই বিচার করা হয়।

আজ যে ট্রফিটিকে আমরা চিনি, সেটি কিন্তু বিশ্বকাপের শুরু থেকেই ছিল না। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপে দেওয়া হতো জুলে রিমে ট্রফি। ফিফার সাবেক সভাপতি জুলে রিমের নামেই এর নামকরণ। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুরের নকশায় তৈরি ওই ট্রফিতে ছিল প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকির অবয়ব। সে সময়ের নিয়ম ছিল, কোনো দেশ যদি তিনবার বিশ্বকাপ জেতে, তবে তারা ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার পর জুলে রিমে ট্রফিটি তাদের স্থায়ী সম্পদ হয়ে যায়। এরপরই নতুন ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা।

৫৩টি নকশার মধ্যে যেটি জিতে নিয়েছিল বিশ্ব

নতুন ট্রফির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নকশা আহ্বান করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের কাছ থেকে জমা পড়ে ৫৩টি নকশা। শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হয় ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাৎসানিগার নকশা। সে সময় তিনি ইতালির বিখ্যাত ট্রফি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জিডিই বের্তোনিতে কর্মরত ছিলেন। গাৎসানিগার নকশায় দেখা যায়, দুটি মানব অবয়ব পৃথিবীকে উঁচিয়ে ধরে আছে। তাঁর ভাষায়, এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে তিনি বিজয়ের উচ্ছ্বাস, মানুষের শক্তি এবং বিশ্বজয়ের আনন্দকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই ট্রফিই ব্যবহার করছে ফিফা।

কেন একই ইতালীয় প্রতিষ্ঠান?

বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে জিডিই বের্তোনির সম্পর্ক আজ ৫০ বছরের বেশি সময়ের। মিলানভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ট্রফি নির্মাণে সুনাম অর্জন করেছে। ধাতব ভাস্কর্য তৈরিতে তাদের দক্ষতা, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের জন্যই ফিফা ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বকাপ ট্রফি নির্মাণের দায়িত্ব তাদের ওপর রেখেছে। জিডিই বের্তোনি একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও তাদের পরিচয় মূলত দক্ষ কারুশিল্পের জন্য। শুধু বিশ্বকাপ ট্রফিই নয়, উয়েফার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ট্রফি তৈরির কাজও করেছে এই প্রতিষ্ঠান। আজও ট্রফির প্রতিটি সূক্ষ্ম খোদাই, পলিশ ও ফিনিশিংয়ে কারিগরদের হাতের ছাপ স্পষ্ট। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার হলেও শেষ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার কাজে মানুষের দক্ষতার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।

একবার নয়, দুবার চুরি হয়েছিল বিশ্বকাপ ট্রফি

বর্তমান ট্রফি নয়, তার পূর্বসূরি জুলে রিমে ট্রফিকে ঘিরেও রয়েছে নাটকীয় ইতিহাস। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডে জনসাধারণের প্রদর্শনীর সময় ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। কয়েক দিন পর দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঝোপের নিচে সেটি খুঁজে পায় পিকলস নামের একটি পোষা কুকুর। মুহূর্তেই কুকুরটি বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠে।

কিন্তু জুলে রিমে ট্রফির ভাগ্য শেষ পর্যন্ত ভালো ছিল না। ব্রাজিল ১৯৭০ সালে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে নেওয়ার পর ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোয় ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে সেটি আবার চুরি হয়। এরপর আর কখনো ট্রফিটি উদ্ধার করা যায়নি।

বিজয়ী দল কি আসল ট্রফিটিই পায়?

এ প্রশ্নের উত্তর অনেককে অবাক করতে পারে। ফাইনালের রাতে কোনো বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক যে ট্রফিটি মাথার ওপরে তুলে ধরেন, সেটিই আসল ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু সেই ট্রফি স্থায়ীভাবে তাদের কাছে থাকে না।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন শেষে ট্রফিটি আবার ফিফার কাছেই ফিরে যায়। এরপর বিজয়ী দেশের নাম ট্রফির নিচের অংশে খোদাই করা হয়। চ্যাম্পিয়ন দল স্থায়ীভাবে পায় একটি সোনার প্রলেপ দেওয়া প্রতিরূপ, যা তারা নিজেদের সংগ্রহে রাখতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্বকাপ জেতা দলও আসল ট্রফির মালিক হয় না। আসল ট্রফির মালিক সব সময়ই ফিফা।

এবার প্রশ্ন হলো কোথায় রাখা হয় আসল ট্রফি? বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা ও ট্রফি ট্যুরে ব্যবহার করা হলেও বাকি সময় আসল ট্রফিটি সংরক্ষিত থাকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত ফিফা মিউজিয়ামে।
বিশেষ নিরাপত্তার মধ্যেই এটি রাখা হয়। কারণ, এটি শুধু একটি ট্রফি নয়, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান নিদর্শন। সবাই কি ট্রফি ছুঁতে পারেন? উত্তরটি হবে, না। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, আসল বিশ্বকাপ ট্রফি স্পর্শ করার অনুমতি খুব সীমিত। বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় ও কোচ, রাষ্ট্রপ্রধান এবং ফিফার নির্ধারিত কর্মকর্তারাই সরাসরি ট্রফি স্পর্শ করতে পারেন। অন্যদের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এ কারণেই ট্রফিটি জনসমক্ষে প্রদর্শিত হলেও সবাই ইচ্ছেমতো হাতে নিয়ে ছবি তুলতে পারেন না।

তথ্যসূত্র: ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (দ্য ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি), ফিফা মিউজিয়াম, জিডিই বের্তোনি অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, রয়টার্স।

Read full story at source