২৯ ফেব্রুয়ারির তোরেস, ১৯ জুলাইয়ের নায়ক
· Prothom Alo
মানুষ সাধারণত বছরে একবারই জন্মদিন উদ্যাপন করে। তবে ব্যতিক্রমও আছে, যেমন ফেরান তোরেস। জন্মের পর থেকেই তাঁকে শিখতে হয়েছে অপেক্ষা। জন্ম ২৯ ফেব্রুয়ারি—দিনটি যে ক্যালেন্ডারের পাতায় আসেই চার বছরে একবার! জন্মদিনের আনন্দ তাই তোরেসের কাছে ধৈর্যের আরেক নাম।
Visit rouesnews.click for more information.
এখন থেকে অবশ্য আর চার বছর অপেক্ষা করতে হবে না। প্রতিবছরই একবার করে উদ্যাপনের মতো একটা দিন এখন তাঁরও আছে। ১৯ জুলাই—এই দিনেই যে তিনি করেছেন নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি। যে গোল স্পেনকে এনে দিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফি, তাঁকে বসিয়ে দিয়েছে স্প্যানিশ ফুটবলের ইতিহাসের পাতায়।
অথচ বিশ্বকাপজুড়েই লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে নিয়মিত একাদশের খেলোয়াড় ছিলেন না তোরেস। এর আগে বদলি হয়ে নেমেও তেমন কিছু করতে পারেননি। সে জন্য সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। কিন্তু ফুটবল এমনই, একটি মুহূর্তই কখনো কখনো পুরো ক্যারিয়ারের ছবিটা বদলে দেয়।
গতকাল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালেও ২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার ছিলেন বেঞ্চে। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি নামার পর অতিরিক্ত সময়ের খেলাতেই বদলে দেন ম্যাচের ভাগ্য। ১০৬তম মিনিটে পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামস হেড করেন, আর সেই বল থেকেই গোল করেন তোরেস—বিশ্বকাপের জয়সূচক গোল। পুরো টুর্নামেন্টে এটাই তাঁর একমাত্র গোল হলেও এর চেয়ে দামি সম্ভবত আর কিছুই নয়।
বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে স্পেন ফুটবল দলের উচ্ছ্বাসম্যাচ শেষে তোরেস বলছিলেন, ‘এটা অনেক বড় স্বস্তি। পুরো বিশ্বকাপে আমাকে অনেক সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নিজস্ব একটি চিত্রনাট্য থাকে। ঈশ্বর আমাকে লড়ে যাওয়ার শক্তি দিয়েছেন। তিনি প্রাপ্য মানুষকেই প্রাপ্য জিনিস দেন।’
তোরেসের শরীরেই আছে তাঁর জীবনের লড়াইয়ের চিহ্ন। গোড়ালিতে নোঙরের ট্যাটু, পাশে লেখা ‘আই রিফিউজড টু সিঙ্ক’, মানে ‘আমি ডুবে যেতে চাই না।’ পিঠে আছে ফিনিক্স পাখির ডানার ট্যাটু, সঙ্গে লেখা—চেষ্টা করো, ব্যর্থ হও, আবার উঠে দাঁড়াও। কথাগুলো যেন তাঁর জীবনদর্শনেরই সারসংক্ষেপ, ক্যারিয়ারেরও।
মেসির জন্য খারাপ লাগছে উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতা কুবারসির২০২২ সালে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনায় নাম লেখান তোরেস। এত দাম দিয়ে আনার পর প্রত্যাশার চাপ ছিল। কিন্তু প্রথম আড়াই বছরে ১১৩ ম্যাচ খেলে গোল করেন মাত্র ২৫টি। স্বাভাবিকভাবেই ওই সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। এতটাই যে একপর্যায়ে মনোবিদের কাছে ছুটে যেতে হয়। তখন তিনি বুঝতে পারেন, গোলের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ফুটবল খেলার আনন্দটাই ভুলে যাচ্ছিলেন।
সেখান থেকেই নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার শুরু। নিজের ডাকনাম রাখেন ‘এল তিবুরোন’, মানে ‘হাঙর’। কেন হাঙর? কারণ, হাঙর সব সময় সামনে এগোয়, থেমে থাকে না। গোল উদ্যাপনে তাই দুই হাত দিয়ে হাঙরের চোয়ালের ভঙ্গি করেন তিনি। বার্সেলোনাতেও ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর গল্প। সর্বশেষ দুই মৌসুমে ৯৪ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল। তবে ক্লাবের জার্সিতে সমালোচনার বড় অংশের জবাব দিলেও জাতীয় দলে সামর্থ্য প্রমাণ করাটা বাকি ছিল।
পেদ্রির সঙ্গে ট্রফি হাতে তোরেসতোরেস সেটাই করলেন নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপজয়ের নায়ক হয়ে ওঠার পর তোরেস বলেন, এই গোল শুধু তাঁর একার নয়। এটা ৪ কোটি ৭০ লাখ স্প্যানিয়ার্ডের গোল, পুরো একটা দেশের গোল।
তবে ফাইনালে তোরেসের অবদান শুধু গোলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাত্র ৫৮ মিনিট মাঠে থেকেও প্রতিপক্ষের বক্সে সবচেয়ে বেশি সাতবার বল স্পর্শ করেছেন তিনি। বলও একবার নয়, দুবার জালে জড়িয়েছেন। একটি বাতিল হয়েছে অফসাইডে। আরও একটি কাকতালীয় তথ্য এই গোলকে করে তুলেছে বিশেষ। বিশ্বকাপ ফাইনালে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে জয়সূচক গোল করা ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার এখন তোরেস। তাঁর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু জার্মানির মারিও গোটশের (২০১৪ ফাইনালে)।
তবে ১৯ জুলাইয়ের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি হয়তো গোল নয়। শেষ বাঁশি বাজার পর যখন লিওনেল মেসি এক পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ হারের কষ্ট সইছিলেন, সবার আগে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন ফেরান তোরেস।
চার বছরে একবার জন্মদিন পাওয়া মানুষটির জন্য তাই কাল শুধুই বিশ্বকাপ জেতার দিন নয়। এটি তাঁর পুনর্জন্মের দিনও। যে দিন তোরেস প্রমাণ করেছেন, সত্যিই তিনি ডুবে যেতে রাজি নন।
স্পেনের জয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী মানুষকে আনন্দিত করেছে, বলল ইরান